ঢাকা: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাতকারে অভিযোগ করেন, গ্রামীণ ব্যাংক গরিবের নিকট থেকে ৩০ থেকে ৪৫ শতাংশ সুদ গ্রহণ করে থাকে।
মঙ্গলবার এক বিবৃতির মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্য প্রকৃত তথ্যের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ বলে ব্যাংকটি দাবি করেছে।
ব্যাংকটির মহাব্যবস্থাপক (তথ্য ও গণমাধ্যম সমন্বয়) জান্নাত-ই-কাওনাইন স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, এমআরএ সর্বোচ্চ সুদের হার ঠিক করেছে ২৭ শতাংশ। আর গ্রামীণব্যাংকের সর্বোচ্চ সুদের হার ২০ শতাংশ। উত্পাদনশীল খাতে ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে ২০ শতাংশ হারে সুদ নেওয়া হয়। আর অন্যান্য খাতে এ সুদের হার ১০ শতাংশ, ৮ শতাংশ ও ৫ শতাংশ। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে বিনা সুদেও ঋণ দিয়ে থাকে গ্রামীণব্যাংক।
প্রসঙ্গত, অলিম্পিক ২০১২এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ৫ দিনের লন্ডন সফরে গিয়ে গত ৩০ জুলাই বিবিসি টেলিভিশনের ‘হার্ডটক’ টক শোতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, গ্রামীণ ব্যাংক গরিব মানুষের কাছ থেকে ৩০, ৪০ বা ৪৫ শতাংশ সুদ নেয়। ড. ইউনূস ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশ থেকে দারিদ্র্য দূর করতে পারেননি। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে ১০ শতাংশ দারিদ্র্য দূর করেছে ।
তার এ সাক্ষাত্কারটি ৩১ জুলাই ২০১২ তারিখে দেশের প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্ন করেন, তিনি নোবেল বিজয়ী প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসকে ``গরিবের রক্তচোষা`` বলেছেন কী না।
উত্তরে ``আমি কারও নাম উল্লেখ করিনি`` উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ``গরিবের কাছ থেকে ৩০ থেকে ৪৫ শতাংশ সুদ গ্রহণ করা কী ন্যায্য? অবশ্যই না। কেমন করে এ গরিব মানুষেরা নিজের পায়ে দাড়াবে? যদি আপনি ৩০ থেকে ৪৫ শতাংশ সুদ নিয়ে তাদের ঋণ দেন, এটি লজ্জার।``
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিবাদে গ্রামীণব্যাংকের বিবৃতিতে বলা হয়, গ্রামীণ ব্যাংকে ৫ ধরনের ঋণ কার্যক্রমের জন্য ৫ ধরনের সুদের হার প্রচলিত রয়েছে। এর মধ্যে উপার্জনশীল খাতে ঋণের সর্বোচ্চ সুদ ২০ শতাংশ। ১০০০ টাকা ঋণ নিলে এক বছরে সাপ্তাহিক কিস্তিতে এ ঋণ পরিশোধ করলে মোট পরিশোধ করতে হয় ১হাজার ১০০ টাকা। অর্থাৎ এক হাজার টাকার ঋণের ওপর বছরে মোট ১০০ টাকা সুদ।
মূল টাকার ওপর ফ্ল্যাট রেটে মাত্র ১০ শতাংশ হারে সুদ দিতে হয়। সাপ্তাহিক কিস্তিতে পরিশোধ করা হয় বলে এ ঋণের কার্যকর সুদ ২০ শতাংশ। গ্রামীণব্যাংক থেকে গৃহ নির্মাণের জন্য ঋণ নিলে সুদ দিতে হয় ৮ শতাংশ হারে। সদস্যের ছেলেমেয়েদের উচ্চশিক্ষার জন্য ঋণ নিলে শিক্ষা চলাকালীন কোনো সুদ নেওয়া হয় না। শিক্ষা সমাপ্তির পর তাদের কাছ থেকে ৫ শতাংশ হারে সুদ নেওয়া হয়।
তাছাড়া গ্রামীণ ব্যাংক ভিক্ষুকদের বিনা সুদে ঋণ দেয়। সদস্যদের কেন্দ্রঘর নির্মাণের জন্য যে ঋণ দেওয়া হয়, সেটাও সুদবিহীন বলে জানিয়েছে নোবেল পুরস্কারজয়ী ব্যাংকটি।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, এমআরআই আইন, ২০০৬-এর আওতায় প্রণিতব্য বিধিমালার খসড়ার বিষয়ে ৪ এপ্রিল ২০০৯ তারিখে অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভার কার্যবিবরণীর ৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, গ্রামীণ ব্যাংকের সাধারণ ক্ষুদ্রঋণের বর্তমান কার্যকর বার্ষিক সুদের হার ২০ শতাংশ। ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এমআরআই কর্তৃক নির্ধারিত সর্বোচ্চ সুদের হার ধার্য করা হয়েছে ২৭ শতাংশ। গ্রামীণ ব্যাংকের সুদের হার সরকার নির্ধারিত সর্বোচ্চ সুদের হারের চেয়ে ৭ শতাংশ কম।
গ্রামীণব্যাংক কখনই পরিশোধিত ঋণের ওপর সুদ ধার্য করে না উল্লেখ করে বিবৃতিতে বলা হয়েছে, জন্মলগ্ন থেকেই গ্রামীণ ব্যাংক তার গ্রাহকদের ঋণের ক্ষেত্রে ডিক্লাইন ব্যালেন্সের ওপরই সুদ ধার্য করে আসছে। অধিকন্তু ঋণের ক্ষেত্রে গ্রামীণব্যাংক সব সময় সরল সুদ হিসাব করে। এ ক্ষেত্রে কখনও চক্রবৃদ্ধি সুদ হিসাব করা হয় না। কখনই সুদকে মূল ঋণের সঙ্গে একীভূত করা হয় না।
তাছাড়া গ্রামীণ ব্যাংকের সুদ কোনো অবস্থাতেই মূল টাকার বেশি হতে পারে না। ঋণগ্রহীতা দীর্ঘদিন ঋণ পরিশোধ না করলেও মোট সুদের পরিমাণ মূল টাকার বেশি হতে পারে না। এছাড়া সালতামামিতে নিট মুনাফা অর্জিত হলে গ্রামীণ ব্যাংকের মালিক হিসেবে শেয়ার হোল্ডার সদস্যদের ডিভিডেন্ড প্রদান করা হয়।
বাংলাদেশ সময়: ০৩০০ ঘণ্টা, আগস্ট ০১, ২০১২
কেজেড/সম্পাদনা: নূরনবী সিদ্দিক সুইন, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর; জুয়েল মাজহার, কনসালট্যান্ট এডিটরjewel_mazhar@yahoo.com