চারদিকে শোক-বিহ্বলতা আর মায়াজাল ছড়িয়ে চলে গেলেন জননন্দিত কথাসাহিত্যক হুমায়ূন আহমেদ । বাংলা সাহিত্যের এক অপূরণীয় শূন্য স্থান তৈরি করে গেলেন এই বরেণ্য কথাশিল্পী।সাম্প্রতিক শুরু করা ‘দেয়াল’ শেষ হল না। মাঝপথে রেখে বিদায় নিলেন । এই তো কিছুদিন আগে পর্যন্ত তার লেখা ‘দেয়াল’ উপন্যাস নিয়ে কতই না আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে পত্রপত্রিকায় । আজ থেকে আর কেউ লিখবে না হুমায়ূন আহমেদের ‘দেয়াল’ নিয়ে, পক্ষে বিপক্ষে । আসলে উপন্যসের রূপকারই তো থেমে গেলেন !
কি দুর্দান্ত প্রতাপেই না বাংলা সাহিত্যে জনপ্রিয়তার আসনটি আগলে রেখেছিলেন । হঠাৎই থেমে গেলেন । হুমায়ূন আহমেদ আর কখনও আমাদের সামনে আসবেন না। হলুদ পাঞ্জাবি আর খালি পা হিমুরা ভিড় করবেনা অটোগ্রাফের জন্য একুশে বইমেলায় ।এক শ্রেণীর লেখকরা বলবেন না আর, হুমায়ূন আহমেদের কারণে মেলায় হাঁটা যায় না। হিমুদের কারণে মেলার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে । হুমায়ূন আহমেদকে বাজারি লেখক বলে আর কেউ করতে পারবে না সমালোচনা। তবুও তার গড়া রহস্যময় চরিত্র হিমু কিংবা মিসির আলীরা বেঁচে থাকবে অনেক অনেক দিন। মিসির আলির মত যুক্তির প্যাঁচ কষবে হুমায়ূন মুগ্ধ পাঠকরা ।নন্দিত নরকে, শঙ্খনীল কারাগার, শ্রাবণমেঘের দিন কি অদ্ভুত সব সৃষ্টি তার । একান্ত নিজের মত করে বাংলাসাহিত্য জগতকে সাজিয়েছেন । গল্প উপন্যাস নাটক চলচিত্র গান সবখানে তার বিস্তার । ‘কোথাও কেউ নেই’- এর ‘বাকের ভাই’- এর মধ্য দিয়ে নাট্যজগতে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন কেবল হুমায়ূন আহমেদের পক্ষেই সম্ভব ।
হুমায়ূন আহমেদ বাঁচতে চেয়েছিলেন অনেক দিন । আমাদেরও চাওয়া ছিল তিনি বেঁচে থাকুন ।আমরা ‘দেয়াল’-এর পরিপূর্ণতা চেয়েছিলাম । আমরা চেয়েছিলাম ঘেঁটুপুত্র কমলার মত আরও অনেক সৃষ্টি । হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর ইচ্ছা ছিল চান্নি পশর রাইতে । তাই তার লেখাতে আকুতি ছিল জ্যোৎস্নার । শ্রাবণের অঝোর ঢল কিংবা ভরা বর্ষা ছিল তার লেখার প্রাণসঞ্জীবনী । অনেক অপূর্ণ ইচ্ছাকে সামনে রেখে ভরা অমাবস্যায় তিনি চলে গেলেন । হুমায়ূন আহমেদ আর নেই, শোনামাত্র আমার মনের পর্দায় নামলো ঘুটঘুটে অন্ধকার । তা’কে রাখা বইগুলো থেকে একটা বের করে নিলাম । হারিয়ে গেলাম জ্যোৎস্নায় । অন্ধকার দূর হয়ে জেগে উঠলো মায়াবি চাঁদের আলো । সেই আলোয় আমি দেখছি হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে আছেন । দেখেছি জ্যোৎস্নার মাঝে তার আনাগোনা ।ভাবছি তার সৃষ্টকর্মই তার বাঁচার পথ্য । বনলতা কিংবা উদ্যানলতা, বর্ষার কদম কিংবা শরতের শিউলি, সবার মাঝে জোছনা হয়ে ঝরবেন তিনি । আর আমরা মুগ্ধ-বিহ্বল দৃষ্টিতে সুধা নেব ।
হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে আছেন এবং থাকবেন অনন্ত কাল ।
সম্পাদনা: জুয়েল মাজহার, কনসালট্যান্ট এডিটর jewel_mazhar@yahoo.com