৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২০, শনিবার মে ১৮, ২০১৩ ৯:১৪ পিএম BDST banglanew24
22 Nov 2012   05:33:08 PM   Thursday BdST
E-mail this

দেনমোহর নিয়ে টালবাহানা নয়


তামীম রায়হান
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
দেনমোহর নিয়ে টালবাহানা নয়

মানুষ সামাজিক জীব। ঘর-সংসারে যে মায়া ও ভালোবাসার বন্ধনে আমাদের বসবাস তা পরম করুণাময়ের অসংখ্য নেয়ামতের অন্যতম একটি।

সৃষ্টির সূচনা থেকে তিনি নারী ও পুরুষের মধ্যে বন্ধন তৈরি করেছেন। প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ ও নারী আবদ্ধ হয় বিবাহবন্ধনে এবং তৈরি হয় সুখময় সংসার, তারপর সন্তান-সন্ততি। এভাবেই এগিয়ে চলেছে পৃথিবী।

যে মহান দয়াময় অদৃশ্য থেকে এসব সৃষ্টি করে চলেছেন, তিনি আমাদের এ নেয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন পবিত্র কুরআনে। আল্লাহ পাক বলেন, ‘‘এই যে তিনি তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের জন্য স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন- যাদের কাছে তোমরা প্রশান্তির আশ্রয় নাও। তিনিই তো তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালবাসা এবং মায়া গেঁথে দিয়েছেন, এটা তো তাঁরই নিদর্শন।’’ (সূরা রূম-২১)

এ বৈবাহিক সম্পর্কের সূচনায় মহান আল্লাহ পাক নারীর প্রতি সম্মান দেখিয়ে নারীর জন্য মোহরানা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। যা আদায় করা পুরুষের জন্য আবশ্যক। ইসলামের পরিভাষায় দেনমোহর বা মোহরানা একান্তই কনের অধিকার ও প্রাপ্য, যা আদায় করা বরের জন্য ফরজ। প্রতিটি বিবাহিত পুরুষের ওপর অবশ্য আদায়যোগ্য আমল। হোক তা নগদ কিংবা বাকি। আজ কিংবা কাল।

মোহর মূলত একটি সম্মানী যা স্বামী তার স্ত্রীকে দিয়ে থাকে। এটা নারীর মূল্য নয় যে তা পরিশোধ করার পর মনে করতে হবে, এ নারী এখন স্বামীর কাছে বিক্রি হয়ে গেছে। আবার তেমনিভাবে তা শুধু কথার কথাও নয়, যে শুধু মুখে মুখে নির্ধারণ করা হলো কিন্তু জীবনভর তা দেওয়ার কোনো তাগিদ থাকলো না। বরং স্ত্রীকে নিজের ঘরে আনার সময় উপহার হিসেবে তাকে এ মোহর দিতে হবে এবং সম্মান জানিয়ে তাকে নিজের ঘরে তুলতে হবে।

এ বিষয়ে পবিত্র কুরআনের বেশ কয়েক জায়গায় স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। সূরা নিসার ৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ পাক বলেছেন, ‘‘আর তোমরা নারীদের তাদের মোহর দিয়ে দাও স্বেচ্ছায়, তবে তারা যদি তা থেকে কোনো অংশ মাফ করে দেয়, তখন তা তোমরা ভোগ করতে পার।’’

অন্যত্র তিনি বলেছেন, ‘‘নারীদের তাদের পরিবারের অনুমতি নিয়েই তোমরা বিবাহ করো এবং তাদের অধিকারটুকু ভালোভাবে আদায় করে দাও।’’ (সূরা নিসা-২৫)

একই প্রসঙ্গ আল্লাহ পাক উল্লেখ করেছেন সূরা মুমতাহিনার ১০ নং আয়াতে এবং আরও কয়েক জায়গায়। বারবার তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন নারীর অধিকার ও সম্মান যেন আদায় করা হয়।
বিয়ের সঙ্গে সঙ্গে মোহর আদায় করা উচিত। তবে কারণবশত তখন অপারগ হলে কবে আদায় করবে- তা নির্ধারণ করতে হবে। রাসূল (সা.) এর যুগ এবং সাহাবিদের সময়েও কেউ নারীর মোহরানা বাকি রেখে বিয়ে করতেন না। রাসূল (সা.) নিজ হাতে যেসব বিয়ে দিয়েছেন, হাদীসের কিতাবসমূহে সেসবের বিবরণে দেখা যায়, তিনি নগদ মোহরানার বিনিময়ে বিয়ে করিয়েছেন- হোক তা লোহার আংটি কিংবা যুদ্ধে ব্যবহৃত বর্ম। বাকিতে মোহরানা দেওয়ার প্রচলত তখন ছিলনা।

অপ্রিয় হলেও সত্য, এ মোহরানা আদায়ের বেলায় আমাদের সমাজের পুরুষ মহোদয়গণ নান ছলচাতুরির আশ্রয় নিয়ে থাকেন। বিয়ের মজলিসে হয়তো সবাইকে শোনানোর জন্য মোহরানা ধরা হয় লাখ টাকা- অথচ সারা জীবন স্ত্রীর হাতে এর অর্ধেকও তুলে দেওয়ার সৎসাহসটুকু তারা দেখাতে পারেন না। অনেকে আবার কৌশলে মাফ চেয়ে নেন। এর সঙ্গে উল্টো যোগ হয়েছে লোভ লালসায় ঘেরা আজকের এ সভ্যতার নতুন অভিশাপ ‘যৌতুক’। মেয়ের বাবার কাছে ‘জামাই’কে খুশি করার জন্য উপঢৌকনের নামে ‘যৌতুক’ দাবি করে বরপক্ষ। আর এ অভিশাপে বিষাক্ত হচ্ছে কতো সুখের সংসার। আমাদের নীচু মানসিকতার এ বহিঃপ্রকাশ শুধু দুঃখজনক নয়, চরম অপরাধও।

যেসব বিবাহিত পুরুষ আজও নিজেদের জীবনসঙ্গিনীর দেনমোহর আদায় করতে পারেননি কিংবা আদৌ তা পরিশোধের ইচ্ছা নেই, তাদের ব্যাপারে বায়হাকী শরীফের বর্ণনায় রাসূল (সা.) বলেছেন, যে পুরুষ বিয়ে করলো এবং মৃত্যু পর্যন্ত সে স্ত্রীর মোহরানা আদায়ের ইচ্ছাও করেনি, তবে সে অবৈধ ব্যভিচারকারী (ধর্ষণকারী) হিসেবে গণ্য হবে।

ইমাম আহমদের বর্ণনায় এসেছে, রাসূল (সা.) বলেছেন, মোহর আদায় করার নিয়ত ছাড়া যে ব্যক্তি কোনো নারীকে বিয়ে করে আর আল্লাহ পাক তো ভালো করেই জানেন যে তার মনে মোহরের নিয়ত নেই, তবে এই লোক যেন আল্লাহকে ধোঁকা দেওয়ার স্পর্ধা দেখালো এবং অন্যায়ভাবে তার স্ত্রীকে ভোগ করলো। কিয়ামতের দিন সে ব্যভিচারকারী পুরুষ হিসেবে উপস্থিত হবে।

ফকিহ উলামায়ে কেরামের সর্বসম্মত মত হলো, যে পুরুষ তার জীবদ্দশায় এ মোহরানা আদায় করেনি, মৃত্যুর পরও তা অন্যান্য ঋণের মতো তার কাঁধে রয়ে যাবে। ইমাম আবু হানিফা এবং অন্যান্য ফকিহরা এমনও রায় দিয়েছেন, মোহরানা না পাওয়ার কারণে স্বামীর কাছে যেতে অস্বীকার করা কিংবা তাকে স্বামীর অধিকার থেকে বঞ্চিত করা অথবা তার সঙ্গে কোথাও যেতে না চাওয়ার অধিকার স্ত্রীর রয়েছে। এমন অবস্থায়ও তার খরচাদি স্বামীর ওপরই বর্তাবে। কারণ মোহরানা এবং নিজের ভরণপোষণ দাবি করা স্ত্রীর অধিকার। যে কোনোভাবেই স্ত্রী তা চাইতে পারে। (দুররে মুখতার)

এক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়, পাত্রীদের পক্ষ থেকে যদি পাত্রের সাধ্য অনুযায়ী মোহরানা ধরা হয়, তবে তা সবচেয়ে উত্তম। একথাও সত্য যে, মোহরানার ব্যাপারে ইসলাম সর্বনিম্ন কিংবা সর্বোচ্চ অংক বেঁধে দেয়নি। বরং তা সমাজ এবং সাধ্যের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তবে রাসূল (সা.) এও বলেছেন, সাধারণ আয়োজনের বিয়েই সর্বোত্তম বরকতময়।

তার মানে এই নয় যে এতো সামান্য পরিমাণ মোহর ধরা হলো, যা স্ত্রীর সম্মান উপযোগী নয় কিংবা এতো চড়াও নয় যা স্বামীর সাধ্যের বাইরে।

ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর মতে, দেনমোহরের সর্বনিম্ন পরিমাণ হচ্ছে দশ দিরহাম বা ৩০ গ্রাম রূপার সমমূল্য।

রাসূল (সা.) নিজের মেয়ে এবং স্ত্রীদের বেলায়ও যে মোহরানা ধরেছিলেন তার পরিমাণ পাঁচশ’ দিরহাম বা ১৩১ তোলা ৩ মাশা রূপার সমমূল্য। (ইবনে মাজাহ-১৫৩২)

এবং রাসূল (সা.) নিজের স্ত্রীদের বেলায়ও এ পরিমাণ মোহরানা আদায় করেছেন। তবে উম্মে হাবিবা (রা.) এর বেলায় এর পরিমাণ ছিল চার হাজার দিরহাম। (আরও বিস্তারিত জানতে মুসলিম শরীফ-১৪২৬, আবু দাউদ-২১০৫, নাসায়ী-৬/১১৬-১১১৯)

মনে রাখা প্রয়োজন, ‘মোহরে ফাতেমি’ ধরতেই হবে, এমন কোনো নিয়ম ইসলামী শরিয়তে নেই। তবে কেউ যদি রাসূলের (সা.) এ পরিমাণকে বরকতময় মনে করে তা হিসাব করেন, তাতেও অসুবিধা নেই।
আরেকটি বিষয় সবার জানা থাকা প্রয়োজন, বিয়ের সময় নববধূকে যেসব গহনা দেওয়া হয় তা যদি তাকে সম্পূর্ণ মালিক বানিয়ে দেওয়া হয়ে থাকে যেন স্ত্রী চাইলে তা বিক্রি কিংবা কাউকে উপহার অথবা যা খুশি করতে পারেন এবং স্বামী তাকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, আমি তোমাকে এগুলো মোহর হিসেবে দিচ্ছি- তবে তা মোহরানা হিসেবে ধরা যাবে এবং কখনোই তা স্ত্রীর কাছে ফেরত চাওয়া যাবে না, এমনকি বিবাহ বিচ্ছেদের পরও নয়। নতুবা যদি তা তাকে শুধু ব্যবহারের জন্য দেওয়া হয়, তবে তা মোহরানা হিসেবে আদায় ধরা হবে না। মোহরানা নারীর একচ্ছত্র অধিকার, তিনি এ দিয়ে যা খুশি তা করতে পারেন। স্বামী, বাবা কিংবা অন্য কারোর এ থেকে কিছু নেওয়ার অধিকার নেই। সমাজে প্রচলিত যেসব রীতিনীতি রয়েছে, সেসবের ফাঁক ফোকরে যেন মোহরের অধিকার থেকে স্ত্রী বঞ্চিত না হন, তা খেয়াল করা সব সচেতন মুমিন পুরুষের অবশ্য পালনীয় দায়িত্ব ও কর্তব্য।

জীবনভর যে নারীর ভালোবাসায় আবদ্ধ হয়ে সুখী ও নিশ্চিন্ত জীবন পার করে দিচ্ছেন স্বামীরা, এমন ভালোবাসার মানুষটিকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে কিয়ামতের মাঠে মহান আল্লাহ পাকের দরবারে ‘ব্যভিচারকারীদের’ সঙ্গে উপস্থিত হওয়া নিশ্চয়ই কারো কাম্য নয়।

লেখক- কাতার করেসপন্ডেন্ট, দোহা থেকে
tamimraihan@yahoo.com

সম্পাদনা: শিমুল সুলতানা, নিউজরুম এডিটর
ইসলাম ডেস্ক মেইল: bn24.islam@gmail.com

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Bookmark and Share
REVE Systems
VISA Center Inc
Holy Hajj BD
RehabHousing.com

জাতীয়

8877
Kaspersky Lab - Antivirus Software [ Bangladesh ]
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম | এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

ফোন: +৮৮০ ২ ৮৪০২১৮১, ৮৪০২১৮২ আই.পি. ফোন: +৮৮০-৯৬১২১২০০০০ নিউজ রুম সেল: +৮৮-০১৭২৯০৭৬৯৯৬, ০১৭২৯০৭৬৯৯৯ ফ্যাক্স: +৮৮০ ২ ৮৪০ ২৩৪৬
ইমেইল: news.bn24@gmail.com, editor.banglanews@gmail.com, editor@banglanews24.com    বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম    এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

বাংলায় লেখা হলে ইউনিকোডে পরিবর্তন করে ইমেইল করুন    কপিরাইট © 2013 সকল স্বত্ব ® সংরক্ষিত    একটি ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেড প্রতিষ্ঠান