 |
ট্রেনে করে যাচ্ছিলাম। লাকসাম থেকে আখাউড়া। আমার পেশা ছিল চোরাচালান। সীমান্তের ওপার থেকে মালামাল এনে এ প্রান্তে বিক্রি করা। প্রায় নিয়মিত লোকাল ট্রেনের যাত্রী আমি। বেশ ভালো আয় হয়। আরো ভালো হতো কিন্তু জায়গায় জায়গায় এতো বখরা দিতে হয় যে কি বলবো। কত জায়গায় যে ঘুষ দেই!
চোরাচালানের ইচ্ছা যদিও প্রথমে ছিল না কিন্তু উপায় নাই। লাকসাম কলেজে পড়ার সময় মা বাবা আমাকে বিয়ে করানোর জন্য চাপাচাপি শুরু করলো। মেয়ে ক্লাস সেভেনে। গায়ের রঙ ফর্সা কিন্তু খুব মোটা।
মা বললেন- এমন সুন্দর মাইয়া বাংলাদেশে আর ফাইতি না! (বাংলাদেশে গায়ের রঙ ফর্সা মানেই সুন্দর। ফেয়ার অ্যান্ড লাভলী)
আমার পড়াশুনার দশা খুব খারাপ। বিএ পরীক্ষায় নকল করতে গিয়ে ম্যাজিস্ট্রেট ধরে ফেললেন। পা ধরলাম। কাজ হলো না। বহিষ্কার। অতঃপর মোটা মেয়েটাকে বিবাহে রাজি হলাম। আমার মা বিশাল লিস্ট ধরিয়ে দিলেন মেয়ে পক্ষকে যৌতুকের জন্য।
ফলাফল যা হবার তাই হলো। মেয়ে পক্ষ বেঁকে বসলো। বলল- ‘নকল করা পোলার লগে আমাগো মাইয়ার বিয়া দিতাম না’।
আমি প্রত্যাখাত হয়ে ভাবলাম মুটুকে কিডন্যাপ করি। কাজ হলো না। একদিন মনের দুঃখে চোরাচালানী’র দলে নাম লিখি। তার আগে স্থানীয় কয়েকজনের সাথে মাস ছয়েক ট্রেনিং নেই। লাকসাম, আখাউড়া, ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া এ সব এলাকা আমার কবিতা মতো মুখস্ত। সারাদিন এধার ওধার করি। মনের ভিতর অচেনা কষ্ট। রাতের জ্যোৎস্না বুকের ভিতর কু কু ডাকে।
অন্ধকারে যখন একা একা বাড়ি ফিরি অনেক রাতে। সেই ফর্সা মোটা মেয়েটার বাড়ির পাশ দিয়ে আসি। মাথার ভিতর কবিতা খেলে। লুকিয়ে লুকিয়ে কবিতা লিখি। একদিন সে মেয়েটির বিয়ে হয়ে যায়। আমার চোরাচালানী বেড়ে যায়, পাল্লা দিয়ে কবিতা রচনাও।
একদিন ট্রেনে করে যাচ্ছি। লোকাল ট্রেন। সব স্থানীয় যাত্রী। গিজগিজে লোক। আমি উদাস হয়ে ট্রেনের মাঝে কিংস্টর্ক (বকলা) সিগারেট ধরাই। কারো ধার ধারি না। চেহারায় অযত্ন চুল। কবি কবি ভাব, ভিনদাস। হঠাৎ সামনে তাকিয়ে দেখি আমার সামনের বেঞ্চে সেই মেয়েটি ও তার বর। আমার বুকটা তো ধ্বক করে ওঠে। বকলা সিগারেটে টান ঘন হয়। ট্রেন তো চলছেই ঝিক ঝিক। ভদ্রলোক আমার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। আমি খানিকটা কুঁকড়ে আছি। দেখি ভদ্রলোক আমাকে জিজ্ঞেস করছেন-
: ভাই সাহেবের নাম? (গলাটা ফ্যাঁসফেঁসে, মনে হচ্ছে কফ জমে আছে..)
: জী, আব্দুল হালিম।
: ভালো ভালো। কই যাইবেন?
(জবাব দিলাম না। ইশারায় ভাব করলাম যাবো দিল্লি)
: শুনলাম ভাইজান নাকি কবিতা লেখেন?
: জী (আমার এবার কান খাড়া, পুলকিত আমি। চেহারায় কবিভাব আনার চেষ্টা..)
: সাথে আছেনি দুই একটা কবিতা?
আমি সঙ্গে সঙ্গে প্যান্টের পকেট থেকে দুমড়ানো একটা কাগজ বের করলাম। কবিতা আমার নিত্য সঙ্গী। সাথেই বসবাস। হাত বাড়িয়ে ভদ্রলোককে কাগজটা দিতে দিতে বললাম-
: ভাইজানের নাম জানতে পারি?
: গোফরান আলী আখন্দ।
ট্রেন চলছে গর্ভবতী মেয়েদের মতো ঢিমে তালে। ভিতরে গরম আর কোলাহল। আখন্দ ভাই আমার কবিতাটা ভাঁজ খুলে পড়তে শুরু করেই সাথে সাথে আমাকে ফেরত দিয়ে দিলেন। বিরক্ত গলা..
: কি সব কাকের ঠ্যাং বকের ঠ্যাং লেখেন! এসব কবিতা হইলো?
আমি তো হতভম্ব। লজ্জায় মনে হচ্ছিল মাটির সাথে মিশে যাই। রাগে দুঃখে মনে হচ্ছিল ট্রেন থেকে ঝাঁপ দেই। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইলাম। ফর্সা মেয়েটা আখন্দ ভাইয়ের কাঁধে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছে। মৃদু নাক ডাকার ধ্বনি।
কিছুক্ষণ চুপচাপ আবারো। হঠাৎ দেখি আখন্দ সাহেব আমাকে ডাকছেন আস্তে আস্তে। প্রথমে বুঝতে পারিনি।
: ও হালিম ভাই সাব। ও হালিম ভাই সাব।
আমি বিরক্ত ও রাগ মিশিয়ে ভদ্রলোকের দিকে তাকাতে দেখি আমার দিকে হাত বাড়ানো, হাতে একটা লম্বা কাগজ;
: ভাই সাহেব, আমিও একটু আধটু কবিতা লিখি আরি, দেইকবেননি?
অনিচ্ছা সত্ত্বেও কাগজটা হাত বাড়িয়ে নিলাম, পড়তে শুরু করি। দুই লাইন পড়তেই খুব হাসি পাচ্ছিল, সেই কায়কোবাদ, মধুসূদন আমলের ভাষা। দলিলের মতো হাতের লেখা। কোনো রকমে হাসি চেপে ভদ্রলোককে তার কবিতাটা ফেরত দিয়ে বললাম-
: আখন্দ ভাই আপনার কবিতা খুব সুন্দর। খুব ভালো লেখেন আপনি!
ভদ্রলোকের সে কি খুশি মুখ। আকর্ণবিস্তৃত হাসি। হাত কচলাতে কচলাতে বললেন-
: সময় পাই না। নাইলে এত দিনে পাঁচ দশটা বই বাইর করি হালাইতাম।
ট্রেন চলছে আবারো। বাইরের রোদ এসে ভেতরের গরম আরো তাঁতিয়ে দিচ্ছে। ট্রেনের দুলুনিতে আমারও ঘুম পাচ্ছে। আচমকা আড় চোখে ফর্সা মেয়েটাকে দেখি। ঘুমু ঘুমু। মনে হচ্ছে কয়েকগুন সৌন্দর্য বেড়ে গেছে। আচমকা আখন্দ সাহেবের গলা…
: ও হালিম ভাই, আফনের কবিতাখান আবার দেখি?
আমি মহা বিরক্ত হয়ে বললাম-
: তখন তো একবার দেখলেন।
: আর বইলবেন না তখন ভালা করি দেইকতে পারি নো।
অনিচ্ছাসত্ত্বেও কবিতাটা আবার দিলাম। আখন্দ সাহেব মাথা দুলে দুলে কবিতাটা পড়ছেন, আমি তার মুখের দিকে তাকিয়ে আছি উৎকণ্ঠায়। না জানি কি বলেন। চোখের সামনে থেকে কবিতাটা নামালেন, আমার দিকে তাকালেন। আমি তার দিকে তাকিয়ে আছি। কেউ কথা বলছি না। আখন্দ সাহেবের মুখ ক্রমশঃ উজ্জ্বল। হাসি এসে লুটোপুটি। নাকের মাথাটা হাসিতে সংক্রামিত হচ্ছে। আমার দিকে তাকিয়ে পুরো ট্রেন কাঁপিয়ে বললেন-
: আরে ভাইছা আফনে তো দারুন লেখেন!
বাংলাদেশ সময়: ১৯৫০ ঘণ্টা, ০৯ আগস্ট, ২০১২
সম্পাদনা: এম জে ফেরদৌস, নিউজরুম এডিটর