 |
ঢাকা: রমজানের একদিন আগেই বিভিন্ন ধরনের নিত্যপণ্যের দাম আবারও বাড়লো। বিশেষ করে মাছ, মাংস ও বিভিন্ন ধরনের সবজির দাম আরেক দফা বেড়েছে রাজধানীর বাজারগুলোতে। খুচরা বাজারে ভোজ্যতেলের সংকটও ভাবিয়ে তুলছে ক্রেতাদের।
শুক্রবার রমজান উপলক্ষে প্রয়োজনীয় বাজার করতে এসে বিপাকে পড়েছেন ক্রেতারা। তাদের অভিযোগ, খুচরা বিক্রেতারা ইচ্ছামতো নিচ্ছেন মাছের দাম। গরুর মাংস বিক্রেতারাও সরকারের বেধে দেওয়া রেট মানছেন না।
রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ভোজ্যতেলের কৃত্রিম সংকট। সব ধরনের বোতলজাত তেল সরবরাহ বন্ধ আছে। অনেক খুচরা বিক্রেতা তেল সংকটের কথা বলে নির্ধারিত বাজারদর (এমআরপি) থেকে বেশি দামে বিক্রি করছেন। ফলে বিপাকে পড়েছেন ক্রেতারা।
মাসের মধ্যভাগে রোজা পড়ার কারণে চাকরিজীবীদের পক্ষে এমনিতেই একসঙ্গে পুরো মাসের বাজার করা সম্ভব হচ্ছে না। এর ওপরে পণ্যমূল্য বাড়ায় আতঙ্কিত তারা। তাদের আশঙ্কা, রোজা যতো এগোবে, দামও ততোই বাড়বে। তখন নিত্যপণ্য তাদের নাগালের আরো বাইরে চলে যাবে।
মাইনুদ্দিন নামের এক চাকরিজীবী বাংলানিউজকে বলেন, সব বাজার একসঙ্গে করা হচ্ছে না। এর ওপরে প্রথম রোজার আগেই বাজারে সব কিছুর দাম চড়া।
তিনি আরো বলেন, ‘‘সবাই আজ কিছু না কিছু বাজার করবেন। আর এ সুযোগটাই আমাদের সঙ্গে নিচ্ছেন বিক্রেতারা। সব কিছুর দামই বেশি নিচ্ছেন তারা।’’
মাংসের বাজার চড়া
রাজধানীর পাইকারি বাজার কারওয়ানবাজার শ্যামবাজার, চকবাজার, কাপ্তানবাজার এবং খুচরা বাজার নিউমার্কেট, শুক্রাবাদ ও জিগাতলা ঘুরে দেখা গেছে, মাংসের দাম চড়া। রমজানের প্রথম বাজার হওয়ার কারণে শুক্রবার প্রায় সব ধরনের মাংসের দাম বেড়েছে।
দাম বৃদ্ধির কারণ হিসেবে খুচরা বিক্রেতারা পাইকারি বাজারের মূল্যবৃদ্ধিকে দায়ী করেছেন। আর পাইকারি বিক্রেতারা অজুহাত দিচ্ছেন আমদানি কম হওয়ার।
দেশের বৃহৎ ব্রয়লার মুরগির বাজার কাপ্তানবাজারের বিক্রেতারা দাবি করেন, উত্তরবঙ্গ থেকে মুরগির ট্রাক কম প্রবেশ করেছে ঢাকায়। নরসিংদী, গাজীপুর, যশোর, বগুড়া, নওগাঁ ও সাতক্ষীরা থেকেও মুরগির ট্রাক কম আসছে। ফলে তারা বেশি দামে মুরগির মাংস বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।
কাপ্তানবাজারে গিয়ে দেখা গেছে, আমদানিকৃত মুরগির তুলনায় চাহিদা বেশি। সেখানে ১ থেকে ২ কেজি ওজনের মুরগি বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ১৫০ টাকা দরে। যেসব ব্রয়লার মুরগি দুই কেজির ওপরে সেই সব ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৩৮ টাকা প্রতি কেজিতে।
এ বিষয়ে কাপ্তানবাজারের এরশাদ মার্কেটের মেসার্স আছিয়া পোল্ট্রি ফার্মের মালিক পাইকারি মুরগি বিক্রেতা মো: কামাল হোসেন বলেন, অন্যদিনের তুলনায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে গাড়ি কাপ্তানবাজারে কম প্রবেশ করেছে। এজন্য চাহিদার তুলনায় পণ্য সরবরাহ কম।
তিনি আরো বলেন, ‘‘আমাদের কাছ থেকে যে সমস্ত খুচরা বিক্রেতা মুরগি নেন প্রতি কেজি ১০০ টাকা, তারাই শুক্রবার মুরগি নিয়েছেন ১৫০ টাকা দরে। এজন্যই মুরগির বাজার একটু চড়া।’’
এর ফলে খুচরা বাজারে ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিপ্রতি ১৫ টাকা থেকে ২০ টাকা বেড়ে এখন বিক্রি হচ্ছে ১৬০ টাকা থেকে ১৬৫ টাকায়। গরুর মাংসের দাম সরকার ২৭৫ টাকা বেধে দিলেও তা মানছেন না বিক্রেতারা। এখন কেজিপ্রতি বিক্রি হচ্ছে ২৮৫ টাকা থেকে ২৯০ টাকা। মহিষের মাংস ১০ টাকা বেড়ে কেজিপ্রতি বিক্রি হচ্ছে ২৬০ টাকা। ৮শ’ গ্রামের পাকিস্তানি কক মুরগি বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকা প্রতিটি এবং দেশি মুরগি বিক্রি হচ্ছে ২৮০ টাকা দরে।
তবে সব ধরনের ডিমের দাম আগের মতোই আছে।
হঠাৎ বেড়েছে সবজির দাম
শনিবার থেকে শুরু হওয়া রমজানকে সামনে রেখে হঠাৎ করে বেড়ে গেছে সব ধরনের সবজির দামও। শুক্রবার প্রায় সব ধরনের সবজির দাম কেজিপ্রতি ১০ টাকা থেকে ১৫ টাকা করে বেড়েছে।
তবে সব চেয়ে বেড়েছে টমেটো, শসা এবং বেগুনের দাম।
গত সপ্তাহের ৭০ টাকার টমেটো এখন কেজিপ্রতি প্রায় দ্বিগুণ ১২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। শসা কেজিপ্রতি ২০ টাকা বেড়ে ৪৫ টাকা থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একই অবস্থা বেগুনের ক্ষেত্রেও। ৪০ টাকার বেগুন কেজিপ্রতি ৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।
এছাড়া গত সপ্তাহের তুলনায় কেজিপ্রতি ১০ টাকা করে বেড়ে বিক্রি হচ্ছে পটল ৪০ টাকা, ঢ্যাড়স ৩০ টাকা এবং মরিচ ৮০ টাকা থেকে ৯০ টাকায়।
মাছের ইচ্ছা মতো দাম হাকাচ্ছেন খুচরা বিক্রেতারা
মাছের বাজারে গিয়ে দেখা গেছে, ক্রেতার কাছ থেকে ইচ্ছা মতো দাম আদায় করছেন খুচরা বিক্রেতারা। বাজার দরের কোনো তোয়াক্কাই করছেন না তারা।
নিউমাকের্ট কাঁচাবাজারে ৫ থেকে ৬টায় এক কেজি ওজনের গলদা চিংড়ি বিক্রি করা হচ্ছিল ১৫শ’ থেকে ১৬শ’ টাকায়। অথচ সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে একধাপে ৫শ’ টাকা কমিয়ে বিক্রেতা এর মূল্য চান ১১শ’ টাকা।
এ বাজারে প্রতিটি ৭শ’ থেকে ৮শ’ গ্রামের ইলিশ মাছ বিক্রি হচ্ছে ৯০০ টাকায়। কেজিপ্রতি দেশি রুই মাছ ২৮০ থেকে ৩০০ টাকা, শিং মাছ ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা, চিতল মাছ ৬৫০ টাকা থেকে ৭০০ টাকা এবং তেলাপিয়া মাছ ২০০ থেকে ২১০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
এছাড়া ৫ কেজি ওজনের দেশি কাতলা বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৫৫০ টাকা থেকে ৬০০ টাকা। দুই থেকে তিন কেজি ওজনের দেশি কাতলা বিক্রি হচ্ছে ৩০০ টাকা থেকে ৩৫০ টাকা কেজি দরে।
বোতলজাত ভোজ্যতেলের সংকট
শবেবরাতের পর থেকেই বাজারে বিভিন্ন ধরনের ভোজ্যতেলের সংকট দেখা দিয়েছে। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, তারা তাদের স্থানীয় ডিলারের মাধ্যমে রমজানকে সামনে রেখে পর্যাপ্ত তেল পাচ্ছেন না।
তেল সরবরাহ কম থাকার এ অজুহাতে তেলের মূল্য নেওয়া হচ্ছে, গায়ের দামের চেয়ে বেশি। ৬৭০ টাকার ৫ লিটার বোতলজাত তেল বিক্রি করা হচ্ছে ৭০০ টাকায়।
তবে পাম তেল বিক্রি লিটার প্রতি ১০৫ টাকা।
এ বিষয়ে খুচরা তেল বিক্রেতা তোফায়েল স্টোরের মালিক রবিউল ইসলাম বাংলানিউজকে বলেন, ‘‘শবেবরাতের পর থেকে তীর এবং রুপচাঁদা বোতলজাত সয়াবিন তেল আমরা পাচ্ছি না। ডিলাররা সংকটের কথাসহ বিভিন্ন অজুহাতে আমাদের তেল দিচ্ছেন না।’’
তিনি অরো বলেন, ‘‘এখানে তীর মার্কা তেল আসে ৫০ কার্টুন বা ২০০ পিচ। আর আমাদের এ বাজারে দোকানের সংখ্যাই এর চেয়ে অনেক বেশি।
এ বিষয়ে তীর কনজ্যুমার পরিবেশক মো: হারুনার রশিদ বাংলানিউজকে বলেন, ‘‘বিজিবি-পুলিশকে তেল দিতে গিয়ে আমাদের তেলের সংকট দেখা দিয়েছে। খুব তাড়াতাড়ি এ সমস্যার সমাধান হবে।‘’
রসুন, পেঁয়াজ, শুকনা মরিচ, চিনির দাম স্থিতিশীল
সব ধরনের রসুন, পেঁয়াজ, শুকনা মরিচ এবং আদা অবশ্য গত সপ্তাহের দামেই বিক্রি হচ্ছে।
খুচরা বাজারে প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ ৩৪ থেকে ৩৫ টাকা এবং ভারতীয় পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ২৫ টাকা। দেশি রসুন ৫০ টাকা এবং চায়নিজ রসুন ৯০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
শুকনা মরিচ ১৪০ টাকা থেকে ১৫০ টাকা এবং চিনি আগের মতোই ৫৪ থেকে ৫৫ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে।
পাইকারি শ্যামবাজারের ফরাশগঞ্জ রোডের মেসার্স রাজ ট্রেডিংয়ের মালিক হাজী মো: মাজেদ বাংলানিউজকে বলেন, ‘‘সব পণ্যের দাম আগের মতোই কম আছে। যেমন, আমরা প্রতি কেজি ভারতীয় পেঁয়াজ ১৩ থেকে ১৭ টাকা এবং দেশি পেঁয়াজ ২৪ টাকায় দিচ্ছি।’’
ডালের দামও বেড়েছে
ডালের সর্ববৃহৎ পাইকারি বাজার চকবাজারের ডালপট্টিতে গিয়ে দেখা গেছে, কেজিপ্রতি মশুর ডাল ১০৫ থেকে ১০৮ টাকা, মুগডাল ৮০ থেকে ১০৬ টাকা, খেসারি ৪৬ টাকা থেকে ৫১ টাকা, বুটের ডাল ৯৩ থেকে ৯৫ টাকা এবং ছোলা বিক্রি হচ্ছে ৭৩ থেকে ৮০ টাকা।
খুচরা বাজারে এসে সেসব ডালের দাম নেওয়া হচ্ছে কেজিপ্রতি মশুর ডাল ১১৫ টাকা, মুগডাল ১২০ টাকা, খেসারি ৫৫ টাকা, ছোলা ৮৫ টাকা থেকে ৯০ টাকা এবং বুটের ডাল ১০০ টাকা দরে।
বাংলাদেশ সময়: ১৯৩৪ ঘণ্টা, জুলাই ২০, ২০১২
এমআইএস/ সম্পাদনা : অশোকেশ রায়, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর