 |
অনেকের মতো আওয়ামী লীগের প্রতি আমার এক ধরনের মোহ ছিল। অনেকটা কিশোরবেলার প্রেমের মতো। আমি যখন আওয়ামী লীগের সমালোচনা করি তখন মনে হয়, নিজের বুকেই ছুরি চালাচ্ছি। বুক ভাঙা কষ্ট ভোগ করছি। এবার দলটি ক্ষমতায় এসে এমন সব কাণ্ড করছে সমালোচনা না করে উপায়ও নেই। সেদিন একজন মন্ত্রী বললেন, মিডিয়া আমাদের এত সমালোচনা করছে কেন? জবাব দিলাম, আপনাদের ১৮টি টেলিভিশন আছে। সমস্যা কী? পাল্টা প্রচারণা চালান। একই দিন ফোন পেলাম সরকারের প্রভাবশালী আরেকজনের। তিনি জানতে চান, দীপ্ত বাংলা টিভি কার? আমি বললাম, জানি না। চিনি না। আওয়ামী লীগ শাসনকালে এবার নিত্যনতুন নাম শুনছি। তাদের কেউ হবে হয়তো। তাকে পাল্টা প্রশ্ন করলাম, দীপ্ত বাংলা দিয়ে আপনার কী কাজ? তিনি বললেন, এই টিভিটির বেচাকেনার কথা চলছে। আওয়ামী লীগ গণমানুষের একটি দল। নেতা-কর্মী, সমর্থক, শুভানুধ্যায়ীদের শ্রম, মেধা, ঘাম আর ভালোবাসায় এই দলটি প্রতিবার ক্ষমতায় আসে। কিন্তু দায়িত্ব পেয়েই দলটি বদলে যায়। তখন এই দলটি পরিণত হয় সুবিধাবাদী একটি গোষ্ঠীর ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে। এবার সবকিছুকে ছাড়িয়ে গেছে। অনেকটা মহামারীর মতো ব্যাংক, বীমা, বিশ্ববিদ্যালয়, মাছের ট্রলার আর টেলিভিশন বেচাকেনার লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে যাকে তাকে। মুক্তিযুদ্ধ ও দেশের অনেক গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী একটি দলের পরিণতি কেনএমন হবে? কেউ জবাব দিতে পারছে না। আসলে আওয়ামী লীগ খেতে জানে না। খাওয়াতেও জানে না। টিভি লাইসেন্স বেচাকেনার মতো ভয়াবহ কাজ কোনো সুস্থধারার ক্ষমতাসীন দল করতে পারে না। আওয়ামী লীগ এই কাজটি এবার করেছে আনন্দ উৎসব নিয়ে।
টেলিভিশনের নিত্যনতুন লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে। শুনতে পাচ্ছি আরও নাকি ৬টি দেওয়া হবে। জমজমাট ব্যবসা। একদল লোক লাইসেন্স নেয়। পরে টুকরিতে করে ফেরিওয়ালার মতো বিক্রি করে হাটবাজারে। দরদাম খারাপ নয়। বেচা ভালোই হয়। সভ্য দুনিয়াতে এমন ব্যবসা আর দেখিনি। অতীত, বর্তমানে কেউ দেখেছেন বা শুনেছেন কিনা জানি না। দায়িত্ববান ও ক্ষমতাবানরা নিজেদের ইচ্ছামতো যা তা করছেন। ক্ষমতার অপব্যবহারের একটা সীমা আছে। সব সীমা লঙ্ঘন করে টিভি লাইসেন্স নিয়ে এবার ব্যবসা-ব্যবসা খেলা হচ্ছে। তারপরও লাইসেন্স দেওয়া ১৮টি টিভির একটিও আওয়ামী লীগের কাছে নেই। ক্ষমতাবানরা এমনই দেউলিয়া একটি টিভিও নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেনি।
খ্যাতিমান টিভিব্যক্তিত্ব হানিফ সংকেত বললেন, সরকার বদল হয়, নতুন নতুন টিভি মালিকের নাম শুনি। চেহারা দেখি। টিভি তারা বুঝুক আর না বুঝুক। হানিফ সংকেতের সঙ্গে আমিও একমত। টিভি লাইসেন্স এখন মধ্যস্বত্বভোগী, ফরিয়া, দালালদের হাতে। প্লটবাণিজ্য, বালুমহাল, হাওর, টেন্ডারবাণিজ্য, আর খাস জমি ইজারা ও দখলের মতোই রেডিও, টিভি লাইসেন্স এখন একটি ব্যবসা। পেশাদারিত্বের কবর রচনা হচ্ছে টিভি মিডিয়ায়। গণমাধ্যম নিয়ে এমন হাসি-ঠাট্টা অতীতে কেউ করেনি। টকশো নিয়ে সরকার উদ্বিগ্ন। তারপরও থেমে নেই টিভি লাইসেন্স বিক্রির ব্যবসা। এই অস্বাভাবিক বেচাকেনার ব্যবসা না করে বিটিভি বিক্রি করে দেওয়া অনেক ভালো। দেশবাসী রেহাই পাবে। কমিশনও খারাপ পাওয়া যাবে না। অহেতু বেসরকারি টেলিভিশনের লাইসেন্স দিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রয়োজন নেই। কারণ, ক্ষমতার অপব্যবহারের ইতিহাস কখনো ভালো হয় না। আসলে ইতিহাস থেকে আমরা কেউ শিক্ষা নেই না। `৭৪-এর বিশেষ ক্ষমতা আইনের প্রয়োগ বেশি হয় আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে। আর এখন নিজেদের করা দ্রুত বিচার ট্রাইবুনালের শিকার হচ্ছে বিএনপি।
পাদটীকা : চাণক্যর একটি কথা আছে, `অত্যন্ত রূপবতী হওয়ার কারণেই সীতার অপহরণ হয়েছিল, বেশি অহংকার থাকার কারণেই রাবণ মারা গিয়েছিল, অত্যধিক দান করার কারণেই রাজা বলিকে কষ্ট ভোগ করতে হয়েছিল । এ জন্য চাণক্য ইতিহাস টেনে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন, প্রতিটি কাজের একটা সীমা থাকে। যখন সেই সীমা অতিক্রম করে যায়, তখন ব্যক্তিকে কষ্ট ভোগ করতে হয়। সীতা ছিলেন সীমাহীন রূপসী। নিজের শক্তি নিয়ে রাবণ ছিলেন দাম্ভিক। আর রাজা বলির ইতিহাস ভিন্ন। তিনি ছিলেন দানশীল। এ কারণে তার অতি খ্যাতি নিয়ে স্বর্গের দেবতারা চিন্তিত হয়ে ওঠেন। ভগবান বিষ্ণু ব্রাহ্মণের রূপ নিয়ে রাজা বলির কাছে তিন পা জমি দান হিসেবে চান। রাজার বলির গুরু শুক্রাচার্য তাকে নিষেধ করলেন কোনো বামনকে তিন পা জমি দান করতে। গুরুর কথা শুনলেন না রাজা। তিনি তিন পা জমি দান করলেন। কৌশলে সেই বামন তিন পা জমির রূপে পৃথিবী, স্বর্গ আর পাতাল তিন লোককে মেপে নেন। আর রাজা বলিকে বানান পথের ভিখারি।
সৌজন্যে: বাংলাদেশ প্রতিদিন
বাংলাদেশ সময় ১১৩৪ ঘণ্টা, জুন ২১, ২০১২
এমএমকে- menon@banglanews24.com;
জুয়েল মাজহার, কনসালট্যান্ট এডিটর
jewel_mazhar@yahoo.com