 |
| ছবি : জীবন আমীর /বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম |
নিশ্চিন্তপুর (আশুলিয়া) থেকে: রাজধানীর অদূরে আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরে এখন শোকের মাতম। এই এলাকার তাজরীন ফ্যাশনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। এতে শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছে। নিহত এসব মানুষের স্বজনদের গগনবিদারী কান্না ও আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠেছে নিশ্চিন্তপুর। দূর-দূরান্ত থেকে স্বজনরা নিতে এসেছেন প্রিয়জনের অগ্নিদগ্ধ লাশ।
অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাতের পরপরই আশপাশের এলাকা থেকে ছুটে আসে হাজারো মানুষ। তারা তাজরীন ফ্যাশনের চারপাশে ভিড় জমায়, উৎসুক মানুষকে সামাল দিতে হিমশিম খেতে হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে।
পোশাক কারখানাটিতে দাউ-দাউ করে আগুন জ্বলতে দেখে বিলাপ করছেন নিখোঁজদের স্বজনেরা। রাতভর তারা প্রিয় জনকে ফিরে পাবার আশায় অপেক্ষার প্রহর গোনে। কিন্তু রাত আর শেষ হয় না।
রাত যত গভীর হতে থাকে আগুনের তীব্রতা কমতে থাকে, দমকল বাহিনী অনেক চেষ্ঠার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে কিন্তু ভোর পর্যন্ত ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন করে রাখে পোশাক কারখানাটি। সূর্যোদয়ের কিছুক্ষণ আগে আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয় দমকল বাহিনী।
সকালের আলো ফোটার আগেই হাজার হাজার মানুষ ছুটে আসে ঘটনাস্থলে। এরই মধ্যে জানা যায়, সেনাবাহিনী লাশ উদ্ধারের সার্বিক দায়িত্ব নিচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যে নবম পদাতিক ব্রিগেডের একটি দল ঘটনাস্থলে আসে, আসে বর্ডার গার্ড (বিজিবি), এপিবিএন, র্যাবসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা।
সেনাবাহিনী লাশ উদ্ধারে কাযক্রম শুরু করে, এর কিছু সময় আগে পোশাক কারখানার নয়তলা ভবনটির বিভিন্ন ফ্লোরে গিয়ে দেখা যায়, লাশ আর লাশ। বেশিরভাগ লাশ পুড়ে বিকৃত হয়ে গেছে। কোনো কোনোটি একেবারে কাঠ-কয়লা।
দমকল বাহিনীর সদস্যদের চোখেও পানি ঝরতে দেখা যায়, তারাও তাদের আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। তিন তলাতেই সবচেয়ে বেশি লাশ। দমকল বাহিনী সেখানে খুঁজে পায় ৬৯টি লাশ। বেশির ভাগই পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। ঘনিষ্ঠ স্বজনরাও শনাক্ত করতে পারছেন না। এসব লাশ কার? বাবা-মা, ভাই-বোন, স্ত্রী, পুত্র-কন্যা কারো পক্ষেই লাশ শনাক্ত করা সম্ভব না। জীবন্ত মানুষকে ‘দাহ’ করা হয়েছে।
পুড়ে যাওয়া শতাধিক কালো কুচকুচে ‘কঙ্কাল’ বা মৃতদেহ নিশ্চিন্তপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে রাখা হয়েছে। আগুনের লেলিহান শিখায় এই হতভাগ্যদের শরীর থেকে মাংস মমের মতো গলে গলে খুলে গেছে। শরীরে মাংসের কোনো চিহ্ন নাই, দমকল বাহিনীর পোশাক কারখানায় ব্যবহৃত পানির সঙ্গে রক্ত-মাংস, অস্থি-মজ্জা একাকার হয়ে গেছে। দেখা যায়, বিভিন্ন ফ্লোরে জমে আছে ঘন গাঢ় জমাটবদ্ধ রক্ত-মাংসের আস্তরণ। হাঁটতে গেলেই জুতার তলায় লেগে যায়।
জলন্ত চিতায় জীবন্ত মানুষকে দাহ
মৃত মানুষকে দাহ করতে লাগে কাঠ ও কেরোসিন জাতীয় দাহ্য পদার্থ, কিন্তু এদের ক্ষেত্রে কিছুই লাগেনি। আগুনের আঁচেই হতভাগ্যরা পুড়ে গলে নিঃশেষ হয়ে গেছে। বিভিন্ন ফ্লোর ঘুরে দেখা যায়, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে নিহত পোশাকশ্রমিকদের হাড়গোড়।
কত স্বপ্ন নিয়ে না দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে তারা ঢাকায় ছুটে এসেছিল রাজধানী ঢাকার উপকণ্ঠ আশুলিয়ার এই নিশ্চিন্তপুরে। এসেছিল জীবন-জীবিকার তাগিদে, জীবনের নিশ্চিয়তায়। পরিবার পরিজন ও প্রিয়জনদের মুখে হাসি ফোটাতেই তারা সদ্য ব্যস্ত ছিল। কখনও ভাবতে পারেনি নিজের জীবনের বিসর্জন দিতে হবে এভাবে। এভাবে নিশ্চিন্তপুরে অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে কিছু জীবন? কোনো কোনো পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিও আগুনে ছাইয়ে মিশে গেছেন।
চারতলায় গিয়ে দেখা গেছে, সেখান থেকে দমকল বাহিনী উদ্ধার করেছে ২১টি মৃতদেহ। ‘দেহ’ তো নেই, সেটা পুড়ে পুরোটাই ছারখার।
পাঁচতলায় পড়ে থাকতে দেখা যায়, ১০ জন পোশাকশ্রমিকের লাশ। রোববার সব মিলিয়ে পুরো পোশাক কারখানায় দমকল বাহিনী ১০১টি মৃতদেহ পাওয়া যায়। দমকল বাহিনীর সহায়তায় লাশগুলো কফিনব্যাগে ভরে জড়ো করা হয় নিশ্চিন্তপুর প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে। সেনাবাহিনী ৪২টি লাশ হস্তারণ করেছে নিহত স্বজনদর কাছে।
৫৮টি লাশ শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। তাই এসব লাশ বেওয়ালিশ হিসেবে তুলে দেওয়া হয়েছে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের কাছে।
নিশ্চিন্তপুর স্কুলমাঠ এখন জনারণ্য। হতভাগ্য পরিবারগুলোর সদস্যরা খুঁজে ছুটে আসছে এখানে। কিন্তু স্বজনের লাশ তো চেনা যাচ্ছে না।
বাংলাদেশ সময়: ১৪৩৫ ঘণ্টা, নভেম্বর ২৫, ২০১২
এআর/জেএস/আরআর