 |
সকালবেলা এক হালি মুরগির ডিম কিনতে বাড়ির পাশের মুদিখানাটাইপ ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে ঢোকামাত্র সেখানকার কর্মচারী ছোকরা টুল ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। তার চোখমুখ জুড়ে কেমন যেন একটা সমীহের ভাবও ছড়িয়ে পড়ল সাথে সাথে। নতুন শাহ্ চকিতে পেছনে তাকাল, নাহ্ তার পেছনে তো কেউ নাই! তাহলে, ছেলেটা কি তাকে দেখেই এভাবে দাঁড়িয়ে পড়ল! কিন্তু গত দেড় বছরে তো ছেলেটা এমন কোনো আচরণ দেখায় নাই তাকে। এই দেড় বছর ধরে সে এই দোকান থেকেই কেনাকাটা করছে প্রতিদিন- চাল, ডাল, নুন, তেল, ডিম, ভিম, পাউরুটি, নুডুলস। কই ছেলেটাতো কখনোই তাকে দেখে উঠে দাঁড়ায় নাই! এমনকি হেসে কথাও বলে না। সে যে এই দোকানের এমন একজন বাঁধা কাস্টোমার সেই সুবাদেও সে কোনো এক্সট্রা ট্রিটমেন্ট পায় নাই। বরং সে কিছু কিনতে আসলে ছেলেটা এমন তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে তাকে জিনিসপত্র সরবরাহ করে, যেন সে টাকা না দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সব। আবার কখনো কখনো ছেলেটার চোখে মুখে এমন একটা বিরক্তির ভাব ঝুলে থাকে যার মানে হলো- এই সামান্য টাকার জিনিস কিনতে এসে তাকে কেন বিরক্ত করা বাপু, অন্য দোকান কি চোখে দেখ না!
তারপরও নতুন শাহ্ এই দোকানে আসে। অনেকটা বাধ্য হয়েই আসে, কারণ তার আশেপাশে আর কোনো দোকান নাই। ছেলেটাকে দাঁড়িয়ে পড়তে দেখে নতুন শাহ্ তাই একটু দ্বিধায় পড়ল সে দোকানে ঢুকবে কি-না! আধপোড়া সিগারেটটায় ঘন ঘন দুটো টান দেয়। ছেলেটা নিশ্চয়ই তাকে জ্বলন্ত সিগারেট হাতে দোকানে ঢুকতে দেবে না তাই বাধা দিতে দাঁড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু এই মুহূর্তে তার সিগারেটটা ফেলতে ইচ্ছে করছে না। পুরো আট টাকা দাম সিগারেটটার। এভাবে ফেলে দেয়া যায় না। তাই সে রাস্তায় দাঁড়িয়ে সিগারেটে ঘন ঘন টান লাগাচ্ছে। এমন সময় ছেলেটা টুথ পেস্টের বিজ্ঞাপনের মতো সবগুলো দাঁত বের করে হেসে বলল, আসেন স্যার কি লাগবে?
একেবারে স্যার! একি তাকে বলছে! এতোদিনে একবারও স্যার তো দূরের কথা ভাই বলে ডেকেছে বলেও তো মনে হয় না। নতুন শাহ্ আবারও একবার পেছনে ফিরে দেখল আর কেউ এসেছে কি-না দোকানে। কিন্তু না সে একাই তো। ছেলেটা নিশ্চয়ই তার সঙ্গে ঠাট্টা করছে। বা তাকে ইয়ার-দোস্ত টাইপ ভেবে এভাবে সম্মোধন করছে! কিন্তু কেন? শত হলেও সে নিজেকে একজন ইন্টেলেকচুয়াল ভাবে। তাকে ছেলেটা এভাবে উপহাস করে কিভাবে! নিশ্চয়ই তার ব্যক্তিত্ব ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে। নইলে এরকম একটা ছেলে..., এটা কীভাবে সম্ভব!
নতুন শাহ্ দোকানের দেয়া জিনসপত্রগুলো হাতে নিতে নিতে আরো গম্ভীর স্বরে বলল, কত হইছে দাম?
ছেলেটা তখন বলল, আপনারে কাইল টিভিতে দেখলাম স্যার। আপনি হুমায়ূন আহমদের কফিন দেখতে শহীদ মিনারে গিয়া টিভির সাংবাদিকের লগে কথা কইলেন; আপনিও তো দেখি একজন লেখক! আসলে কি জানেন স্যার লেখক গো যে এতো দাম এইডা হুমায়ূন সাহেব না মরলে বুঝতে পারতাম না।
নতুন শাহ্র কাছে এবার বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে গেল। হ্যাঁ, কালকে সে ধরে-পড়ে তার বন্ধু বাংলাটিভির বজলুর মাধ্যমে তার একটা টুকরো মতামত দিয়েছিল বটে। আর সেই কারণে যে সে রাতারাতি এমন গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হয়ে উঠবে ভাবতেই পারে নাই। টেলিভিশনের এত পাওয়ার! সে এতো বছর ধরে কাকের ঠ্যাং, বকের ঠ্যাং এতো কিছু লিখে চলেছে কিন্তু কেউ তাকে কোনো পাত্তা দেয় নাই। আর একদিন সে টেলিভিশনে একটু মুখ দেখাল, আর রাতারাতি হিরো! নতুন শাহ্ তখনই ডিসিশান নিয়ে ফেলল, ওই সব ছাইপাশ যা সে এতোদিন লিখত, আর সেই লেখা ছাপানোর জন্য পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদকদের দোরে দোরে ধন্না দিত সেসব সে এখন থেকে আর লিখবে না। বরং সে রাতারাতি সেলিব্রিটি হওয়ার চেষ্টা করবে এখন থেকে। সে টিভি টক-শোতে যাবে। সেখানে গিয়ে দু’লাইন বাকোয়াস করবে সঙ্গে সঙ্গে কম করে হলেও দু’লাখ লোক তাকে চিনে ফেলবে। এর চেয়ে বুদ্ধিজীবী হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার সহজ উপায় আর কি হতে পারে। কিন্তু টকশোতে যাওয়ার উপায় টা কি?
নতুন শাহ্ এবার একটা রাজনৈতিক টকশোতে যাওয়ার জন্য আঁটঘাট বেঁধে লেগে পড়ল। টক শোতে যাওয়ার নানাবিধ তরিকা সে খুঁজে বের করতে লাগল। তবে তার মতো মাটিধরা ম্যান্দামারা লেখকের জন্য টক শো পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য সব তরিকার একমাত্র তরিকা হলো মডারেটর অথবা প্রযোজকের সঙ্গে হাত করা।
পাওয়ারফুল মডারেটর প্রযোজকের কাছে সুপারিশ করামাত্র সে ঢুকে পড়তে পারে বোকা বাক্সের স্টুডিওতে, বা পাওয়ারফুল প্রযোজক তাকে ইনভাইট করলে তো কথাই নেই। নতুন শাহ্ ইদানিং তার টিভি সাংবাদিক বন্ধুদের খুব তেল মারছে। শুধু তেল মারা না, গাটের পয়সা খরচ করে কঋঈ, হ্যালভেশিয়ার মতো গলাকাটা ফ্রান্সাইজড রেস্টুরেন্টে ভুড়িভোজ করাচ্ছে। যদি একবার চান্স মেলে তো সব পয়সা উসুল। এছাড়া প্রতিরাতে সে টকশোর জনপরিচিত টকেটিভদের কথা কৌশল আয়ত্ব করছে। আর পরের দিন গিয়ে তার টিভি সাংবাদিক বন্ধুদের আড্ডায় আবার সেই ভঙ্গিতে কিছু কথার প্রাকটিস করে নিচ্ছে। অবশেষে একদিন তার অতিসম্প্রতি গিট্টুবাঁধা প্রাণপ্রিয় বন্ধু বাংলা টিভির বজলু সুখবরটা দিল।
দোস্ত তোমার ভাগ্যটা অবশেষে খুলতে যাইতেছে মনে হয়।
কিভাবে, কিভাবে? সুখবরটা শোনার জন্য নতুন শাহ্র নিঃশ্বাসটা প্রায় গলার কাছে এসে আটকে আছে। আর একটু হলেই দম বন্ধ হয়ে যায় অবস্থা।
তার অবস্থা দেখে বজলু আর দেরি করে না, বর্ষাকালে ভারতের বাঁধের স্লুইস গেট খুলে দেয়ার মতো খবরটা শোনায় বজলু।
শোন দোস্ত, অনেক কষ্টে বিসর্গ চ্যানেলের বাশার ভাইরে রাজি করাইছি। সামনে জীবনানন্দ দাশের জন্মবার্ষিকী আসতেছে। তো সেই উপলক্ষে একটা বিশেষ টকশো আয়োজন করতে বলছি।
নতুন শাহ্র স্লুইস গেটটা যেন হুট করে বন্ধ হয়ে গেল। বলল, কিন্তু দোস্ত ওইটা তো পলিটিক্যাল টক শো হবে না।
আরে আগে আমার কথাটা শেষ করতে দাও না! শোন, তুমি হইলা গিয়া সাহিত্যের লোক। সমাজ, রাজনীতি এগুলার সঙ্গে তো তোমার সরাসরি কোনো সংশ্রব নাই। তাইলে তোমারে ওরা রাজনীতিবিদদের চরিত্র হনন করতে বা মরতে বসা দ্যাশেরে অক্সিজেন দিতে ডাকবে ক্যান? তোমারে যাতে ডাকে সেই জন্য তো বাশার ভাইরে আমি এই আইডিয়াটা দিলাম। আরো বললাম অরে কোনো টাকা পয়সাও দিতে হবে না।
তা বাসার ভাই কি বলল?
কি আর বলবে, আইডিয়া খাইছে মনে হইল। বলল, ‘করমুনে, এমন একটা আয়োজন তবে একটা শর্ত আছে।’
শর্ত! শর্তটা কি?
শর্তটা হইল- আলোচনা হবে বনলতা সেনের রাজনৈতিক পরিচয় লইয়া।
মানে? বনলতা সেনের আবার রাজনৈতিক পরিচয় কি?
আপাত দৃষ্টিতে হয়ত কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নাই, তবে তোমারে কথার মারপ্যাচে এরে একটা দলে ঢুকাইয়া দিতে হবে।
এইটা কিভাবে সম্ভব!
সেইটা তুমি বাশার ভাইর সাথে আলোচনা কইরা ঠিক কইরা লও। আর শোন, একটু লেখাপড়া করো। আর শোনো নাই সেদিন অধ্যাপক মিনতিয়াজ আহমেদ কি কইছে? কইছে, টক শোতে যারা আসে তারা যেন একটু লেখাপড়া কইরা আসে। কথাটা বাশার ভাইরও প্রাণে খুব ধরছে। আর তারে কনভিন্স করতে না পারলে পরবর্তী শোগুলাতে তো ডাক পাবা না।
কথাটা সত্য মডারেটর বা প্রযোজকরে কনভিন্স করা জরুরি। কিন্তু এরা যদি এমন উদ্ভট আবদার করে তাহলে কেমনে হয়! রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিজ্ঞানের কিছু কিছু আবিষ্কারে তিতি বিরক্ত হয়ে বিজ্ঞানকে বলেছিলেন যা-তা। আর এই এলেবেলে টক শো দেখলে কী বলতেন খোদা মালুম! নতুন শাহ্ বিষয়টা নিয়ে বিশাল বিপদে পড়ে গেছে। সে রাজনীতি খুব একটা বোঝে না। কিন্তু টকশোতে গিয়ে হিট হইতে হইলে তাকে রাজনীতি নিয়েই কথা বলতে হবে। ওদিকে মডারেটর বাশার ভাই আবার জীবনানন্দ দাশ বলতে বনলতা সেনই চেনে। তাই বনলতা সেন থেকেই রাজনীতিকে টেনে বের করে আনা চাই। ওদিকে দেশের স্বনামধন্য অর্থনীতিবিদ হাসমত আলী পাঠান বনলতা সেনকে বারবণিতা বলে ধরে নিয়েছেন। বারবণিতার অর্থনৈতিক ও নৃতাত্ত্বিক সম্পর্কের একটা বিশ্লেষণ চক্ষু বন্ধ কইরা দেখাইলেও রাজনৈতিক কোনো ব্যাখ্যা দেন নাই তিনি। এখন তার রাজনৈতিক পরিচয় নতুন শাহ্কেই দিতে হবে। তাও আবার টিভি লাইভ টকশোতে। আহারে তার কপালটাই খারাপ। জীবনানন্দ দাশের জন্মদিনে ডাক না পড়ে যদি তার রবীন্দ্রনাথ বা নজরুলের কোনো পারপাসে ডাক পড়ত তাহলে তাও বা কিছু বলা যেত। কিন্তু জীবনানন্দ দাশ কেন। আবার তাঁর এতো রাজনৈতিক কবিতা থাকতে বনলতা সেনই বা কেন? সুরঞ্জনার কথা হইলেও কিছু বলা যাইত।
সুরঞ্জনা ওইখানে যেও নাকো তুমি
বলো নাকো কথা ওই যুবকের সাথে
কী কথা তাহার সাথে
তার সাথে।
পুরা পঙক্তিগুলার মধ্যে একটা রাজনীতি আছে। এরে নিয়া বিস্তর রাজনৈতিক বাৎচিৎ করা যাইত। এর মইধ্যে হুমকি আছে, ধমকি আছে, চোখ রাঙানি আছে, পেশীশক্তির জোর দেখাবার সুযোগ আছে, মানবাধিকার লঙ্ঘনের ব্যাপার আছে। কিন্তু বিসর্গ চ্যানেলের বাশার ভাই বনলতা সেন ছাড়া আর কাউরে মানতে নারাজ। নতুন শাহ্ এই বিষয়ে তার সাথে কথা বরতে গেলে সে বলল, রাজনৈতিক আলোচনা ঠিক তোমাদের কাজ না বুঝলা। তোমরা সাহিত্য কর তাই করতে থাক, কেন যে শুধু শুধু পলিটিক্যাল টকশোতে নাম লেখাইতে চাও বুঝি না।
বাংলাটিভির বজলু তখন পাশ থেকে চোখ টিপে বলে, শুধু শুধু বারগেইন করে কোনো লাভ হবে না। বাশার ভাই জীবনানন্দের বনলতা সেন ছাড়া আর কাউরে চেনে না। ওইটা ওনার সিলেবাসে ছিল তো! টিভিতে মুখ দেখাইতে হইলে ওকেই রাজনীতির লাইনে ঢুকাইয়া দিতে হবে।
বনলতা সেনকে কিভাবে রাজনীতিতে ঢুকাবে এই ভাবনা চিন্তা করতে নতুন শাহ্র কয়েকদিন কেটে গেল। মাথায় কিছুই আসে না।
অবশেষে প্রোগ্রামের দিন সকাল বেলা গোসল করতে গিয়ে মাথায় শাওয়ারের পানি পড়তেই মনে হলো এই তো পেয়ে গেছি! কবিতার প্রথম লাইনেই তো আছে রাজনীতি। ‘হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,’- একে কতভাবেই না ব্যাখ্যা দেয়া যায়! এতোখানি সরাসরি রাজনীতি তো অনেক বড় বড় বিপ্লবী কবিতাতেও নাই। নতুন শাহ্ মহাউৎসাহে লাইনের পর লাইন সাজিয়ে রাজনৈতিক সম্পর্ক বিশ্লেষণে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সাথে চলতে থাকে তার পোষক নির্বাচন। এতোদিন ধরে খুঁজে খুঁজে কিনে আনা পাঞ্জাবি, জিন্স, চটি সাজিয়ে রাখে একের পর এক।
নতুন শাহ্ সন্ধ্যাবেলা সাজপোশাক শেষ করে শিস দিতে দিতে টিভি অফিসের দিকে রওনা হতে যাবে এমন সময় ফোনটা বেজে ওঠে। স্ক্রিনে বাংলা টিভির বজলু। নতুন শাহ্ ফোনটা কানে ধরে ব্যস্ত ভঙ্গিতে বলে, আসতেছি দোস্ত দেরি করব না, জানি তো লাইভ শো।
ওপাশ থেকে বাংলা টিভির বজলু আরো দ্রুত গতিতে বলল, আসতে হবে না দোস্ত, আজ প্রোগ্রামটা ক্যানসেল হয়ে গেছে। সরি দোস্ত!
বাংলাদেশ সময়: ১৬৩০ ঘণ্টা, ১৭ আগস্ট, ২০১২
সম্পাদনা: এম জে ফেরদৌস, নিউজরুম এডিটর mjferdous0@gmail.com