 |
বাংলাদেশের সমকালীন নাট্যচর্চায় নিরন্তর চলছে পরীক্ষা-নিরীক্ষা। সেলিম আল দীন থেকে ইবসেন, শম্ভুমিত্র থেকে শেক্সপিয়ার; কালজয়ী সব নাট্যকারের নাটক নিয়েও নিরীক্ষা চলছে। পাশ্চাত্যের নাটককে উপস্থাপন করা হচ্ছে দেশীয় নাট্য আঙ্গিকে, আবার দেশীয় লোকগাঁথা উপস্থাপন করা হচ্ছে পাশ্চাত্যের আঙ্গিকের মিশেল ঘটিয়ে। এতে দর্শকও উপভোগ করছেন একই নাটকের ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশনা। এতে সমৃদ্ধ হচ্ছে বাংলাদেশের নাট্যচর্চা।
বাংলাদেশের নাট্যচর্চায় ‘ইন হাউজ’ নাট্য প্রযোজনার ধারনাটা খুব বেশী দিনের নয়। পৃথিবী জুড়ে নাটক নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা, এ দেশের নাট্যকমীরাও এগিয়ে চলছেন সমানতালে। রাজনৈতিক থিয়েটার, উঠান নাটক, পথ নাটক, মুক্ত নাটক এসব নিয়ে বাংলাদেশের নাট্যচর্চায় প্রচুর কাজ হয়েছে। সম্প্রতি সেই ধারায় যুক্ত হয়েছে ‘ইন হাউজ’ নাট্য প্রযোজনা। মূলত দলের নবীন নাট্যকর্মীদের দক্ষ করে তোলার ক্ষেত্রে এই কার্যক্রমটি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
ইন হাউজ নাট্যচর্চা শুরু করা অন্যতম দল হলো মনিপুরি থিয়েটার। দল প্রধান শুভাশিস সিনহা বাংলানিউজকে বলেন, ইন হাউজ কার্যক্রমটা আমাদের নবীন নাট্যকর্র্মীদের দক্ষ করে তোলার ক্ষেত্রে বিশাল ভূমিকা পালন করে। আমাদের নাট্যদলগুলো বছরে একটা বা দুইটা নাটক মঞ্চে নিয়ে আসে। ফলে দলের অনেক নবী ওন নিয়মিত নাট্যকর্মী দলের মূল প্রযোজনায় কাজ করার সুযোগ পায় না। ইন হাউজ প্রযোজনার মধ্য দিয়ে নবীন নাট্যকর্মীরা একটা নিরীক্ষাধর্মী নাট্য নির্মাণ প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত হয়ে নাটকের নির্মান বিষয়ক বাস্তব জ্ঞান অর্জন করে। আমরা মনে করি এ ধরনের কার্যক্রম প্রতিটা দলের মধ্যেই বাড়ানো উচিত। .
সম্প্রতি কাঁটাবনের প্রাচ্যনাটের মহড়া কক্ষে মঞ্চস্থ হয় ইন হাউজ নাট্য প্রযোজনা ‘জ্যাকিল এন্ড হাইড’। রবার্ট লুই স্টিভেনসনের লেখা নাটকটি নির্দেশনা দেন দলের তরুণ নাট্যকর্মী প্রদ্যুৎ কুমার ঘোষ।
নাটকের গল্পে দেখা যায়. হেনরি জ্যাকিল তার মধ্যে ভালো ও মন্দের একটা বিভেদ অনুভব করেন। মানুষের সামনে গৌরব নিয়ে চলার ইচ্ছার পাশাপাশি তার মধ্যে সুপ্ত থাকে এক প্রকার কু-প্রবৃত্তি। নিয়ম বিরুদ্ধ কার্য-কলাপগুলোকে দমন করতে না পেরে লজ্জায় সেগুলোকে গোপন করে রাখতেন হেনরি। এক সময় তার মধ্যে তৈরি হয় অন্তঃদ্বন্দ্ব, প্রকট হয়ে উঠে তার ভিতরকার দ্বৈতস্বত্ত্বা। তখন ড. জ্যাকিল ভাবতে থাকেন নিজের মধ্যে ভাল-মন্দের মিশ্রণকে জাগিয়ে রাখাটা যে কোন মানুষের জন্য অভিশাপ। তিনি সমস্যা সমাধানে মরিয়া হয়ে উঠেন এবং এক সময় টের পান, তার ভিতরে জমে থাকা কলুষিত স্বত্ত্বার ক্রীতদাসে পরিণত হচ্ছেন।
নাটক প্রসঙ্গে নির্দেশক প্রদ্যুৎ কুমার ঘোষ বলেন মানুষের দ্বৈত প্রবৃত্তির দ্বন্দ্বের এক রূপক কাহিনী রবার্ট লুই স্টিভেনসনের ‘ড. জ্যাকিল এন্ড হাইড’ আমরা আসলে পার্থিব বিষয়ের প্রতি মোহগ্রস্থ হয়ে সুখের সন্ধান করি। সুখের মোহাচ্ছন্নতা এক অজানা ব্যাধির মতো ক্ষতিগ্রস্থ করে চলেছে আমাদের পরম সুখ-শান্তি ও মানসিক ভারসাম্য। এটিই আমাদের এই ইন হাউজ নাটকের মূল প্রতিপাদ্য।
নাটকের বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন শাহরিয়ার রানা জুয়েল, আরিফ রেজা খান, আব্দুর রহিম খান, মাহবুবুল আলম অপু, দোলন শীল, প্রদ্যুৎ কুমার ঘোষ, শাহরিয়ার, শওকত হোসেন সজিব এবং ফরহাদ।
নাটকে অভিনয় প্রসঙ্গে শাহরিয়ার রানা জুয়েল বাংলা নিউজকে জানান, ইন হাউজ প্রযোজনা মূলত কর্মশালা পরবর্তী কাজ। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আমরা একটা নাটক নির্মাণ সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান অর্জন করছি। এখানে আমরা নবীনরাই নাটক নির্দেশনা দিচ্ছি, অভিনয় করছি, প্রপস তৈরি করছি, সেট ডিজাইন করছি, লাইট ডিজাইন করছি সব কিছুর মিশেলে একটা নাটক কিভাবে তৈরি হয়, সেটা প্র্যাকটিক্যালি শিখছি। দলের সিনিয়ার কর্মীরা টিকিট কেটে আমাদের নাটক দেখতে আসছেন। ইন হাউজ কাজগুলো বেশি বেশি হলে দলের নতুন কর্মীরা অনেক বেশিদক্ষ হয়ে উঠবে।
বাংলাদেশ সময় ১৬৫০, জুন ০২, ২০১২
সম্পাদনা : বিপুল হাসান, বিভাগীয় সম্পাদক