 |
প্রায় ছ’টা বাজে। বাইরে পড়ন্ত বিকেলের আলো। ভাবলাম একটা বিয়ার নিয়ে গিয়ে সুইমিং পুলের ধারে ডেক চেয়ারে গিয়ে বসি।
বারে গিয়ে বিয়ার নিলাম। বাইরে বেরিয়ে সামনের ছোট বাগান আর সুইমিং পুলটার উপর নজর বুলালাম। বাগানটা সুন্দর। সুন্দর লন। এজালিয়া’র (এক জাতের রডোডেন্ড্রন) বেড আর সারিবাঁধা কিছু পাম গাছ। বাতাসে পাম গাছগুলোর মাথা বেশ সশব্দে দুলছে। পড়ন্ত সূর্যের লালচে আলোতে মনে হচ্ছে গাছগুলোর মাথায় যেন আগুন ধরেছে।
সুইমিং পুলের চারপাশে এখানে সেখানে অনেকগুলো ডেক চেয়ার আর সাদা সাদা টেবিল পাতা। উজ্জ্বল রঙের কিছু বড় ছাতা নির্দিষ্ট দূরত্ব পর পর বসানো। রোদ পোহানো পুরুষ মহিলারা শুয়ে বসে আছে চেয়ারগুলোতে। বেশিরভাগের পরনেই কেবল বেদিং স্যুট। পুলের পানিতে তিন চারটে মেয়ে আর প্রায় ডজনখানেক ছেলে ব্যাপক উল্লাসে পানি ছিটাতে ছিটাতে একটা রঙিন রাবারের বল লোফালুফি করছে।
তাকিয়ে তাকিয়ে কিছুক্ষণ মেয়েগুলোকে দেখলাম। সবগুলো মেয়েই ইংরেজ। এই হোটেলেরই। ছেলেগুলো কোথাকার নিশ্চিত নই। দূর থেকে শোনা কথার শব্দে যদ্দূর মনে হয় আমেরিকান। আজকে সকালে বন্দরে যে আমেরিকান ট্রেনিং ভেসেলটা ভিড়েছে হয়ত ওটারই নেভাল ক্যাডেট এরা।
একটা হলুদ ছাতার নিচে বসলাম। পাশাপাশি চারটা চেয়ার ফাঁকা ছিল। পাশের টেবিলটাতে বিয়ারটা রেখে একটা সিগারেট ধরিয়ে আয়েশ করে বসলাম। বেশ ভালো লাগছিল পড়ন্ত বেলার আলোয় পুলের সবুজাভ পানিতে আলোড়ন দেখতে। আর আমেরিকান ছেলেগুলোও চমৎকার জমিয়ে ফেলেছে ইংরেজ মেয়েগুলোর সাথে। কেউ ডাইভ দিচ্ছে, কেউ পানিতে ডিগবাজি দিচ্ছে, কেউ স্রেফ হুল্লোড় করতে করতে এ ওর গায়ে ঢলে পড়ছে।
ঠিক তখনি খেয়াল করলাম ছোটখাট বুড়ো একটা লোক পুলের কিনার ধরে হেঁটে আসছে। আমার দিকেই। হাঁটার ধরনটা অদ্ভুত। পায়ের পাতার উপর ভর দিয়ে কেমন যেন লাফাতে লাফাতে হাঁটছে। নিপাট সাদা স্যুট পরনে। মাথায় বড় পানামা হ্যাট। চারদিকে তাকাতে তাকাতে এদিকেই এগিয়ে আসছে।
আমার সামনে এসে থামল। ছোট ছোট এবড়োখেবড়ো দু’পাটি দাঁত বের করে হাসল। আমিও হাসলাম। ভদ্রতাসূচক হাসি যাকে বলে।
‘মাফ করবেন। বসতে পারি এখানে?’
‘অবশ্যই,’ বললাম। ‘বসুন না।’
ধপ করে চেয়ারটাতে বসল লোকটা। চেয়ারটা ক্যাঁচকোঁচ করে উঠল। চেয়ারটাকে একটু সতর্কভাবে পরখ করে নিল। ভেঙ্গে পড়বে না নিশ্চিত হয়ে পায়ের উপর পা তুলে বসল। চোখে পড়ল বাকস্কিনে তৈরি জুতোটাতে বাতাস চলাচলের জন্য ছোটছোট ফুটো রয়েছে।
‘বেশ চমৎকার বিকেল, কি বলেন?’ আলাপ জমাতে চাইছে হয়ত লোকটা। ‘অবশ্য এখানকার প্রকৃতি এমনিতেই অসাধারণ’। লোকটার ইংরেজি শুনে বলা মুশকিল ইতালীয় নাকি স্প্যানিশ। আবার কেন যেন মনে হল দক্ষিণ আমেরিকার কোন দেশেরও হতে পারে। দূর থেকে যা ভেবেছিলাম তার চেয়ে বেশিই হবে বয়স। পঁয়ষট্টি- এমনকি সত্তরও হতে পারে বয়স।
‘হুম্ম’ সায় দিলাম। ‘দারুণ।’
‘আচ্ছা, পুলের ঐ ছোকড়াগুলো কোথাকার বলতে পারেন। এর আগে হোটেলে দেখিনি। আজকেই এলো মনে হয়।’
‘মনে হয় আমেরিকান জাহাজের। শিক্ষানবীশ নাবিক মনে হয়। বয়স কম।’
‘আমেরিকান তাতে সন্দেহ নেই। আমেরিকান ছাড়া কারাই বা অমন হৈ হল্লার বাজার বসাবে?’ একটু থমকে কি ভেবে আবার বলল, ‘আপনি আমেরিকান নন তো?’
‘নাহ,’ হেসে আশ্বস্ত করলাম বুড়োকে।
হঠাৎ আবিষ্কার করলাম পুলের ঐ আমেরিকানগুলোর একজন আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে। পাশে একটা ইংরেজ মেয়ে। এরই মধ্যে বেশ ভাব জমেছে হয়ত।
ফাঁকা চেয়ার দু’টো দেখিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘সিটগুলো ফাঁকা তো? বসতে পারি?’
‘সানন্দে।’ জবাব দিলাম।
‘ধন্যবাদ।’ চেয়ার দু’টোতে বসল ওরা। ছেলেটার হাতে একটা শুকনো ভাঁজ করা তোয়ালে ছিল। দেখলাম ভাঁজ খুলে তার ভিতর থেকে একটা সিগারেটের প্যাকেট আর লাইটার বের করল। প্রথমে মেয়েটাকে সিগারেট সাধল। মেয়েটা না করল। ততক্ষণে আমার সিগারেটটা ফুরিয়ে গিয়েছিল। তাই আমাকে সাধতেই একটা নিলাম। এরপর বুড়োটারর দিকে প্যাকেট এগিয়ে দিল।
‘ধন্যবাদ,’ বুড়ো নীরস কণ্ঠে বলে উঠল। ‘আমার কাছে সিগার আছে।’ বলে স্যুটের পকেট থেকে একটা ক্রোকোডাইল কেইস বের করল। একটা ছোট চাকুও বেরল যার সাথে কেঁচি আছে। কেঁচি দিয়ে সিগারের এক পাশ কাটতে লাগল।
‘এই যে আগুন,’ বলে ছেলেটা হাতের লাইটার এগিয়ে আগুন ধরিয়ে দিতে চাইল সিগারে।
‘এই এতো বাতাসে ঐ লাইটারে কাজ হবে না,’ বাঁকা হাসি দিয়ে বলল বুড়ো।
‘আলবত হবে। এটা সবসময়ই কাজ করে। বাতাসে কোন সমস্যাই হবে না।’ ছেলেটার কণ্ঠে চ্যালেঞ্জের সুর।
ঠোঁটে ধরা সিগারটা নামিয়ে বুড়ো ঘাড় কাত করে ভুরু নাচিয়ে নাটুকে ভঙ্গিতে বলল-
‘সবসময়?’
‘অবশ্যই। অন্তত আমার হাতে তো বটেই।’
বুড়োর নাটুকে ভঙ্গি আরেকটু নাটুকে হল। ‘বাহ! তার মানে তুমি বলতে চাইছ এই বিখ্যাত লাইটার দিয়ে আগুন ধরাতে তুমি কখনো ব্যর্থ হওনি?’
‘অবশ্যই!’
ছেলেটার বয়স হবে বড়জোর উনিশ কি বিশ। লম্বাটে মুখ। বেশি রোদে থাকলে মুখে যেমন গুটি গুটি হালকা বাদামী দাগ হয় তেমন দাগে ভরা মুখ। ইংরেজিতে যাকে বলে ‘ফ্রেকল্ড ফেস’। চওড়া নগ্ন পাতলা লোমে ঢাকা বুকেও অমন দাগগুলো চোখে পড়ছিল।
ডানহাতে লাইটার ধরা। ‘এটা কখনো ফেল করে নাই।’ চোখেমুখে একটা গর্ব নিয়ে হাসিমুখে কথাটা বলল সে। বুড়োর আচরণে মজা পেয়েছে। ‘আমি বলছি আপনার সিগার জ্বলবেই।’
‘এক মিনিট।’ হাত উঁচু করে রাস্তায় গাড়ি থামানোর ভঙ্গিতে বুড়ো বলল, ‘এক মিনিট বৎস।’ তারপর এক সেকেন্ড ছেলেটার মুখের দিকে তাকিয়ে কি যেন দেখল। ‘এ ব্যাপারে একটা বাজি ধরলে কেমন হয়?’ হাসি ফুটেছে বুড়োর মুখে। চোখ চকচক করছে। ‘কি হে, ধরবে নাকি বাজি?’
‘আবশ্যই, কেন নয়?’
‘নিশ্চিত তুমি বাজি ধরতে চাও?’ বুড়োর কণ্ঠে চাপা উত্তেজনা।
‘চাই।’
আমার কিন্তু বুড়োর হাবভাব ভালো ঠেকছিল না। সামান্য একটা ব্যপার নিয়ে অহেতুক বাড়াবাড়ি করছে, যেন ছেলেটাকে অপদস্ত করার ইচ্ছা। সেই সাথে আবার কেমন যেন মনে হচ্ছিল মনে মনে কিছু একটা ফন্দি এঁটেছে লোকটা। কৌতূহল হচ্ছে।
ছেলেটার দিকে তাকিয়ে বুড়ো ধীরে ধীরে বলল, ‘চল, বড় কিছু বাজি ধরি। মূল্যবান কিছু।’
‘এক মিনিট,’ ছেলেটা সতর্ক ভঙ্গিতে বলল, ‘সেটি হচ্ছে না। বড়জোর এক ডলার বাজি রাখতে রাজি আছি।’
অধৈর্যভাবে মাথা নাড়ল বুড়ো, ‘আমার কথা শোন। এসো বড় কিছু বাজি ধরি। নইলে জমবে না। আমি আরো সহজ করে দিচ্ছি তোমার জন্য। আমার হোটেলরুমে চল। ওখানে এখানকার মত বাতাস নেই। আমি বাজি ধরছি, ঘরের মধ্যেও তুমি তোমার ঐ বিখ্যাত লাইটার দিয়ে অন্তত একবার মিস না করে দশবার একটানা আগুন জ্বালাতে পারবে না ঐ লাইটার দিয়ে।’
ছেলেটার কাছে রুমে যাওয়ার প্রস্তাবটা পছন্দ হয়েছে মনে হল। ‘অবশ্যই পারব। একবারও মিস হবে না।’
‘তবে আর সমস্যা কি? এসো টার্মস এন্ড কন্ডিশন ঠিক করি।’
‘বাজি ঐ এক ডলার।’ মনে করিয়ে দিল ছেলেটা।
‘না না। সেটা হচ্ছে না। আমি ধনী এবং বাজির খেলা আমি ভালোবাসি। শোন বৎস। হোটেলের পার্কিঙে আমার একটা গাড়ি আছে। খুব চমৎকার। তোমাদের আমেরিকাতেই তৈরি। ক্যাডিলাক। আমি ওটাই বাজি ধরলাম।’
ছেলেটার চোখ কপালে উঠল প্রথমে। তারপরে চেয়ারে হেলান দিয়ে হেসে ফেলল। ‘এটা পাগলামী। এতো দামী কিছু আমার নেই।’ এতো সামান্য একটা ব্যাপারে কেউ অত দামী গাড়িটা বাজি ধরতে পারে সেটা বিশ্বাস করার কোন কারণই নেই। ছেলেটা মাথা নাড়ল।
‘আপনি মজা করছেন।’
‘মোটেই মজা করছি না। তুমি স্রেফ দশবার পরপর ঐ লাইটার দিয়ে আগুন জ্বালবে আর সাথে সাথেই গাড়ি তোমার। এখন বল ক্যাডিলাকটার মালিক তুমি হতে চাও কিনা।’
‘কিন্তু ঐ গাড়ির সমতুল্য বাজি ধরার মত কিছু নেই আমার কাছে।’
হাতের সিগারের দিকে তাকিয়ে সেটা থেকে লাল ব্যান্ডটা সরাতে সরাতে বুড়ো বলল, ‘বৎস, এমন কিছু তোমাকে বাজি ধরতে আমি বলব না যা তোমার সামর্থের বাইরে। বুঝেছ?’
‘কি সেটা?’
‘এমন সামান্য কিছু যা তুমি খুব সহজেই দিয়ে দিতে পারো। যা হারালে তোমার কোন কষ্টই হবে না।’ আমার ভুল হতে পারে কিন্তু মনে হল ‘খুব’ আর ‘কষ্ট’ শব্দ দু’টোতে একটু জোর দেয়া হল।
‘কি সেটা?’
‘যেমন ধরো বাম হাতের কড়ে আঙ্গুল।’
‘কী?’ ছেলেটার চোখে অবিশ্বাস।
‘হ্যাঁ। জিতলে আমার গাড়ি তুমি নেবে। হারলে তোমার আঙ্গুল আমি নেব।’
‘আঙ্গুল! আঙ্গুল কিভাবে নেবেন?’
‘কেটে নেব।’
বুড়ো পাগল নাকি? আমার আগেই সন্দেহ হয়েছিল।
‘অসম্ভব! এটা পাগলামী। এই বাজির মধ্যে আমি নেই।’ ছেলেটা বলল।
এবার বুড়ো চেয়ারে হেলান দিল। দুই হাত দুই দিকে ছড়িয়ে কাঁধ ঝাঁকালো। ‘এই না বললে, ঐ লাইটার কোনদিন আগুন ধরাতে ব্যর্থ হয়নি। বেশ গর্ব করে বললে। এখন আবার ভয় পেলে। ঠিক আছে। বাদ দাও। বাজি ধরতে যদি এতোই ভয়’ এটুকু বলেই জিভ দিয়ে একটা দুর্বোধ্য আওয়াজ করল বুড়ো।
ছেলেটা থমকে বসে রইল শিড়দাঁড়া খাড়া করে সোজা পুলের দিকে তাকিয়ে। হঠাৎ যেন মনে পড়ল হাতে ধরা সিগারেটটা ধরানো হয়নি। ধীরে ধীরে সিগারেটটা ঠোঁটে তুলল। বাতাস আড়াল করে লাইটারটা সিগারেটের কাছে আনল। আগুন ধরানোর হুইলটা সজোরে ঘুরালো। একটা ছোট স্থির হলদে শিখা জ্বলে উঠল। হাত দিয়ে লাইটারটা এমনভাবে ঘিরে রেখেছে যে বাতাসে শিখা একটুও কাঁপল না।
‘আমি কি লাইটারটা একটু পেতে পারি?’ আমিও সিগারেট ধরাতে চাইলাম।
‘ওহ! দুঃখিত। ভুলে গিয়েছিলাম।’ বলে ছেলেটি নিজে উঠে এসে আমার সিগারেটটাও ধরিয়ে দিল। ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে ধন্যবাদ দিলাম তাকে।
আমাদের মাঝে নীরবতা নেমে এলো।যা বুঝলাম এই উদ্ভট বুড়োটা উদ্ভট বাজির প্রস্তাব দিয়ে ছেলেটাকে বেশ বিভ্রান্ত করে ফেলেছে। আড়চোখে ওকে জরিপ করলাম। যদিও চুপচাপ বসে আছে, কিন্তু ঠিক টের পেলাম ভিতরে ভিতরে উত্তেজিত। বাজি ধরতে যারা ভালোবাসে তাদের জন্য পিছিয়ে যাওয়া খুব কঠিন ব্যাপার। ছেলেটার উত্তেজনা বাড়ছে দিব্যি টের পেলাম। মাথার চুলে আঙ্গুল চালাচ্ছে। পা নাচাচ্ছে।
নীরবতা ভাঙল অবশেষে। বুড়োর দিকে তাকিয়ে বলে ছেলেটা বলে উঠল, ‘আপনার বাজির ব্যাপারে মানে আপনি বলতে চাচ্ছেন, দশবার আগুন জ্বালাতে পারলেই গাড়িটা আমাকে দিয়ে দেবেন?’
‘একবারও মিস না করে।’ বুড়োর সংক্ষিপ্ত জবাব।
‘এবং আগুন জ্বালাতে হবে আপনার ঘরে বসে?’ ছেলেটা অনেক আগেই ফাঁদে পড়ে গেছে।
‘হ্যাঁ। সেখানে কোন বাতাস নেই। কিন্তু কি আর করা। তুমি তো ভয় পেয়ে গেলে।’ বুড়ো ঝানু খেলোয়াড়।
‘আর হেরে গেলে? আমাকে হাত বাড়িয়ে এগিয়ে দিতে হবে আঙ্গুল কেটে নেয়ার জন্য?’ ছেলেটা যেন একটা সিদ্ধান্তে আসতে চাইছে।
‘আরে নাহ্ সেটা সম্ভব নাকি? এমনও তো হতে পারে হেরে গিয়ে তুমি হাত বাড়াতেই চাইছ না। আমি যেটা চাই সেটা হল খেলা শুরুর আগেই তোমার হাত বাঁধা হবে টেবিলের সাথে। আমি একটা ধারালো চাকু নিয়ে তৈরি থাকব। যেই তুমি মিস করবে টুপ করে আঙ্গুলটা কেটে নেব। হা হা হা।’ কথাটা বলে খুব মজা পেল লোকটা।
‘কোন বছরের ক্যাডিলাক?’ ছেলেটা জিজ্ঞেস করল।
‘দুঃখিত। তোমার কথা বুঝলাম না।’
‘কতদিনের পুরনো গাড়িটা?’
‘ওহ! এইত গত বছরের। এক বছরও হয়নি এখনো। কিন্তু কি আর করা বলো। জুয়া তোমার ধাতে নেই। সত্যি বলতে কি আমেরিকান জাতটারই নেই।’
ছেলেটা এক মুহূর্ত চুপ করে থাকল। তারপর একবার পাশের মেয়েটার দিকে আর একবার আমার দিকে তাকালো। তারপর একটা লম্বা দম নিয়ে বুড়োর দিকে তাকিয়ে তীক্ষ্ণ গলায় বলল, ‘আমি রাজি। বাজির শর্তে আমি রাজি।’
‘চমৎকার!’ চেয়ার থেকে ছোটখাট একটা লাফ দিয়ে উঠে হাততালি দিল বুড়ো। ‘এই তো চাই। মনে সাহস, বুকে বল। চল চল হয়ে যাক।’
আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এই যে মশাই, আপনিও আসুন। কী যেন বলে ওহ- রেফারি। রেফারি হবেন।’
‘আমি এর মধ্যে নেই। আমার পছন্দ হচ্ছে না ব্যাপারটা।’ সাফ জানিয়ে দিলাম। জীবনে বহু বাজি দেখেছি। বহু জুয়াড়ি দেখেছি। এমন বিশ্রি শর্ত কোথাও দেখিনি।
‘আমারও ভালো লাগছে না।’ এই প্রথম ইংরেজ মেয়েটা মুখ খুলল। ‘এটা রীতিমত পাগলামি আর আর’ কথা খুঁজে না পেয়ে বলল ‘স্টুপিড বাজি।’
আমি প্রশ্ন না করে পারলাম না বুড়োকে, ‘আপনি কি আঙ্গুল কাটার ব্যাপারে আসলেই সিরিয়াস?’
‘অবশ্যই। কিন্তু যদি সে হারে তবেই। আর গাড়ির ব্যাপারেও আমি সিরিয়াস যদি সে জেতে।’
এবার ছেলেটার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘চল তবে আমার ঘরে যাওয়া যাক।’ উঠে দাঁড়ালো বুড়ো। তর সইছে না যেন।
ছেলেটা আমাকে বলল, ‘আপনি রেফারি হিসেবে আসলে আমি কৃতজ্ঞ থাকব।’
কী ভেবে রাজি হয়ে গেলাম। আসলে ছেলেটার জন্য মায়াই লাগছে। কী হবে যদি একবারও সে মিস করে? মুখে বললাম, ‘ঠিক আছে। কিন্তু পুরো ব্যাপারটা আমার পছন্দ হলো না।’
‘তুমিও এসো।’ মেয়েটাকে বলল ছেলেটা। ‘এসো দেখবে।’
তারপর ঐ আজব বুড়োর নেতৃত্বে আমাদের চারজনের ছোট দলটা হোটেলের বাগানটার পাশ দিয়ে এগোল। সবার সামনে বুড়ো সোৎসাহে লাফাতে লাফাতে এগোচ্ছে। ‘তুমি কি গাড়িটা আগে দেখে নিতে চাও?’ ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করল সে।
তারপর আমাদের সবাইকে নিয়ে হোটেলের সামনে পার্কিং লটে পার্ক করা হালকা সবুজ ক্যাডিলাকটার কাছে নিয়ে এলো।
‘কী, কেমন দেখলে?’
‘দারুণ গাড়ি।’ গাড়িটার গায়ে হাত বুলাল ছেলেটা।
‘ঠিক আছে দেখা যাক এই সুন্দরীকে তুমি জিতে নিতে পারো কিনা।’
হোটেলে বুড়োর ঘরটা বেশ বড়।রাজকীয় বলা চলে। দূর থেকে চোখে পড়ল বিছানায় মহিলাদের একটা ড্রেসিং গাউন পড়ে আছে।
‘প্রথমে চলুন এক রাউন্ড মার্টিনি হয়ে যাক।’ বুড়োর প্রস্তাব।
কোনার একটা ছোট টেবিলে পানীয় সাজানো। সব কিছু যেন তৈরি। বরফ, গেলাস, মার্টিনি তৈরির শেকার- সব। একটা বেল বাজিয়ে বুড়ো মার্টিনি তৈরিতে লেগে গেলো। কিছুক্ষণ পরে দরজায় নক হলো। একজন বেয়ারা এসে ঢুকলো।
হাত থেকে জিনের বোতলটা নামিয়ে বুড়ো ওয়ালেট বের করল পকেট থেকে। বেয়ারাকে এক পাউন্ড দিয়ে বলল, ‘এটা রাখো। আমরা সবাই মিলে এখন একটা খেলা খেলব। তোমার কাজ জলো আমাদের জন্য দু’টো না তিনটে জিনিস যোগাড় করে আনা। কতগুলো বড় সাইজের পেরেক, একটা হাতুড়ি আর একটা ধারালো চাপাতি। কসাইরা যেমনটা ব্যবহার করে। কিচেন থেকে ধার করে আনতে পারো। সম্ভব?’
বেয়ারা একটু অবাক হলো। ‘চাপাতি!’ চোখ একটু বড় হলো। ‘মানে আসল চাপাতি?’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ। আসল চাপাতি। আর একটু তাড়াতাড়ি করলে ভালো হয়।’
টাকাটা হাতে নিয়ে ‘অবশ্যই স্যার’- বলে বেয়ারা বেরিয়ে গেলো।
বুড়ো সবার হাতে হাতে মার্টিনি তুলে দিলো। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমরা সবাই মার্টিনিতে চুমুক দিচ্ছি। আমি শুধু ভাবছিলাম ছেলেটা হারলে কি হবে? হয়তো যে ক্যাডিলাকটা সে জিততে পারল না সেটাতেই ধরাধরি করে হাসপাতালে নিতে হবে। নাহ, কিছুতেই এই অদ্ভুত ব্যাপারটার সাথে খাপ খাওয়াতে পারছি না। না পেরে ছেলেটাকে বলেই বসলাম, ‘তোমার কি মনে হচ্ছে না একটা বোকামি করতে যাচ্ছো?’
‘না। বরং এটা আমার কাছে একটা সুযোগ বলে মনে হচ্ছে।’ এরই মধ্যে পুরো মার্টিনিটা গিলে নিয়েছে।
মেয়েটা অনুনয় করল, ‘প্লিজ। এখনো সময় আছে তুমি সিদ্ধান্ত বদলাতে পারো। কী হবে ভেবেছো হারলে?’
‘আরে, ব্যাপার না।’ বেপরোয়া গলায় ছেলেটা বলল। ‘একবার ভেবে দেখো। আমি চিন্তা করে দেখলাম। বাম হাতের কড়ে আঙ্গুলটা আলাদাভাবে কোন কাজে কখনো লেগেছে কিনা মনে পড়ল না। তো বাজি ধরতে সমস্যা কোথায়?’
বুড়ো নিঃশব্দে হাসতে হাসতে আমাদের গেলাসগুলো আবার ভরে দিলো। তারপর ঘোষণা করলো, ‘শুরু করার আগে আমি রেফারির হাতে গাড়ির চাবি তুলে দিচ্ছি।’ গাড়ির চাবিটা পকেট থেকে বের করে আমার হাতে দিলো। ‘গাড়ির সব কাগজপত্র গাড়িতেই পাওয়া যাবে।’
ঠিক তখনি হোটেলের বেয়ারা সমস্ত উপকরণ নিয়ে হাজির হলো। বিনয়ের অবতার হয়ে বুড়ো বেয়ারাকে বেশ কয়েকবার ধন্যবাদ দিয়ে বিদায় করলো আর জিনিসগুলো নিয়ে বিছানার এক কোণায় রাখলো।
‘এবার তবে প্রস্তুত হওয়া যাক।’ ছেলেটাকে বলল, ‘দয়া করে একটু সাহায্য করো। টেবিলটাকে এই মাঝখানে নিয়ে আসি।’
সাদাসিধে নিরীহ চারকোণা একটা রাইটিং টেবিল। সেটা সরিয়ে দেয়ালের কাছ থেকে ঘরের মাঝামাঝি আনা হলো। টেবিল থেকে ব্লটিং প্যাড, কালি, কলম, কাগজ ইত্যাদি সরানো হলো।
‘এবার একটা চেয়ার।’ বলে বুড়ো একটা চেয়ার নিয়ে টেবিলের পাশে রাখলো। লোকটার মধ্যে একটা ছটফটানি দেখতে পাচ্ছিলাম। যেন বাচ্চাদের পার্টি বা কোন খেলার আয়োজন করছে।
এরপর হাতুড়ি আর পেরেক হাতে নিল সে। টেবিলে পেরেক গাঁথতে শুরু করলো। টেবিলে ছ’ইঞ্চি দূরত্বে দু’টো পেরেক গাঁথলো সে। বেশ খানিকটা করে মাথা বেরিয়ে আছে। টেনেটুনে দেখলো উঠে আসে কিনা।
আমরা হা করে দাঁড়িয়ে তার কীর্তিকলাপ দেখছি। কেন জানি না আমার মনে হলো এই একই কাজ বুড়োটা এর আগেও অনেকবার করেছে। যেন সে নিশ্চিত জানে কোন কাজের পর কোন কাজটা করতে হবে।
‘এখন’ নিজের কাজ পরখ করতে করতে বলল, ‘আমাদের দরকার বাঁধার জন্য একগাছি শক্ত রশি।’ ঘরের কোত্থেকে যেন রশিও নিয়ে এলো সে। তারপর বলল, ‘যাক্, সব তৈরি।’
ছেলেটাকে চেয়ার দেখিয়ে বলল, ‘বসে পড়ো।’
মার্টিনির গেলাস রেখে ছেলেটা বসলো।
‘এবার বাম হাতটাকে এই পেরেক দু’টোর মাঝখানে রাখো যাতে আমি ঠিকমত বাঁধতে পারি।’
এবার সে ছেলেটার হাতের কবজিতে রশি পেঁচিয়ে পেরেকের সাথে বাঁধলো। রশির বাড়তি অংশটুকু টেনে টেবিলের পায়ার সাথে বেঁধে দিলো। এমনভাবে বাঁধা হলো যাতে ছেলেটা চট্ করে হাত সরিয়ে নিতে না পারে।
‘এখন হাতের কড়ে আঙ্গুল বাদে বাকি আঙ্গুলগুলো মুঠ করো। শুধু কড়ে আঙ্গুলটা সোজা থাকবে।’ ছেলেটা আদেশ পালন করলো। বুড়ো চাপাতিটা হাতে তুলে নিয়ে টেবিলের পাশে দাঁড়ালো। ‘অবশেষে আমরা সবাই এখন প্রস্তুত।’ আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘মি। রেফারি, আপনি বললেই এখন শুরু করা যায়।’
ছেলেটার ডানহাতে লাইটার। চোখ বুড়োর হাতের ধারালো চাপাতিটার দিকে। লাইটার ধরা হাতটা কি কাঁপছে? চোখের ভুলও হতে পারে। ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনি রেডি?’
‘রেডি,’ জবাব এলো।
‘আপনি?’ বুড়োকে জিজ্ঞেস করলাম এবার।
‘আবশ্যই।’ বলে হাতের চাপাতি উঁচিয়ে ছেলেটার মেলে রাখা কড়ে আঙ্গুলের ছ’ইঞ্চি উপরে ধরল। ছেলেটার মুখে চোখে কোন অভিব্যক্তি ফুটলো না। মনে মনে ওর নার্ভের প্রশংসা করতে বাধ্য হলাম।
‘ঠিক আছে।’ বললাম ‘শুরু হোক।’
ছেলেটা আমাকে বলল, ‘ক’বার লাইটার জ্বালানো হলো দয়া করে জোরে জোরে কাউন্ট করবেন।’
ঘাড় নেড়ে সম্মতি দিলাম।
লাইটার ধরা হাতটা উঁচু করল সে। কয়েকটা সেকেন্ড কাটল। তারপর বুড়ো আঙ্গুলটা দিয়ে লাইটারের হুইলে সজোরে একটা টুশকি দিলো সে। একটা ফুলকি আর তার পরেই আগুনটা জ্বলল। ছোট হলদে একটা শিখা।
‘এক।’ সজোরে ঘোষণা করলাম।
হাতের ঝাঁকিতে লাইটারের ঢাকনিটা বন্ধ করে আগুন নিভালো সে। কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করে ঢাকনিটা আবার সরালো। চার জোড়া চোখ এখন লাইটারে।
‘দুই।’
‘তিন।’
‘চার।’
‘পাঁচ।’
‘ছয়।’
আসলেই লাইটারটা চমৎকার। আর মাত্র চারবার। প্রার্থনা করলাম আর চারবার যেন ঠিকমত জ্বলে। ওদিকে ছেলেটার হাত ঘামছে। মেয়েটার চোখে পলক পড়ছে না।
‘সাত।’
আমাদের সবার চোখ স্থির হয়ে দেখলো লাইটারে ছেলেটার বুড়ো আঙ্গুলের নড়াচড়া। একইভাবে সাতবার। সাতবার ফুলকি থেকে শিখা জ্বলে ওঠা। সারা ঘরে একমাত্র জীবিত প্রাণী যেন ছেলেটার ডান হাতের ঐ বুড়ো আঙ্গুল।
‘আট।’ বলার সাথে সাথেই ঘরের দরজা খুলে গেলো। ঝট করে আমরা সবাই ঘুরে তাকালাম দরজার দিকে।
একজন বয়স্ক ভদ্রমহিলা দাঁড়িয়ে আছেন দরজায়। কালো চোখ, কালো চুল। ছোটখাট দেখতে। পুরো ঘরের উপর নজর বুলালেন মহিলা। তারপর ঝড়ের বেগে ভেতরে এসে চিৎকার করে উঠলেন ‘কার্লোস! এসব কী হচ্ছে?’ ছুটে এসে এক ধাক্কায় বুড়োর হাতের উপর যেন ঝাঁপিয়ে পড়লেন। চাপাতিতা ছিটকে পড়লো দূরে। অচেনা কোন এক ভাষায় বুড়োকে গালিগালাজ করতে লাগলেন। ভাষাটা শুনতে অনেকটা স্প্যানিশের মত।
হঠাৎ যেন সম্বিত ফিরে পেলেন। শান্ত হয়ে আমাদের দিকে ফিরলেন। ‘আমি দুঃখিত। আমি সত্যিই দুঃখিত।’ চমৎকার নিখুঁত ইংরেজি। ‘আসলে আমারই ভুল। মাত্র কিছুক্ষণের জন্য ওকে একা রেখে গিয়েছিলাম। উচিত হয়নি। মোটেই উচিত হয়নি আমার।’ বৃদ্ধা হাঁপাচ্ছেন।
ছেলেটা ওদিকে ডান হাত দিয়ে বাঁধন খুলতে চেষ্টা করছে। মেয়েটা সাহায্য করল তাকে।
‘আসলে ও একটা মূর্তিমান ম্যানিয়াক।’ তারপর খুলে বললেন সব। ‘আমরা আসলে যে শহরে থাকতাম, সেখানে ও এভাবে প্রায় সাতাশ জনের আঙ্গুল কেটেছে বাজি ধরে ধরে। নয়টা গাড়ি হেরেছে বাজিতে। শেষ পর্যন্ত শহরের লোকেরা মিলে আমাদেরকে শহর ছাড়তে বাধ্য করে। সে কারণেই আমরা এখানে।’
‘আমরা শুধু ছোট্ট একটা বাজি ধরেছিলাম’ মিনমিন করতে করতে বুড়ো যেন নিজের সাফাই গাওয়ার চেষ্টা করলো।
মহিলা পাত্তা দিলেন না। ‘ও নিশ্চয়ই একটা গাড়ি বাজি ধরেছিল?’
এবার ছেলেটা মুখ খুলল, ‘হ্যাঁ, একটা ক্যাডিলাক।’
‘ঐ গাড়ি ওর নয়। ওর কোন গাড়ি নেই। গাড়িটা আমার। বদমাশটার এখন সবচেয়ে খারাপ স্বভাব হলো যা নিজের না, সেটাও এখন বাজি ধরে। আমি লজ্জিত। ওর হয়ে মাফ চাইছি।’
খেলা শেষ। তাই আমি এগিয়ে এসে টেবিলে গাড়ির চাবিটা রাখলাম।
মহিলা ধীরে ধীরে বললেন, ‘ওর আসলে বাজি ধরার মত নিজের বলতে আর কিস্সু নেই। একেবারে কানাকড়িও না। আমার দয়ায় চলে। ওর সবকিছু, সব সম্পত্তি বাজিতে আমি জিতে নিয়েছি অনেক আগেই। অনেকদিন সময় লেগেছে সবকিছু জিততে। অনেক কষ্ট হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব কিছু একে একে জিতে নিয়েছি।’ বলে মহিলা ছেলেটির দিকে তাকিয়ে অদ্ভুতভাবে হাসলেন এবং দুটো হাত তুলে আমাদের সামনে মেলে ধরলেন।
আমরা তিনজনেই দেখলাম দু’হাতেই তর্জনি আর বুড়ো আঙ্গুল ছাড়া তিনটে করে আঙ্গুল নেই। নিখুঁতভাবে কাটা।
[নরওয়েজিয়ান পিতা-মাতার সন্তান ইংরেজ লেখক রোয়াল ডাল (Roald Dahl) ওয়েলসে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একাধারে উপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, কবি এবং স্ক্রিনরাইটার। পেশাগত জীবনে ছিলেন ফাইটার পাইলট। রয়্যাল এয়ার ফোর্সের (Royal Air Force) পাইলট হিসেবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বৃটিশ বাহিনীর পক্ষে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। বর্তমান গল্পটি ম্যান ফ্রম দি সাউথ ইংরেজি গল্পের অনুবাদ ]
বাংলাদেশ সময়: ১৫৫৯ ঘণ্টা, ২৩ আগস্ট, ২০১২
সম্পাদনা: এম জে ফেরদৌস, নিউজরুম এডিটর mjferdous0@gmail.com