 |
| ছবি:রুবেল /বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম |
ঢাকা: পবিত্র শবে বরাত উপলক্ষে রাজধানী এখন ভিক্ষুকের নগরীতে পরিণত হয়েছে। রাজধানীর মসজিদ ও কবরস্থানগুলোর সামনের স্থান দখল করে রেখেছেন ভিক্ষুকরা। আবাসিক এলাকাগুলোতেও ভিক্ষকদের ভীড় লক্ষ্যণীয়। বেলা গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ভিক্ষুকদের এ ভীড় আরো বাড়ছে।
শবে বরাতে ইবাদত বন্দেগি করে কাটবে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের রাত। অধিক পূণ্যলাভের আশায় দান-খয়রাতও করবেন তারা। ধর্মীয় মতানুসারে এ রাতেই এক বছরের জন্য প্রত্যেক মানুষের ভাগ্য লেখা হয়ে থাকে।
এ কারণে মসজিদে মসজিদে এবাদত বন্দেগির প্রস্তুতি যেমন চলছে, তেমনি অবারিত দান-খয়রাত দু’হাত ভরে নেওয়ার জন্য ভিক্ষুকদের রয়েছে কোমর বাঁধা প্রস্তুতি। ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে অভাব ও দারিদ্র্যের প্রান্তসীমায় দাঁড়িয়ে থাকা ছিন্নমূল মানুষগুলো একটু সাহায্যের আশায় ভিড় জমান রাজধানীতে। মুসলমানদের এই ভাগ্যরজনীকে সামনে রেখে রাজধানীতে তাদের আনাগোনাও বেড়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, গত এক সপ্তাহ ধরেই রাজধানীতে ছিন্নমূল মানুষের আনাগোনা তুলনামূলকভাবে বাড়তে শুরু করে। রাজধানীর আশেপাশের এলাকা, এমনকি দূরদূরান্ত থেকেও আসছে এসব ছিন্নমূল মানুষের দল।
টঙ্গী, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, নরসিংদী, জামালপুরসহ ঢাকার আশেপাশের এসব জেলা শহর ছাড়াও দেশের দারিদ্র্যপীড়িত জেলাগুলোর মধ্যে কুড়িগ্রাম, চাপাইনবাবগঞ্জ, পঞ্চগড়, রংপুর, জয়পুরহাটের মতো দূরদূরান্ত থেকেও এসব মানুষ সাহায্য ও ভিক্ষালাভের আশায় পাড়ি জমিয়েছেন রাজধানীতে।গত কয়েকদিন ধরেই কমলাপুর রেলস্টেশন, সায়েদাবাদ-মহাখালী-গাবতলী বাস টার্মিনাল ও সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে এসব মানুষদের অতিরিক্ত চাপ লক্ষ্য করা যায়।
রাজধানীতে শুধু প্রবেশ করলেই হচ্ছে না, ভালো ভিক্ষা পেতে হলে একটি ভালো স্থানও বাছাই করতে হচ্ছে। আজিমপুর এলাকার ভিক্ষুকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চেষ্টাই শেষ কথা নয়। সে কাজেও খরচ আছে। ব্যবসার মূলধন খাটানোর মতো ভিক্ষার জায়গা পেতেও খরচ করতে হচ্ছে টাকা। এ সুযোগে ভিক্ষুকদের জায়গা ভাড়া দিয়ে টু-পাইস কামিয়ে দিচ্ছে একটি চক্র।
ছিন্নমূল মানুষদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শবে বরাতের রাতে মূলত ঢাকার হাইকোর্ট মাজার প্রাঙ্গণ, মিরপুরের শাহ আলী মাজার এলাকা এবং বায়তুল মোকাররম মসজিদকে কেন্দ্র করেই এসব ছিন্নমূল মানুষ তাদের ভিক্ষার স্থান নির্ধারণের প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠেন।
কমলাপুর রেলস্টেশনে ভৈরব থেকে আসা ভিক্ষুক জ্যোৎস্না বিবি বাংলানিউজকে বলেন, ‘‘এলাকায় সারাদিন ভিক্ষা করে পাই ৩০ টাকা। সে হিসাবে মাসে আসে হাজার খানেক। অথচ শবে বরাতের কয়েকদিন আগে এসে একটি ভালো জায়গা যদি পাওয়া যায়, তাহলে এক রাতেই কমপক্ষে আয় হবে আট থেকে দশ হাজার টাকা। এছাড়া বাকি কয়টা দিন ঢাকায় ভিক্ষা করলেই কামাইটা ভালোই হয়।’’
ভিক্ষুকরাই জানান, এসব স্থান নির্ধারণ এবং এর টাকা লেনদেনের সঙ্গে জড়িত দালালরাই পুরো বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করেন। তবে নিজেদের ভিক্ষায় ক্ষতি হতে পারে আশঙ্কায় দালালদের বা কোনো নেতার নাম জানাতে রাজি হননি কেউই।
ছিন্নমূল মানুষদের সঙ্গে কথা বলে আরো জানা গেছে, হাইকোর্ট মাজার প্রাঙ্গণ, মিরপুরের শাহ আলী মাজার এলাকা এবং বায়তুল মোকাররম মসজিদের মূল ফটকের পাশে এবং সংলগ্ন এলাকার শুরুতে জায়গা নিতে পারলে ভিক্ষা বেশি পাওয়ার নিশ্চিত সম্ভাবনা থাকে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর ও দক্ষিণ গেট, হাইকোর্ট মাজারের গেট এবং শাহ আলী মাজারের দিকে যাওয়ার প্রধান দুটি রাস্তায় সারারাতের জন্য জায়গার ভাড়া পঞ্চাশ থেকে দেড়শ’ টাকা পর্যন্ত। জায়গাটি মূল গেটের কতোটা কাছাকাছি তার ভিত্তিতে এ ভাড়া নির্ধারণ করা হয়।
কুড়িগ্রাম থেকে আসা পঞ্চাশোর্ধ করিমন নেসা জানান, বায়তুল মোকাররম উত্তর এবং দক্ষিণ গেটের ঠিক সামনেই জায়গার ভাড়া ১৫০ টাকা। পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে তিনি জানেন, এ জায়গায় ভিক্ষা পাওয়া যায় কমপক্ষে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা। তবে বঙ্গবন্ধু ফোয়ারা এবং জিরো পয়েন্টের সামনে ৯০ টাকায় জায়গা ভাড়া নিতে
পারলে ভিক্ষা পাওয়া যায় ৫ থেকে ৮ হাজার টাকা।
চাপাইনবাবগঞ্জের আছিয়া জানান, মিরপুরের শাহআলী মাজারের মূল গেটের সামনে জায়গা ১৫০ টাকায় ভাড়া নিয়ে ভিক্ষা পাওয়া যায় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। তবে মিরপুর ১ নম্বর মোড় এবং মাজার সড়কে ৫০ টাকায় ভাড়া নিয়ে সর্বোচ্চ ৭ হাজার টাকা ভিক্ষা পাওয়া যায়।
পঞ্চগড় থেকে আসা ষাটোর্ধ ভিক্ষুক মো. আখলাক জানান, হাইকোর্টের গেটের সামনে ১৬০ টাকা দিয়ে সারারাতের জন্য জায়গা ভাড়া নিয়েছেন তিনি। এ মূহুর্তে একদিন কিছু খাওয়ার টাকা তার সঙ্গে না থাকলেও আশা করছেন শবে বরাতের এক রাতেই তিনি কমপক্ষে ২০ হাজার টাকা ভিক্ষা পাবেন।
এছাড়াও হাইকোর্টের সামনের সড়কের ভাড়াও অন্যান্য বছরের তুলনায় কিছুটা বাড়ানো হয়েছে বলে জানান তিনি। এ বছর এ স্থানগুলোর ভাড়া সর্বনিম্ন ৫০ টাকা থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে।
তবে এ সকল ছিন্নমূল মানুষেরা নিজেদের নাম ঠিকানা জানাতে নারাজ। তাদের ভয়, নাম ধাম ফাঁস হয়ে পড়লে তাদের ভিক্ষার ক্ষতি হতে পারে।
বাংলাদেশ সময়: ১৯০৪ ঘণ্টা, জুলাই ০৫, ২০১২
এমএন/ সম্পাদনা: অশোকেশ রায়, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর