ঢাকা: শেয়ারবাজারের ধারাবাহিক মন্দায় আটকে গেছে দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) দায়িত্বরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদোন্নতি।
একই সঙ্গে আয় কমে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির লভ্যাংশ থেকে পাওয়া বোনাসও পাচ্ছেন না কর্মকর্তারা। নির্ধারিত সময়ে পদোন্নতি না পাওয়া ও প্রাপ্ত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণে ডিএসইর ব্যবস্থাপনা বিভাগ ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের ওপর অসন্তোষ বাড়ছে পদোন্নতি বঞ্চিত কর্মকর্তাদের।
এরই জের ধরে ডিএসইর বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তারা চাকরি ছাড়ছেন। প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ দূর করতে না পারলে দক্ষ জনবলের সংকট আরও প্রকট আকার ধারণ করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে শুধু আয় হ্রাস পাওয়ার কারণেই প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদোন্নতি ও সুযোগ-সুবিধা বঞ্চিত হতে হচ্ছে, এমন যুক্তি অযৌক্তিক বলেও মন্তব্য করেছেন তারা।
এ বিষয়ে ডিএসইর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ড. মোশাররফ এম. হোসেন বাংলানিউজকে বলেন, “বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির আয় অনেক কমে যাওয়ার কারণেই পদোন্নতি আপাতত দেওয়া যাচ্ছে না।”
তিনি বলেন, “বর্তমানে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রতিষ্ঠানটি থেকে যে ধরনের সুযোগ সুবিধা পাচ্ছেন ভবিষ্যতেও তা যাতে অব্যাহত থাকে, সেটিও আমাদের নিশ্চিত করতে হবে।”
এ কারণেই ব্যয়ের ক্ষেত্রে কিছুটা সংযত ভূমিকা পালন করতে হচ্ছে। তবে আয় বাড়লে আবারও আগের মতো পদোন্নতি, বোনাসসহ স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ফিরে আসবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন ডিএসই’র সিইও।
এদিকে ডিএসই’র এক সূত্র জানায়, লেনদেন থেকে আয় কমে গেলেও প্রতিষ্ঠানটির অন্যান্য আয় কমেনি। বর্তমানের মন্দাবস্থায় লেনদেন থেকে ডিএসই প্রতি মাসে দুই থেকে আড়াই কোটি টাকা আয় করে। আর ডিএসই তালিকাভুক্ত কোম্পানির লিস্টিং ফি বাবদ বছরে ১৫ কোটি টাকা আয় রয়েছে।
আর বিভিন্ন ব্যাংকে প্রতিষ্ঠানটির অন্তত ৫০০ কোটি টাকা ফিক্সড ডিপোজিট (এফডিআর) রয়েছে। ওই এফডিআর থেকে ডিএসই অন্তত ৬০ কোটি টাকা সুদ বাবদ আয় করে। এছাড়াও লাগা চার্জ, হাওলা চার্জ, ট্রেডিং ওয়ার্ক স্টেশন চার্জ, ডিএসইর অন্যান্য আয় রয়েছে। সব মিলিয়ে ডিএসইর বছরে প্রায় ১৫০ কোটি টাকার বেশি আয় হয়।
এর বিপরীতে বছরে ডিএসইর ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা। ২০১০ সালের জুলাই থেকে ২০১১ সালের জুন মাস পর্যন্ত ডিএসইর আয় হয়েছে মোট ২১৯ কোটি টাকা। আর আলোচ্য সময়ে ডিএসইর খরচ হয়েছে প্রায় ৪৪ কোটি টাকা। এরমধ্যে কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ ডিএসইর ব্যয় হয়েছে ২২ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। সে সময়ে ডিএসইর খরচ বাদ দিয়ে মোট আয় হয়েছে ১৭৫ কোটি টাকা (এফডিআর থেকে প্রাপ্ত সুদসহ)।
জানা গেছে, ডিএসইতে বিভিন্ন স্তরে প্রায় একশ’ কর্মকর্তার পদোন্নতি আটকে আছে। প্রতিষ্ঠানের চাকরি কাঠামো অনুযায়ী পদ খালি থাকা সত্ত্বেও এবং নিয়োগপত্রে উল্লেখ করা পদোন্নতি প্রাপ্তির নূন্যতম সময় পার হলেও গত এক বছরে কোন কর্মকর্তাই পদোন্নতি পাননি। বিশেষ করে ডিএসইর সদস্যদের এ বিষয়টি নিয়ে উদাসীনতাই জটিলতার অন্যতম কারণ বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমানে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে যাদের পদোন্নতি আটকে আছে তাদের মধ্যে এক্সিকিউটিভ রয়েছেন প্রায় ৪০ জন, সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ৪২ জন, ম্যানেজার ১৭ জন, এজিএম ৩ জন। সময়মতো পদোন্নতি ও বেতন না বাড়াসহ বিভিন্ন কারণে এরই মধ্যে চাকরি ছেড়েছেন লিগ্যাল অ্যাফেয়ার্সের ২ জন, আইটি বিভাগের ২ জন, মার্কেট অপারেশনের ১ জন, ট্রেনিং একাডেমির ১ জন। এছাড়া আরও বেশ কিছু কর্মকর্তা চাকরি ছেড়ে যাওয়ার পাইপলাইনে আছেন বলে জানা গেছে।
এদিকে ডিএসইতে চলমান চাকরি কাঠামো অনুযায়ী এক্সিকিউটিভ পদ রাখা হয়েছে ১২৫টি। এর মধ্যে বর্তমানে আছেন ৬৭ জন এবং ৫৮টি পদ খালি রয়েছে। সিনিয়র এক্সিকিউটিভ পদ আছে ৯১টি। এর মধ্যে বর্তমানে খালি আছে ৪৮টি, ম্যানেজার পদ ৫০টির মধ্যে খালি আছে ১৯টি, ২৬টি এজিএম পদের মধ্যে খালি আছে ১১টি।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএসই’র সাবেক এক সিইও বাংলানিউজকে বলেন, “ধারাবাহিকভাবে আয় বৃদ্ধি পাওয়ায় ২০০৮-১০ সাল পর্যন্ত ডিএসইতে ঢালাওভাবে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছিল। উৎসব ভাতার পাশাপাশি প্রফিট বোনাসও নিয়মিত দেওয়া হতো।
তিনি আরও বলেন, “পদোন্নতির বিষয়টি কয়েকটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে, সাধারণত পদোন্নতির জন্য যোগ্য লোক রয়েছে কি না, পদ খালি রয়েছে কি না এবং শূন্য পদ পূরণের প্রয়োজন রয়েছে কি না- এসব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়। মাত্র দেড় বছরের ব্যবধানে প্রতিষ্ঠানটির আয় অনেক কমে যাওয়ার কারণেই হয়তো পদোন্নতি, ইনটেনসিভ দেওয়া হচ্ছে না।”
তবে আয় কমে যাওয়ায় পদোন্নতি আটকে যাওয়ার বিষয়টির সঙ্গে পুরোপুরি একমত হতে পারেননি ডিএসইর এ সাবেক প্রধান নির্বাহী।
“লেনদেন ছাড়াও ডিএসইর অন্যান্য আয় আছে, যেখান থেকে প্রতিষ্ঠানটির পুরো খরচ নির্বাহ হতে পারে” বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বাংলাদেশ সময়: ২১২৪ ঘণ্টা, জুলাই ২৮, ২০১২
এইচএমএম/ সম্পাদনা: জাকারিয়া মন্ডল, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর