ঢাকা: কোনো যুক্তিতেই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান।
মঙ্গলবার ঢাকার ব্র্যাক সেন্টার ইন-এ ইউএনডিপি, সিডা, এসডিসি, ড্যানিডার যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘ইউপিআর ও বাংলাদেশে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার অর্জনের অগ্রগতি ’ বিষয়ক কর্মশালায় দেওয়া বক্তৃতায় তিনি এ মন্তব্য করেন।
“কোনো যুক্তিতেই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড গ্রহণযোগ্য নয়” মন্তব্য করে তিনি বলেন, “আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের হাতে যেভাবে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চলছে তাতে বাংলাদেশের সংবিধান এবং রাষ্ট্রের স্বাক্ষর করা আন্তর্জাতিক সনদের বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। আর জনগণের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বাস্তবায়িত না হলে দেশে মানবাধিকার সংরক্ষিত হবে না।”
নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সংরক্ষণে রাষ্ট্রকে আরও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে এগিয়ে আসারও আহবান জানান মানবাধিকার কমিশন চেয়ারম্যান।
সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদের উদ্ধৃতি দিয়ে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান বলেন, “গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করার কথা বলা হলেও কমিশনের কাছে অসংখ্য অভিযোগ আছে যে, গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে ৩/৪ মাসেও আদালতের সামনে হাজির করা হয় না।”
তিনি বলেন, “নিয়মিতভাবে মানুষ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নির্যাতনের শিকার হচ্ছে।”
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের রিপোর্ট উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমরা এসব সংস্থার অনেক মতামত ও সুপারিশের সাথে একমত নই। কিন্তু এসব রিপোর্টে যে তথ্য-উপাত্ত উঠে এসেছে তা কী অস্বীকার করা যাবে?”
সম্প্রতি বিবিসির হার্ডটকে দেওয়া প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎকারের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, “প্রধানমন্ত্রী বলেছেন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে সরকার জিরো টলারেন্স দেখাবে। আমরা প্রধানমন্ত্রীর এই শুভ ইচ্ছার বাস্তবায়ন দেখতে চাই।”
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও নিখোঁজ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আরও জোরালো ভূমিকা দাবি করে ড. মিজান বলেন, “কেবল পুলিশ কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দিয়ে পুলিশ সংস্কারের কাজ সম্পন্ন করা যাবে না। পুলিশের মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গীগত পরিবর্তনেও কাজ করতে হবে।”
তিনি বলেন, “মানবাধিকার কমিশনের অধিকার রয়েছে সরকার বা রাষ্ট্র মানবাধিকারের মৌল দর্শন থেকে বিচ্যূত হলে তা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার। কারণ, মানবাধিকার কমিশন কাজের জন্য জনগণের কাজে জবাবদিহি করতে বাধ্য।”
আইন ও সালিশকেন্দ্রের সভাপতি ও বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী ড. হামিদা হোসেন বলেন, “বাংলাদেশ এখনও উদ্বাস্তু ও নিখোঁজ বা গুম সম্পর্কিত সনদে স্বাক্ষর করেনি। বাংলাদেশের উচিত দ্রুত এ সনদে স্বাক্ষর করা। মানবাধিকার কমিশন বিদ্যমান পুরনো আইনগুলো যুযোপযোগী করার ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে পারে।”
ইউপিআর প্রসঙ্গে হামিদা হোসেন বলেন, “মানবাধিকার কমিশন সবার পরামর্শ সাপেক্ষে যে প্রতিবেদন তৈরি করছে তা জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত।”
বিডিআর বিদ্রোহের বিচার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এই বিচারপ্রক্রিয়া উন্মুক্ত হওয়া উচিত।”
র্যাব সেসব বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড করেছে সেগুলোর প্রতিটির তদন্তের দাবি জানান তিনি।
আইন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব ও জাতীয় আইন সেবাকেন্দ্রের পরিচালক সৈয়দ আমিনুল ইসলাম বলেন, “সরকার আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার অনুযায়ী দুঃস্থ ও অসহায় মানুষদের আইনি সেবা দিতে দেশব্যাপী আইন সহায়তা সেবা কার্যক্রম চালু করেছে।”
এই সেবা কার্যক্রমের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে তিনি এই কার্যক্রমকে আরও গতিশীল ও মানসস্মত করতে মানবাধিকার কমিশনসহ অন্যান্য সহযোগী সংস্থার সহায়তা চান।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. দিলারা জামান বলেন, “২০০৪ থেকে অদ্যাবধি দেশে ৬০০ টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।”
তিনি বলেন, “বাক-স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও সুশাসন নিশ্চিত করতে সুশীল সমাজের ভুমিকা জোরদার করতে হবে।”
অনুষ্ঠানে মূল বক্তব্যে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ও আইন অনুষদের ডিন আব্দুল্লাহ আল ফারুক বলেন, “বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও নিখোঁজের ঘটনা মানবাধিকার লঙ্ঘনের এক ভয়াবহ ধরন হিসেবে দেখা দিয়েছে।”
নির্যাতন বন্ধে যে আন্তর্জানিক সনদ তার আলোকে আইন প্রণয়নের দাবি জানান তিনি।
মানবাধিকার কমিশনের সম্মানিত সদস্য ফওজিয়া করিম বিশ্বাস বলেন, “আমাদের অনেক ভালো আইন আছে। কিন্তু আইনের সঠিক বাস্তবায়নটাই গুরুত্বপূর্ণ।”
বাংলাদেশ সময়: ২১১৩ ঘণ্টা, আগস্ট ৭, ২০১২
বিজ্ঞপ্তি/ সম্পাদনা: জাকারিয়া মন্ডল, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর; জুয়েল মাজহার, কনসালট্যান্ট এডিটর jewel_mazhar@yahoo.com