 |
| দুবাই কনস্যুলেট অফিসের বাইরে অপেক্ষমান প্রবাসী বাংলাদেশিরা। তবে কাউন্টারগুলো বন্ধ। অনেক ডাকাডাকিতেও খোলা হচ্ছে না। ছবি দু’টি বুধবার (০৯ অক্টোবর, ২০১২) সেলফোন ক্যামেরায় তোলা |
আমি কলামিস্ট নই, সাংবাদিক ও নই। তাই আমার লেখার হাত তাদের মত নয়। তবে একজন আমজনতা হিসেবে সমাজের চারিদিকে যা ঘটে যায় তাই নিয়ে লিখি, হয়তো কোনো প্রতিকার হয় না তবুও নিজের মনকে সান্ত্বনা দেই যে, আমি তো সবাইকে জানানোর চেষ্টা করেছি।
আর সেকারণেই আজ আবার লিখতে বসলাম। গতকাল লিখেছিলাম, কিন্তু তখন পর্যন্ত মহামান্য রাষ্ট্রদূত সাহেবের লেখাটুকু পত্রিকায় পড়া হয়নি তাই আবার লিখতে বসলাম। যখন লিখছি তখন আরব আমিরাতে বাংলাদেশিদের জন্যে সকল প্রকার ভিসা বন্ধের ঘোষণা এসেছে, আর অামাদের মান্যবর রাষ্ট্রদূত সাহেব দেশি মিডিয়াকে বলেছেন, তার কাছে সেরকম কোনো খবর নেই। এসব কিছুই নাকি মিডিয়ার সৃষ্টি। মহামান্য রাষ্ট্রদূত সাহেবের নিকট প্রশ্ন, আপনি কি জেগে থেকেও ঘুমিয়ে আছেন নাকি ঘুমিয়ে থাকার ভান করছেন?
যে সকল দোহাই দিয়ে আরব আমিরাত সরকার আমাদের ভিসা বন্ধ করে দিয়েছে এগুলো যেমন সত্য তেমনি এসব অপরাধগুলোর পেছনে যে কারণগুলো লুক্কায়িত রয়েছে তা অবশ্যই আমাদের স্বীকার করতে হবে। কারণ অপরাধ করার কারণগুলো নির্মূল করা গেলে অপরাধের সংখ্যা কমবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।
ভিসা বন্ধের ব্যাপারে দু’টি প্রধান কারণ উল্লেখ করেছে আরব আমিরাত সরকার, একটি হল পতিতাবৃত্তি অপরটি জাল পাসপোর্ট অথবা জাল কাগজপত্র তৈরি করে ভিসা প্রদান।
তবে যারা আরব আমীরাতের বর্তমান বাস্তবতার খবর রাখেন, তারা জানেন— পতিতাবৃত্তিতে এদেশে সবচেয়ে বেশি জড়িত ভারতীয়, পাকিস্তানি, ফিলিপিনো ও চাইনিজ মেয়েরা এবং এই ব্যবসার পরিচালক পর্যায়ে রয়েছে আমিরাতি, ভারতীয় কিংবা পাকিস্তানিরা।
তথাপি এসব অপরাধে ভারতীয় কিংবা পাকিস্তানিদের ভিসা বন্ধ হয় না। তবে বাংলাদেশিদের ওপর নেমে আসে ‘ভিসা বাতিল’ নামের মরণাঘাত। প্রশ্ন— কেন এমন খড়গ নেমে আসে শুধু আমাদেরই ওপর?
কারণ, ভারতীয়, পাকিস্তানি কিংবা আমিরাতিরা পতিতা ব্যবসার পরিচালনায় থাকলেও এর মার্কেটিং তথা দালালিতে ব্যবহার করে গরীব বাংলাদেশিদের যাদের এ কাজ করা ব্যতীত অন্য কোনো উপায় থাকে না। কারণ, অন্যদেশিদের চেয়ে অনেক বেশি টাকায় ভিসা কিনে বিদেশ আসতে হয় তাদের। কিন্তু যখন সে ভিসায় বিদেশ এসে স্বপন্নভঙ্গ হয় প্রতিশ্রুত বেতন-কাজ না পেয়ে, তখন ক্ষতি পোষানোর আর কোনো রাস্তা খুঁজে পায় না অসহায় অনন্যোপায় মানুষগুলো।
অপরদিকে তখন দেশেরবাড়িতে বাবা-মা, স্ত্রী-সন্তান না খেয়ে থাকে। টাকার অভাবে বোনের বিয়ে হয়না। অভাবের তাড়নায় নববিবাহিতা স্ত্রীও চলে যায়। এদিকে, বিদেশের মাটিতে কফিল (মালিক) আকামা আটকিয়ে রেখে জোড়পূর্বক কাজ করায়। এমন দুর্যোগপূর্ণ অসহায় সময়গুলোতে কিছুটা সহযোগিতা পাওয়ার কথা এমব্যাসিতে গিয়ে (ভারতীয়-পাকিস্তানিরা তা পায় ভালো মতই)। কিন্তু বাংলাদেশি অ্যামব্যাসিতে গিয়ে কোনো ধরনের সহযোগিতা পায় না অসহায় ‘বাঙাল’। তখন ভালো-মন্দ হিতাহিত জ্ঞান তার থাকে না। জীবন আর মরণের মধ্যে তখন কোনো পার্থক্য করা দুষ্কর হয়ে পড়ে। তখন নিজের অজান্তেই সে নানা অপরাধে জড়িয়ে পরে।
যেখানে ভারত, নেপাল, শ্রীলংকার নাগরিকদের আরব আমিরাতে আসতে ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়, সেখানে আমাদের দূতাবাসের অদক্ষতা, সরকারের উদাসীনতা এবং কর্মীদের অজ্ঞতার কারণে খরচ করতে হয় আড়াই থেকে ৩ লাখ টাকা। তবে শুধুই সরকারের উদাসীনতা বললে ভুল হবে, রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো’র অতি মুনাফাখোর মনোভাবও ভিসার দাম আকাশচুম্বী করে দেয়। এছাড়াও দেশে জনসংখ্যার ক্রমাগত চাপ আর বেকারত্বের প্রকট সমস্যাও ভিসার দামে প্রভাব ফেলে।
আরও একটি অন্যতম কারণ হল, আমরা যারা এখানে বসবাস করি তাদের কোনো না কোনো আত্মীয় সবসময়ই বিদেশে পাড়ি জমানোর তাগাদা দিতে থাকে। আর এ তাগাদা থেকেই ‘দাম যাই হোক, ভিসার একটা ব্যবস্থা করতেই হবে’ এমন একটা মনোভাবে তাড়িত থাকেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। যেহেতু একটি ভিসা বেরোলে তার ওপর নজর পড়ে একাধিক বাংলাদেশি ভাইয়ের, সেহেতু সুযোগ বুঝে ভিসা প্রদানকারী কোম্পানি/ব্যক্তিটিও ভিসাকে নিলামে তুলে এর দাম আকাশে চড়িয়ে দেয়।
জাল পাসপোর্ট দিয়ে আরব আমিরাতে ভ্রমণ তথা জাল ডকুমেন্ট তৈরি করে ভিসা ইস্যু করিয়ে নেয়া বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত হই সম্প্রতি। মাস কয়েক আগে পরিচিত এক ভদ্রলোক আমাকে একটি ভিসা দেখিয়ে অনলাইনে চেক করতে বললেন। চেক করে কোথাও কিছু পেলাম না। বুঝলাম পুরোটাই দুই নম্বর (বিষয়টি নিয়ে বাংলানিউজে লিখেছিলামও এবং ভিসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে অনুরোধ করেছিলাম সরকারকে এ ব্যাপারে সচেতন হতে)।
কিন্তু ২নম্বর কাগজপত্রে কিভাবে সম্ভব অত্যাধুনিক ইমিগ্রেশন আর নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পন্ন আরব আমিরাতের মত দেশে প্রবেশ? আমাদের দূতাবাসের কর্মকর্তা-কর্মচারিদের সঙ্গে যোগসাজশ অথবা ইমিগ্রেশন পুলিশের যোগসাজশ ছাড়া এটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আরও একটি বিষয়, সেটি হল সাধারণ শ্রেণীর কারও পক্ষে এ ধরনের অপরাধে জড়িত হওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই কম।
যে যেভাবেই দেখুন, বাস্তবতা হল, আমরা প্রবাসীরা বাংলাদেশ সরকারের জন্যে সোনার ডিমপাড়া হাঁস। এসকল হাঁসের বাচ্চাদের বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব আমাদের সরকারের। অথচ আমাদের ব্যাপারে সরকারের কোনো মাথাব্যথা নেই। সরকার শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রবাসী রেমিট্যান্স কত ডলার জমা আছে সেই হিসেব কষতেই সময় কাটায় আর তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলে।
প্রবাসীদের কষ্টার্জিত টাকায় পরিচালিত হয় বাংলাদেশের দূতাবাসগুলো। তথাপি দূতাবাসের স্যুটেড-ব্যুটেড সাহেবেরা সেই প্রবাসীদের সঙ্গে প্রভূসুলভ আচরণ করেন! দূতাবাসে কাজে এসে প্রতি ১ পাতা ফটোকপিতে তাদের দিতে হয় এক দিরহাম। প্রশ্ন একটাই, এই ১ দিরহাম যাচ্ছে কোন খাতায়?
প্রতিদিন দুবাইসহ আরব আমিরাতের বিভিন্ন রাজ্যে বাংলাদেশ অ্যাম্বেসি আর কনস্যুলেট অফিসের দুয়ারে ধর্ণা দেওয়া প্রবাসীদের সঙ্গে কী ব্যবহার করেন দূতাবাস বাবুরা তা স্বচক্ষে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। পাসপোর্ট সেবাসংক্রান্ত নানাকাজে সেখানে যাওয়ার পর প্রবাসীদের দশা হয়-- জমিদারবাড়িতে জিয়াফত ক্ষেতে আসা ফকির-মিসকিনের মত। প্রয়োজনের সময় দূতাবাসের বাবু-সাহেবরা দরজা তো বন্ধ রাখেনই, এমনকি জানালাও খুলেন না। অনেক কষ্টে মালিকের কাছ থেকে ছুটি নিয়ে, গাঁটের টাকা খরচা করে সেখানে এসে দেখা যায় বাবুমশায়রা বাসাবাড়ির মত দরজা-জানালা বন্ধ করে রেখেছেন যেন ‘প্রাইভেসি’ নষ্ট হবার ভয়ে।
পাসপোর্ট রিনিউ বা নাম-পেশা সংশোধনের জন্য আসা লোকগুলির নিরুপায় ডাকাডাকির জবাবে ভেতর থেকে প্রায়ই ষাঁড়ের মত ধমক-চিৎকারে শাসানো হয় তাদের। পরিস্থিতি দেখে কে বলবে, এটা ব্রিটিশ শাসনামল এবং বাংলাদেশ নয়, আর বাইরের মানুষগুলো নেটিভ নয় এবং একইভাবে ভেতরের ‘মানুষগুলো’ও ইস্টিইন্ডিয়া কোম্পানির বিলাতি সাহেব নয়!
কিন্তু বাস্তবে এরকমই ঘটছে সেবার নামে।
আমাদের দূতাবাস কর্মীদের বলছি, পাবলিকের টাকায় বেতন আর অন্যান্য সুবিধা ভোগ করেও ‘ইয়া নাফসি, ইয়া নাফসি’ অনেক হয়েছে, এবার আসুন মহামান্য স্যুটেড-বুট্যেড সাহেবেরা; সাহেবি ভুলে, প্রাইভেট টিউটরের মত ৯-৫টা অফিস টাইম ভুলে প্রবাসীদের সেবায় আর দেশের উন্নয়নে কাজ করি।
জ্ঞান দিচ্ছি না, আবার আদেশও করছিনা! কারণ দু’টোর কোনোটা করারই যোগ্যতা বা ক্ষমতা আমাদের নেই— শুধু অনুরোধ করছি জাতির পক্ষ থেকে।
কাকুতি-মিনতি করে দূতাবাসের সম্মানিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনুরোধ করছি, চোখে ঠুঁলি এঁটে ‘নিজ স্বার্থ’ তো অনেক দেখলেন! এবার একটু কর্তব্যের দিকে নজর দিন, বেতন-সুবিধা যা ভোগ করছেন তা হালাল করুন, আমাদের জন্যে এবার কিছু কাজ করুন। নয় তো আল্লাহ্র আরশ... থাক আর বললাম না!
শাহরীয়ার আহম্মেদ অক্ষর, আবুধাবী, আরব আমীরাত
Shahriar.axar@gmail.com
বাংলাদেশ সময়: ১৯৫৮ ঘণ্টা, ০৯ অক্টোবর, ২০১২
সম্পাদনা: আহ্সান কবীর, আউটপুট এডিটর