 |
| টোকন ঠাকুর একা দাঁড়িয়ে আর মাঝখানে নির্মলেন্দু গুণকে ঘিরে তার ভক্তরা, পাশেই নাসির আহমেদ |
‘শরীর ও মনের উপর চাপ না দিয়ে যতটুকু লেখা যায়, ততটুকুই লেখো’ এই কথা বললেন নির্মলেন্দু গুণ। অবশ্য লেখার মূল প্ররোচক ফারুক আহমেদ। ফারুকের কথা, ‘গুণদা ৬৮ তে পা দিচ্ছেন, একটা লেখা দেন।’ বললাম, ‘ঠিকাছে।’
ফারুক তখন গুণদা’র বাসায়। ফারুকের ফোন গেল গুণদা’র হাতে। গুণদা বললেন, ‘শোনো, বেশি বড় লেখা দিও না। শরীর ও মনের উপর চাপ না দিয়ে যতটুকু লেখা যায়, লিখতে পারো।’ এই হচ্ছে বৃত্তান্ত। কবি নির্মলেন্দু গুণ ৬৮-তে পা দিচ্ছেন। কিন্তু ৬৮ যদি সংখ্যা উল্টে গিয়ে ভুল করে ছাপা হয়, তাহলে এবছরই গুণদার বয়স হবে ৮৬। ছিয়াশি?
বাংলাদেশের জীবিত কবিদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় কবি নির্মলেন্দু গুণ। নির্মলেন্দু গুণের জীবন এক মিথ। নানান মানুষের মুখে মুখে গল্প হয়ে ঘুরে ঘুরে বেড়ায় কবির জীবনী। গুণদার কবিতাও মুখস্ত হাজার মানুষের মস্তিষ্কে। যেমন বিপ্লবের সপক্ষে দাঁড়িয়ে তিনি কবিতা লিখেছেন, লিখেছেন প্রেমের প্রতি পক্ষপাত দেখিয়েও। বিরহও তাকে কাবু করেছে ভয়ানক। শোষণপীড়িত সমাজ ভেঙে, আরেকটু উন্নত সমাজ বাস্তবতার আকাঙ্ক্ষা নেতৃত্ব দিয়েছে তার কবিতাকে। তার কবিতা নারীর কাছে নত হতেও চেয়েছে, হয়েছেও। সেই কবি, নির্মলেন্দু গুণ পা দিচ্ছেন ৬৮-তে। তবে পা ৬৮-তে দিলেও, মন দিয়ে রেখেছেন তরুণ কবির চরিত্রে, এটা তার সাফল্য। সাফল্য কে না ভালোবাসে?
বাংলা ভাষার সীমানা যতদূর বিস্তৃত আজ, কবি নির্মলেন্দু গুণ সেই বিস্তৃতিও ডিঙিয়ে গিয়েছেন। অন্য ভাষাতেও তার কবিতা অনূদিত। তার মন অনূদিত। তার শরীর অনূদিত। সত্যি কি পুরুষ কবির মন-শরীর অনুবাদযোগ্য? আমি মনে করি, অনুবাদকদের তুলনায় এই প্রশ্নের যথার্থ উত্তর জানে নারী। কোন নারী? সে উত্তর জানেন শুধু কবি। কবির সঙ্গে দেখা হলেই প্রশ্নিব তাকে। কিন্তু কবে, কোথায়, কখন দেখা হবে নির্মলেন্দু গুণের সাথে?
গত বেশ কয়েকবছর ধরে গুণ দা’র সঙ্গে আমার প্রায় প্রত্যেক দিনই দেখা হচ্ছে, আড্ডা হচ্ছে, গল্প-সল্প হচ্ছে। আসলে দিনে দেখা হচ্ছে না। দেখা হচ্ছে রাত ৯টা ১০টার পর, হাতিরপুল-কাঁটাবন এলাকায়। আমি ঘর থেকে বের হই রাতে, ৮/৯ টার পর। গুণদাও আসেন। আড্ডা হয়। রাত ১১ বা ১২ টার দিকে গুণদা চলে যান। আমিও বাসায় ফিরি। এভাবেই, গত কয়েকবছর। গুণদাকে উৎসর্গ করেছি ‘তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।’ গুণদার একটা বইয়েরও উৎসর্গপত্রে আছে আমার নাম। একটা বন্ধুত্ব ফিল করি। শ্রদ্ধাভাজন এই কবির সঙ্গে রচিত এই বন্ধুত্ব আমি বয়ে নিয়ে যাব, এই অভিপ্রায় আমার। কারণ, গুণদার সঙ্গ বড় ভালো লাগে। ভালো লাগা কে না পেতে চায়? একদা আমিই তো কবি নির্মলেন্দু গুণের একটার পর একটা কবিতার বই গিলে খেয়েছি। সেই ঝিনাইদহ বসে, খুলনায় বসে, যশোরে বসে এবং ঢাকাতে এসেও।
কিছুদিন আগে আমি একটা লিফট দুর্ঘটনায় পড়েছিলাম। পাঁচতলা থেকে লিফট ছিঁড়ে পড়ল পাতালে। তারপর আমি হাসপাতালে। হাসপাতাল থেকে সিকি শতাংশ সাময়িক পঙ্গু দশায় আমাকে কারা যেন নিয়ে গেল এক গার্হস্থ্য স্যানাটোরিয়ামে। সেখানে এক নার্স ছিল। সেই অবস্থায় গুণদার সাথে ফোনালাপ হল। গুণদা যেন একটি অনুষ্ঠানে ফরিদপুর বা রাজবাড়িতে অবস্থান করছেন। আমার পঙ্গু দশার বিবরণ শুনে বললেন, ‘তোমার দিকে নার্সের মনোযোগ কী পরিমাণ?’ বললাম ‘মনে হচ্ছে পঁচাশিভাগ।’ গুণ দা বললেন, ‘হাঁটতে পারতেছো?’ বললাম, ‘নার্সের সহযোগিতায় পারতেছি, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে।’ ‘তাহলে আরো কিছুদিন সেবাযত্ন নাও, সহজে ভালো হয়ো না। দরকার হলে তোমার ভাঙা পা ভালো হয়ে গেলেও, ল্যাঙচায়ে ল্যাঙচায়ে হাঁটবা। নার্স যেহেতু যত্নবতী, হুট করে ভালো হবার দরকার কি?’
কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমাকে ভালো হতেই হলো। নার্সের ছায়া থেকে বেরুতে হলো। এদিকে আমাদের বন্ধু মৃগাঙ্ক সিংহ থাকে নিউইয়র্কে। গুণ দা’র মহাভক্ত। একবার, হয়তো ২০০২ এর দিকে, মৃগাঙ্ক ঢাকায় ফিরে বলল, দূর দেশে বসে লেখা ওর কবিতাগুলো দিয়ে একটা বই প্রকাশ করবে। বইয়ের নামই হচ্ছে, ‘নির্মলেন্দু গুণ।’ আমাকে সেই ‘নির্মলেন্দু গুণ’ নামক বইয়ের ভূমিকা লিখে দেবার অনুরোধ করল মৃগাঙ্ক। ১০ লাইনের ভূমিকা। বইয়ের ব্যাক কভারে ‘নির্মলেন্দু গুণ’ শীর্ষক ভূমিকা ছাপা হলো। বইটির প্রচ্ছদ করেছিলেন মাসুক হেলাল। তবে আমার ভূমিকা লেখার জন্য মৃগাঙ্ক আমাকে দিল দশ হাজার টাকা, ইউএস থেকে আনা ঘোলাপানিভর্তি একটা কাচের বোতল এবং ২০০২-এর বার্ষিক প্লেবয় বর্ষপূর্তির সংখ্যা। প্লেবয় ঐ সংখ্যার মূল্য ছিল ১০০ ডলার। যাই হোক, ‘নির্মলেন্দু গুণ’ নামের কবিতার বইটি বেরিয়ে গেল। এখন দরকার বইটির প্রকাশনা উৎসব। কোথায়, কখন, কারা কারা মিলে হবে, তবে উৎসব?
আমার প্রস্তাব গৃহীত হলো। যেহেতু মৃগাঙ্কের কবিতার বইয়ের নাম ‘নির্মলেন্দু গুণ’ তাই সিদ্ধান্ত নিলাম, বইটার প্রকাশনা উৎসব হবে নির্মলেন্দু গুণের প্রথম তারুণ্যের কবিবন্ধু আবুল হাসানের বাসায়। একদা আবুল হাসান আর নির্মলেন্দু গুণ ছিলেন বোহেমিয়ান দ্য গ্রেট। কিন্তু ২০০২ সালে এসে আমরা আবুল হাসানের বাসা খুঁজে না পেয়ে একরাতে চলে গেলাম বনানী কবরস্থানে। এক কপি ‘নির্মলেন্দু গুণ’, ঐ সেই ইউএস থেকে আনা ঘোলাপানির কাচের বোতল, পর্যাপ্ত সিগারেট, ম্যাচবাক্সসহ আমরা চার বন্ধু রাত ২টার দিকে গিয়ে পৌঁছুলাম বনানীর কবরস্থানের গেটে। মৃগাঙ্ক সিংহ, মারজুক রাসেল, আলফ্রেড খোকন আর আমি যখন কবরস্থানের গেটম্যানকে বলি, ‘দরজা খুলে দেন।’ কবরগাহের দারোয়ান বলেন, ‘এতরাতে কবর জিয়ারত করবেন? কার কবর?’ আমরা বলেছি ‘বন্ধুর কবর’। কবরস্থানের নৈশ প্রহরীর মন সদয় হয়। আমরা ঢুকে পড়ি বনানীর মৃত মানুষের মহল্লায়। খুঁজে পাই আবুল হাসানের কবর। হাসান মাত্র ২৮ বছর বেঁচে ছিলেন। ১৯৭৫ এর ২৬ নভেম্বর মারা যান ঢাকার পিজি হাসপাতালে। হাসান গুণ দা’র বন্ধু। আবুল হাসান আমাদেরও বন্ধু। তাই আমরা ৪ বন্ধু হাসানের কবরের মধ্যে গিয়ে বসি। চাঁদের আলো প্লাস কবরখানার নিয়ন আলোয় আমরা ৪ জন ‘নির্মলেন্দু গুণ’ কাব্যগ্রন্থ থেকে ১টি করে কবিতা পড়ি। প্রকাশনা উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা এভাবে শুরু হয়। তারপর সেই মার্কিন বোতলের ছিপি খোলা হয়। তখন ঢাকায় সদ্য মোবাইল ফোন আমাদের হাতে পৌঁছেছে। আমার ফোন থেকে রাত সাড়ে তিনটায় আবুল হাসানের কবরের মধ্যে বসে ফোন দিলাম গুণ দা’কে। গুণ দা তখন থাকতেন আজিমপুরে। সেখানেও আছে এক মস্ত কবরখানা। গুণ দা থাকতেন কবরখানার পাশে। গুণ দা’র ঘুমভাঙা কণ্ঠস্বর শুনতে পাই, ‘হ্যালো?’
‘গুণ দা, আমি টোকন। মৃগাঙ্ক, মারজুক, আর খোকনও আছে।’
‘কোথায় তোমরা, এতরাতে?’
‘আমরা বনানীতে। আবুল হাসানের কবরের উপর। মৃগাঙ্কের বইয়ের প্রকাশনা উৎসব করতিছি। বইয়ের নাম ‘নির্মলেন্দু গুণ’।’
গুণদা ঘুম জড়ানো কণ্ঠস্বরে কথা বলছিলেন তখন, ‘তা করো। কিন্তু আমারে এতরাতে ঘুম ভাঙাইলা ক্যান?’
বলেছি, ‘গুণদা, মৃগাঙ্ক যে পানি আনছে, আমরা সে পানি খাচ্ছি। আপনারে দলে পাইলে ভালো হতো।’
গুণদা বললেন, ‘আমি এখন আজিমপুর থেকে বনানী যাব কিভাবে?’
‘আচ্ছা, দেখতিছি।’ বলেই ফোন কেটে দিয়ে মৃগাঙ্ককে বললাম, ‘মৃগাঙ্ক, তুমি তোমার গাড়ি নিয়ে এখন আজিমপুরে যাও। গুণদা’রে নিয়ে আসো। পূর্ণ হোক বাসনা।’
মৃগাঙ্ক হাসানের কবরের মধ্যে তখন প্রায় শুয়ে পড়েছে। বলল, ‘আমি এখন গাড়ি চালাতে পারব না।’
আসলে আমরা তখন আমেরিকান পানির সঙ্গে বাংলাদেশি পানি না মিশিয়েই চালিয়ে যাচ্ছিলাম। এক্কেবারে র’। সো, সবারই ধরে বসেছে। ধরেছেন হাসান, ধরেছেন গুণ। আমরাও ধরেছি বটে।
হাসানের কবর দেবার পর, ১৯৭৫ এর আমরা ২০০২ তে বসে আছি সেই চার দেয়ালে বাঁধানো কবরের মধ্যে। তাছাড়া জীবিত হাসানকে তো আমারা ৪ বন্ধু কেউ-ই দেখিনি। তাই একটা প্রকাশনা উৎসবের উপলক্ষকে কেন্দ্র করে দেখতে আসা। রাত প্রায় ভোর। কারখানার নৈশপ্রহরী এসে দাঁড়ান, বলেন ‘জিয়ারত কি শেষ?’
বলেছি, ‘শেষ।’
বলছিলাম উপলক্ষ লাগে। উপলক্ষের বাতাবরণে কত কিছু হয়ে যায়। এই যে আজ কবি নির্মলেন্দু গুণের জন্মদিন, এটাও একটা উপলক্ষ। এ উপলক্ষেই মনে করা গেল হারিয়ে যাওয়া রাত, কাচের বোতল, ঘোলা পানি, বন্ধুত্বের উন্মাদনা।
কিছুদিন আগে, গত মার্চের ২৭ তারিখে রাজশাহীতে গিয়ে দেখা পেলাম নির্মলেন্দু গুণের। রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার কবি আসাদ মান্নানের আমন্ত্রণে ঢাকা থেকে আরও অনেকে গিয়েছিলেন। সৈয়দ শামসুল হক, আবুবকর সিদ্দিক, অসীম সাহা, হায়াৎ সাইফ, মাকিদ হায়দার, নাসির আহমেদ, শিহাব সরকারসহ আরো বেশ কজন। রাজশাহী সার্কিট হাউজে ছিলাম আমরা। অনুষ্ঠান শেষে সবাই ঢাকা চলে এলেন। থেকে গেলাম আমি আর গুণ দা। আমরা এসেছি রাজশাহীতে আরো ত্রিশ ঘণ্টা বেশি থেকে। কেন থেকে গেছিলাম আমরা? সে বড় মনস্তাত্ত্বিক, সে বড় মনোজাগতিক।
পরদিন দুপুরে, সরকারের অতিরিক্ত সচিব কবি আসাদ মান্নানের বাসায় যখন খাচ্ছিলাম, গুণদা বললেন, ‘রাজশাহীতে এক ধরনের মিষ্টি আছে। এখনো কি পাওয়া যায়?’ কবি রুহুল আমিন প্রামাণিক বললেন, ‘কোন জাতীয়?’ গুণদা বললেন, ‘নীরা জাতীয়।’
আমরা বুঝলাম, সেই মিষ্টিতে বেদনা আছে। বিরহ আছে। ব্যথা আছে। ফলে, দীর্ঘ পঁচিশ বছর পর নির্মলেন্দু গুণ রাজশাহীতে এসেছেন। আমরা জানি, নীরা লাহিড়ীর পৈতৃক ভিটা রাজশাহীতে এবং দীর্ঘ পঁচিশ বছরে নির্মলেন্দু গুণ দীর্ঘ একা থেকে আরো একা হয়ে উঠেছেন। যাক গে। সে-সব অন্য গল্প। আজ জন্মদিনের আসরে সে-সব নাই বা তুললাম। কী লাভ, কবির ভাষায়, হৃদয় খুঁড়ে! অথচ এক প্রজাপতি তার ডানায় আমাকে আঘাত করেছে গতকালই, মানে ২৭ মার্চ, ২০১২, রাজশাহী সার্কিট হাউজ প্রাঙ্গণের পুষ্পকাননে। সেই প্রজাপতির প্রচুর ফটোগ্রাফি করেছি সেদিন আমি। গুণদাও ছবি তুলেছেন। সেই প্রজাপতিকে আমি খুঁজে ফিরছি। কিছুতেই বিস্মরণে যায় না সে। ঢাকায় ফিরে তাকে নিয়ে একটা কবিতাও লিখে কাগজে ছেপে দিয়েছি। যথারীতি সেই কবিতার মধ্যেও ঢুকে পড়েছেন কবি, বারহাট্টার কাশবন নিকেতনের রবীন্দ্রনাথ তথা নির্মলেন্দু গুণ।
মাঝেমধ্যেই গুণদা’র সঙ্গে আমার শলাপরামর্শ হচ্ছে, কিভাবে খুঁজে পাব সেই প্রজাপতিকে, যার ডানার আঘাতে আমি আঘাতপ্রাপ্ত! যার ডানার রঙে আমি আরক্তিম, বিভোর! গুণদা’ও আমাকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন, কারণ, গুণদা ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছেন। বোঝারই কথা। কবি তো। ঈশ্বর! ঈশ্বর না বুঝলে কেমনে হবে? প্রজাপতি, আমি বিস্মরণে যাইনি তোমাকে। প্রজাপতি, দেখেছি, পড়েছি, তোমার চোখে পদ্মা শহর কাঁপানো পদ্য লেখা, সেই পদ্য পড়েই আমি খুন, আমাকে দেখেই ধরে ফেলেছেন নির্মলেন্দু গুণ...
কবির জন্মদিন উপলক্ষের বাতাবরণে হে কিশোরী প্রজাপতি, তোমাকে আমার ভালোবাসা দিচ্ছি। যেখানেই থাকো, তুমি ভালোবাসা নাও। আমাকে একটু হালকা হতে দাও।
বাংলাদেশ সময়: ০০১৫, জুন ২১, ২০১২
সম্পাদনা : ফেরদৌস মাহমুদ, শিল্প-সাহিত্য
সম্পাদক;
জুয়েল মাজহার, কনসালট্যান্ট এডিটর
jewel_mazhar@yahoo.com