 |
প্রথমেই একটা ভালো সংবাদ দিয়ে শুরু করছি, সেটি হচ্ছে, একা পেয়ে আমাদের যে যোদ্ধাকে জামায়াতিরা আহত করেছে আজকের লন্ডনের সমাবেশের পর এবং যাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না, তাকে খুঁজে পাওয়া গেছে। তিনি বেশ আহত।
শনিবার দুপুর দুইটা থেকে আমরা লন্ডনের আলতাফ আলি পার্ক (যেখানে রয়েছে আমাদের শহীদ মিনার) সব মুক্তিকামী, স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি একত্রিত হওয়ার পরিকল্পনা করি শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে। আমাদের এ খবর আমরা প্রচার করেছি ফেসবুক, টুইটার, ব্যক্তিগত খুদেবার্তা এবং মুখে মুখে খবর পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে।
কিন্তু জামায়াত-শিবির এ সমাবেশের খবর পেয়ে শুক্রবার বেলা দেড়টার দিকে শহীদ মিনার এবং লন্ডনের আলতাফ আলি পার্কের আশপাশের সব স্থান একাত্তরের পাকিস্তানি হায়েনাদের মত দখল করে নেয়।
জুতা পায়ে তারা শহীদ মিনারের বেদীতে ওঠে এবং ক্রমাগত তাদের পাকি রাজাকারের জয়গানে মেতে ওঠে। শহীদ মিনারে উঠে তারা ক্রমাগত স্লোগান দিতে থাকে "সাঈদী সাবের কিছু হলে জ্বলবে আগুন ঘরে ঘরে"।
শহীদ মিনার দখল হয়ে যাওয়াতে আমরা আলতাফ আলি পার্কের যে পাশে হোয়াইটচ্যাপেল রোড সে পাশের একটা বড় অংশ জুড়ে জমায়েত হই। জামায়াত আমাদের শহীদ মিনার দখল করে নিয়েছে এ খবর পেয়ে মানুষ ফেটে পড়ে ক্রোধে। পারলে হাতের কাছে যা ছিল তাই নিয়ে পেটাতে চাইছিল জামায়াত- শিবিরদের। ভলান্টিয়াররা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনলে আমরা সবাই বিশাল একটা বর্গাকৃতি মানববন্ধন করে ফেলি হাতে হাত রেখে। আর আমাদের এই হিউম্যান চেইনের ঠিক মাঝে মোমবাতি দিয়ে ৭১ লেখা হয়। সন্ধ্যায় এ আলোকিত অংশকে মনে হচ্ছিলো একটা কল্পনাতীত দ্বীপের মতন।
আমরা শুরু করি স্লোগান। জ-তে জামায়াত...তুই রাজাকার...তুই রাজাকার...ক-তে কাদের মোল্লা...তুই রাজাকার তুই রাজাকার.../একটাই দাবি...ফাঁসি...ফাঁসি.../তোমার আমার ঠিকানা...পদ্মা মেঘনা যমুনা.../জয় বাংলা...জয় জয় বাংলা... ইত্যাদি।
এরা আমাদের গায়ে ডিম ছুড়তে থাকে বৃষ্টির মতো। এত পুলিশ দাঁড়িয়ে ছিলো, আমরা তাদের গিয়ে দেখালে তারা আমাদের সান্ত্বনা দেয়।
কিন্তু আমরা আমাদের প্রত্যয়ে দৃঢ়। আক্রমণ যত বাড়তে লাগলো আমাদের স্লোগানে জোর যেন আরো বেড়ে গেলো, আমাদের বুকের সব শক্তি দিয়ে আমরা থেমে থেমে বলে উঠি "জয় বাংলা"।
যেই ছেলেটি সারাটি জীবন তার প্রোফাইলে লিখে রেখেছে আই হেইট পলিটিক্স, যে ছেলেটি লিখেছিল বাংলাদেশের রাজনীতি নোংরা, যেই ছেলেটি এই অপরাধীদের বিচারের ব্যাপারে এতদিন মাথা ঘামায়নি, যে ছেলেটি এতদিন এই ট্রাইবুনালের খোঁজ নেয় নি, সেই ছেলেটিও একাত্তরের শহীদের আর নির্যাতিতের ঋণ শোধ করতে যেন এসেছিলেন প্রাণে প্রাণ মিলিয়ে।
১০ বছরে লন্ডনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যেই ব্যক্তিকে আমি এক নজরের জন্য দেখিনি, আজ সে ব্যক্তি শুধু নিজে না, এসেছেন পুরো পরিবার নিয়ে। সব মিলিয়ে প্রায় ৭০০-৮০০ জন ছিলেন স্বাধীনতাকামী।
আমরা কোনো সংঘর্ষে যেতে চাইনি ওই হায়নাদের সঙ্গে বরং আমরা শান্তিপূর্ণ ভাবেই আমাদের মনের কথা জানাচ্ছিলাম বিশ্ব মিডিয়াকে।
আমরা যখন রাত ৮টার দিকে শান্তিপূর্ণ উপায়ে শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে ভাষার জন্য প্রাণ দেওয়া শহীদদের শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করতে যাই ঠিক সেই সময়ে ক্ষেপে ওঠে জামায়াত। তারা কোনোভাবেই মানতে পারছিল না বিষয়টি।, তারা বিশাল হ্যান্ড মাইক নিয়ে আমাদের বাঁধা গ্রস্থ করতে লাগলো, আমরা সেটিও প্রতিহত করলাম পালটা দুইটা হ্যান্ড মাইক কিনে এনে। আমরা যখন জাতীয় সংগীত গাইছিলাম তখন তারা বাংলাদেশ বিরোধী, রাষ্ট্রবিরোধী স্লোগান দিচ্ছিলো। এই গান যেন তাদের পিষে মারছিল প্রতিটি শব্দে, প্রতিটি লাইনে।
এসব শেষ করে যখন আমরা শান্তিপূর্ণভাবে আলতাফ আলি পার্ক থেকে বের হচ্ছিলাম ঠিক তখন এক জামায়াতিরা একটু অন্ধকারের মধ্যে একা পেয়ে আমাদের এক যোদ্ধাকে বোতল দিয়ে আঘাত মারার সঙ্গে সঙ্গে আমারা সবাই সেখানো ছুটে যাই। জামায়াত-বান্ধব পুলিশ আমাদের সেখানে যেতে বারণ করতে থাকে। এরই মধ্যে আমরা সব ভলান্টিয়ার মেয়েদের নিরাপদে টিউব স্টেশন অলগেটে পৌঁছে দিতে গেলে এই জামায়াতিরা আমাদের গাল দিতে আসতে চাইলে আমাদের এক যোদ্ধা তৌফিক বাধা দেন। বাধা পেয়ে তারা তৌফিককে মারতে থাকে এবং অন্য দিক থেকে তারা আরো কয়েকজনকে মারতে শুরু করে। এমন অবস্থায় আমরা ছুটে যেতে না যেতেই জামাতিরা নারায়ে তাকবীর বলে ছুটে আসতে থাকে অশ্রাব্য ভাষায় গালি দিতে দিতে। এই ফাঁকে ওরা তুলে নিয়ে যায় যোদ্ধা তৌফিককে, এবং এই ডামাডোলে আমরা অন্য আরও কয়েক যোদ্ধাকে বাঁচাতে গিয়ে তৌফিকের কথা ভুলে যাই। কেননা এই আক্রমণের সময় আমাদের এক ভলান্টিয়ার টিম মেয়েদের নিরাপদে অন্য এক যায়গায় নিয়ে যাচ্ছিলো, অন্য একটা টিম ওদের আক্রমণ থেকে বাঁচাতে অন্য যোদ্ধাদের পাশে দাঁড়াচ্ছিল।
পুরো সমাবেশ জুড়ে এই জামাতিরা টার্গেট করেছিলো নারীদের। তারা বলছিলো এরা নাকি মূর্তি পূজা করছে, উলু ধ্বনি দিচ্ছে, ইত্যাদি... আর এই সুযোগে তারা আমাদের যোদ্ধাদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে। এখানে আসা সব মানুষই প্রগতিশীল, শিক্ষিত, মার্জিত। তারা এসেছেন এখানে দেশের টানে।
তাদের সঙ্গে যোগ হয়েছিল কাদের মোল্লার আপন ভাতিজা আবু বক্কর মোল্লা এবং নিজামীর জামাই নজরুল। এই দুই ব্যক্তিই মূলত আমাদের আক্রমণ করবার নকশা সাজিয়েছিল।
শেষ পর্যন্ত তারা হেরে গিয়েছিল, বিজয় হয়েছিল আমাদের। আমরা শহীদ মিনারে গিয়েছি, ফুল দিয়েছি, আমরা জাতীয় সংগীত গেয়েছি। আমরা মন আর প্রাণ দিয়ে একাত্মতা ঘোষণা করেছি শাহবাগের এই অভূতপূর্ব জাগরণকে।
আজ এত কিছুর পর আমি দুঃখিত নই। বিদেশে কোনো কিছুই তো আমাদের নয়। আমরা নিজের করে সেটি ভাবতে পারিনা কখনো। আমাদের মন পড়ে থাকে বাংলাদেশে। আমাদের প্রাণ পড়ে থাকে আমাদের শেকড়ে। কিন্তু আজকে সব কাজ ফেলে ছুটে এসেছেন শত শত মানুষ। এই তীব্র শীতে তিন মাসের শিশুকে নিয়ে এসেছেন জননী, ছুটতে ছুটতে এসেছেন পিতা, কষ্ট করে এসেছেন ষাটোর্ধ নারী, কাজ ফেলে, জীবনের সব জরুরি কর্ম ফেলে তরুণ তরুণীরা ছুটে এসেছেন দেশের টানে। দেশের গান গাইতে গিয়ে তাঁরা চোখের অশ্রু ঝরিয়েছেন।
যে ছেলেটি জীবনেও জানতে চায়নি এই বিচার নিয়ে, বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে, সেই ছেলেটি আজ তীব্র ভালোবাসা নিয়ে হাজির হয়েছে আমাদের লন্ডনের এই প্রজন্ম চত্বরে। আলতাফ আলি পার্কে। মানুষের ভেতরে একাত্তরের ঘাতকদের প্রতি এত ঘৃণা! এত ক্ষোভ!! এত ক্রোধ!!! এটি না দেখলে কোনোদিনও বিশ্বাস করা যায় না। কোনোদিনো না...
আমি কোন মুখে আর দেশ নিয়ে হতাশ হব? আমি কোন মুখ নিয়ে দেশের প্রতি অভিমান রাখব? আমি কোন মুখে আর দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশাগ্রস্ত হয়ে বিলীন হতে চাইব? আমি কোন মুখে এই প্রজন্মকে অবিবেচক বলব? এই তরুণ প্রজন্ম, এই উত্তাল প্রজন্ম, এই আগুন প্রজন্ম সেই সুযোগ কি আর রেখেছে?
লেখক: ব্রিটেন প্রবাসী বাংলাদেশি
বাংলাদেশ সময়: ১৯৫৮ ঘণ্টা, ফেব্রুয়ারি ০৯, ২০১৩
সম্পাদনা: মীর সানজিদা আলম, নিউজরুম এডিটর/আরআর