 |
ঢাকা: ঈদ পরবর্তী আন্দোলন কর্মসূচিকে সামনে রেখে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলকে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা করেছে বিএনপি। বিষয়টি সরাসরি তদারক করছেন স্বয়ং দলীয় চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। নতুন কমিটি গঠন নিয়ে ইতিমধ্যে তিনি ছাত্রদল নেতাদের নিয়ে চার দফা বৈঠকও করেছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ঈদের পরপরই ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হবে। একই সঙ্গে সংগঠনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শাখা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের কমিটিও ঘোষণা করা হতে পারে।
বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, আগামী নির্বাচন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে করার দাবিতে ঈদের পর সর্বাত্মক আন্দোলনে নামবে বিএনপি। মাঠের শক্তি হিসেবে দল কাজে লাগাতে চায় ছাত্রদলকে। আর সেজন্যই শক্তিশালী ও তারুণ্যনির্ভর কমিটি দেওয়ার কথা ভাবছেন দলের শীর্ষ নেতারা।
তবে কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পরপরই ছাত্রদলের সম্ভাব্য নেতৃত্ব নিয়ে মতভেদ দেখা দিয়েছে। অনেকে বলছেন, সিনিয়রদের মাধ্যমে কমিটি গঠিত না হলে দলের চেইন অব কমান্ড থাকবে না। আন্দোলনের স্বার্থেই সিনিয়রদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে হবে।
অন্যদিকে, তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা জুনিয়রদের নিয়ে তারুণ্যনির্ভর কমিটিই চান। তাদের দাবি, তরুণদের নিয়ে কমিটি দিতে হবে। অছাত্রদের কাছ থেকে নেতৃত্ব নিয়ে এভাবে ধীরে ধীরে ছাত্রদলের কমিটি ছাত্রদের হাতে ফিরিয়ে দিতে হবে।
সিনিয়রদের পক্ষের যুক্তি নাকচ করে দিয়ে তারা বলছেন, তরুণরা আন্দোলন করতে পারবে না এটা একটা প্রোপাগান্ডা। তরুণ নেতৃত্বের হাতে ছাত্রদল থাকলে তৃণমূলের কর্মীরা সংগঠিত হতে পারবেন। আন্দোলনে মূলত তরুণরাই ভরসা।
সংগঠনের অছাত্র নেতৃত্বের দিকে ইঙ্গিত করে তারা প্রশ্ন করেন, চল্লিশোর্ধ্বদের হতে ছাত্রদলের নেতৃত্ব থাকবে কোন যুক্তিতে?
অবশ্য সিনিয়র-জুনিয়র সমন্বয়ে কমিটি গঠনের সম্ভাবনার কথাও জানিয়েছেন অনেকে।
সূত্র জানায়, সুলতান সালাহ উদ্দিন টুকু- আমিরুল ইসলাম খান আলীম কমিটি ছাত্রদলকে পুনর্গঠিত করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে বলেই মনে করে বিএনপি। বিগত আন্দোলনে ছাত্রদলের ভূমিকায় দলের নীতি নির্ধারকরা হতাশ। গত ১৯ জুলাই ছাত্রদলের সঙ্গে বৈঠকে খালেদা জিয়াও তাদের তিরষ্কার করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আহ্বায়ক কমিটির ওপরও তিনি নাখোশ।
এদিকে ছাত্রদলের নতুন কমিটি গঠনের গুঞ্জন শুরুর পর থেকেই ছাত্রদল নেতারা পদ পেতে জোর তদবির শুরু করেছেন। নেতারা বিএনপির প্রভাবশালী নেতাদের দ্বারস্থ হচ্ছেন। অন্যদিকে বিএনপির সিনিয়র নেতাদের অনেকেই নিজেদের পছন্দের জনকে পদ পাইয়ে দিতে তোড়জোড় শুরু করেছেন।
উচ্চ পর্যায়ে তদবিরে রয়েছেন সাবেক ছাত্রদল নেতাদের পাশাপাশি স্থায়ী কমিটির সদস্যরাও।
তবে একটি শক্তিশালী কমিটির মাধ্যমে ছাত্রদলকে সক্রিয় করার জন্য খালেদা জিয়া নিজের হাতে দায়িত্ব তুলে নিয়েছেন বলে গত ১৯, ২৮, ২৯ ও ৩০ জুলাই খালেদা জিয়ার সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠকে অংশ নেওয়া ছাত্রদল নেতাদের সূত্রে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, নিজের পছন্দের ‘ছোট ভাই’দের বসিয়ে বিভিন্ন সময় ‘পকেট’ কমিটি দেওয়ার পূর্ব অভিজ্ঞতার কারণে সাবেক ছাত্রদল নেতাদের ওপর ভরসা করতে পারছেন না খালেদা জিয়া। আগের বৈঠকগুলোতে তিনি এ নিয়ে ছাত্রদলের নেতাদের ধমকও দিয়েছেন বলে জানা যায়।
সূত্র আরো জানায়, গত ৩০ জুলাইয়ের সর্বশেষ বৈঠকে খালেদা জিয়ে জুনিয়রদের নিয়ে কমিটি গঠনের ইঙ্গিত দিয়েছেন। ত্যাগী, পরিশ্রমী ও তৃণমূলে জনপ্রিয়তা যাচাই করেই কমিটি দেওয়া হবে বলেই তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন।
বৈঠকে কমিটি ঘোষণার পর নিজেদের মধ্যকার কোন্দল মিটিয়ে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার পরামর্শও দেওয়া হয়। নতুন কমিটি থেকে বাদ পড়া সিনিয়রদের যুবদলের কমিটিতে স্থান দেওয়ার আশ্বাসও দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি গঠনের দিকেও জোর দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন।
সূত্র মতে, ঐক্যবদ্ধভাবে শক্তিশালী আন্দোলনের স্বার্থে ছাত্রদলের বিদ্রোহী বলে পরিচিত নেতাদেরও এবারের কমিটিতে স্থান দেওয়া হবে বলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
নতুন কমিটি দেওয়ার বিষয়ে বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী এমপি বাংলানিউজকে বলেন, “বিষয়টি নিয়ে চেয়ারপারসন ছাত্রনেতাদের সঙ্গে চার বার বৈঠক করেছেন। বৈঠকে তিনি শতাধিক নেতার বক্তব্য শুনেছেন তিনি। তাদের মধ্য থেকে যোগ্যদের তিনি বেছে নেবেন বলেও তিনি জানিয়ে দেন।”
নেতৃত্বে জুনিয়র-সিনিয়র বিষয়ে তিনি বলেন, “নেতৃত্বের ক্ষেত্রে জুনিয়র-সিনিয়র গুরুত্বপূর্ণ নয়। যারা দলের জন্য মাঠের রাজনীতি করেছেন, যারা ত্যাগী, সংগঠক, নেতৃত্বে দায়িত্বশীলতা রয়েছে এবং যারা এলাকাভিত্তিক রাজনীতি না করে সামগ্রিক রাজনীতি করেন, তাদের হাতেই নেতৃত্ব দেওয়া হবে।”
তরুণদের প্রধান্য দেওয়া হবে কি না এ প্রশ্নে তিনি বলেন, “ছাত্রদলের নেতারা তো তরুণই। তরুণদের নিয়েই কমিটি হবে।”
যারা এগিয়ে রয়েছেন
জুনিয়র থেকে নেতৃত্ব এলে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হওয়ার দৌঁড়ে এগিয়ে আছেন- ঢাবির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ওবায়দুল হক নাছির, বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি মামুনুর রশিদ, সহ-সাংগঠনিক মশিউর রহমান মিশু ও বজলুল করিম আবেদ।
জুনিয়রদের নিয়ে কমিটি গঠনের সম্ভাবনা বেশি থাকলেও হাল ছাড়ছেন না সিনিয়ররাও। ঢাবির সাবেক সভাপতি হাসান মামুন, সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজ, আগের কমিটির আব্দুল কাদের ভূঁইয়া জুয়েল, নুরুল ইসলাম নয়ন সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদের জন্য জোর তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন।
এছাড়াও সিনিয়রদের মধ্যে আহসান উদ্দিন খান শিপন, আবদুল হালিম খোকন, আনোয়ারুল হক রয়েল, আবু সাঈদও সাধারণ সম্পাদক পদ প্রত্যাশী।
উল্লেখ্য, ২০১০ সালের ১ জুলাই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ শেষ হয়। পরে বিভিন্ন সময় কমিটি গঠনের কথা শোনা গেলেও অন্তর্কোন্দলের কারণে তা দেওয়া সম্ভব হয়নি।
ঢাবি ছাত্রদল শাখা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটিতে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক হওয়ার দৌঁড়ে এগিয়ে আছেন আকরামুল হাসান মিন্টু, মাহফুজুর রহমান, মনিরুল ইসলাম সোহাগ, মাসুদ পারভেজ, মহিদুল হাসান হীরু, সাদিউল কবির নীরব, নাসির উদ্দীন রুম্মন।
তবে হতাশায় নিমজ্জিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলের তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা। সর্বশেষ ২০০৪ সলে হল কমিটি দেওয়া হয়। দীর্ঘ বছর ৮ ধরে হল কমিটি না থাকায় সংগঠন নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। নেতাকর্মীদের অভিযোগ, ছাত্র জীবন শেষ হয়ে যায়, তবুও তারা কোনো পদ পান না।
তৃণমূল সূত্র জানায়, হল কমিটি না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে ছাত্রদলের কোনো অবস্থান নেই। ক্যাম্পাসেও তাদের কার্যক্রম নেই। ফলে মাঠ পর্যায়ে ছাত্রদল দুর্বল হয়ে পড়ছে।
তৃণমূল নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে তাদের ক্ষোভ। ক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা বলেছেন, “ছাত্রদল তো আর ছাত্রদের সংগঠন নেই । এটি এখন মধ্যবয়সীদের দখলে। এবার চেয়ারপারসন তরুণদের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় আমরা একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রতীক্ষায় আছি।”
তৃণমূলের এসব ক্ষোভের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে বিএনপির ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী আরো বলেন, “ছাত্রলীগ আর ছাত্রদল এক নয়। আমাদের সংগঠন আমাদের নিয়মে চলে।”
তবে, ঢাবির হল শাখার নেতৃত্বে ছাত্ররা অবশ্যই আসবেন বলে জোর দিয়ে বলেন তিনি।
বাংলাদেশ সময়: ১৭২৩ ঘণ্টা, আগস্ট ১৭, ২০১২
এমএইচ/সম্পাদনা: জাহাঙ্গীর আলম, নিউজরুম এডিটর ও অশোকেশ রায়, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর