 |
ঢাকা: দেশের বাইরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কয়েকটি স্টেশনে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়ম চরম আকার ধারণ করেছে। সূত্র জানিয়েছে, প্রভাবশালীদের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে এসব স্টেশনে চিহ্নিত দুর্নীতিবাজরাই প্রাধান্য পেয়ে আসছে। ফলে অনিয়ম-দুর্নীতিই নিয়মে পরিণত হয়েছে এসব স্টেশনে।
সিঙ্গাপুর, লন্ডন, ব্যাংকক, রিয়াদ, কাতার, কুয়েত ও দুবাইয়ে বিমানের স্টেশনগুলো এর অন্যতম।
টাকার খনি হিসেবে চিহ্নিত এসব স্টেশনে লাগামহীন দুর্নীতি ছাড়াও নানা রকম জালিয়াতি, নারী কেলেঙ্কারির মতো অভিযোগ উঠেছে। তবে অভিযোগ বার বার প্রমাণিত হলেও এসব স্টেশনে কারও বিরুদ্ধে কোনো প্রকার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
সূত্র জানায়, স্টেশনগুলোতে যে হারে কেলেঙ্কারি ফাঁস হচেছ -তা অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে ভয়াবহ। নজরুল শামীম নামের এক জন ফার্স্ট অফিসার এসব স্টেশনের দেখভাল করার দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
বাংলানিউজের অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিমান চেয়ারম্যান জামাল উদ্দিন আহমেদের ছেলে জুবায়েরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু এই নজরুল শামীম।
বিমানের মার্কের্টিং শাখায় একজন কর্মকর্তা বাংলানিউজকে জানান, লন্ডন অফিসে বিমানের যেসব কর্মকর্তা এ পর্যন্ত কাজ করেছেন তাদের মধ্যে সবচেয়ে সৌভাগ্যবান হচ্ছেন শামসুল করিম নামের একজন কর্মকর্তা। তিনি একটানা পাঁচ বছর সেখানে স্টেশন ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সুবাদে বৃটেনের নাগরিকত্বও লাভ করেছেন ।
মার্কের্টিং শাখার ওই কর্মকর্তা জানান, বৈদেশিক স্টেশনগুলোতে তিন বছরের বেশি কাটানোর নিয়ম না থাকলেও নজরুল শামীমের মাধ্যমে বিমানের বর্তমান চেয়ারম্যানের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে শামসুল করিম সেখানে টানা পাঁচ বছর কাটানোর সুযোগ পান। বিমানের মার্কেটিং বিভাগ থেকে বার বার তাকে প্রত্যাহার করার চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি।
অপরাধ ও দায়িত্ব অবহেলার অনেক ঘটনা থাকলেও নজরুলের যোগশাজসে শামসুল তার পদেই বহাল থাকেন বছরের পর বছর।
সূত্র জানায়, শামসুল করিমের গাফিলতির কারণে ২০১১ সালে এলজিইডি মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বিমানযোগে লন্ডন যাবার পথে বিপাকে পড়েন। তুষারঝড়ের আগাম প্রস্তুতি না নেওয়ায় বিমানকে অনেক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। এমন কি তার গাফিলতির জন্য ব্রাসেলস থেকে মন্ত্রিকে ট্রেনেও চাপতে হয়।
ম্যানচেস্টারের স্টেশন ম্যানেজার হিসেবে ঢাকা থেকে পোস্টিং নেন শামসুল করিম। এসময় তিনি ছিলেন সহকারী ব্যবস্থাপক পদমর্যাদার। তবে এর পর তাকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। খুব দ্রুতই লন্ডনের কান্ট্রি ম্যানেজারের দায়িত্ব পেয়ে যান এবং একের পর এক পদোন্নতি বাগিয়ে নিয়ে সেখানেই অবস্থান করেন টানা পাঁচ বছর।
এ সময় অতিরিক্ত লাগেজ সুবিধা দিয়ে বিমানের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আত্মসাৎ করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বিমানের অনেকেই তাকে দুনীতিবাজ হিসেবেই চেনেন। এমন সব অভিযোগের পরেও কেন পাঁচ বছর তাকে লন্ডন থাকার সুযোগ দেয়া হলো, বিমানে কি তার চেয়ে আর কোনো যোগ্য লোক ছিলো না? এমন প্রশ্নে জাতীয় পতাকাবাহী বিমানের একজন পরিচালক না প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “চেয়ারম্যানের আশির্বাদ ছাড়া নির্দিষ্ট মেয়াদের পর এক মুহুর্তও কারোর পক্ষে বিদেশের কোনো স্টেশনে থাকার উপায় নেই।”
চেয়ারম্যান কেন তাকে এতটা আশির্বাদ দিতে গেলেন, জানতে চাইলে ওই পরিচালক সরাসরি কিছু না জানালেও একই প্রশ্নে একজন বিমানবালা বলেন, “কেন দেবেন না! নজরুল শামীমের মাধ্যমে শামসুলের কাছ থেকে চেয়ারম্যান নিয়মিত মাসোহারা আর নামিদামি উপঢৌকন পাচ্ছেন।``
নিজের নাম প্রকাশ করতে না চাইলেও উপঢৌকনের একটি তালিকা প্রকাশ করেন ওই বিমানবালা। যার মধ্যে রয়েছে- রাসেল অ্যান্ড ব্রোমলের জুতা, পিংক শার্ট, শিল্কের টাই, রাডু ঘড়ি, কার্টিয়ার পারফিউম ইত্যাদি। এছাড়া বিমানের কজন কেবিন ক্রুর মাধ্যমে চেয়ারম্যানের নাতির জন্য নিয়মিত লন্ডন থেকে গুঁড়ো দুধ পাঠাতেন শামসুল করিম ।
এভাবেই পাঁচ বছর লন্ডনে থাকার সুযোগ নিয়ে বৃটেনের নাগরিকত্ব লাভের বিরল সুযোগটিও হাতিয়ে নেন শামসুল। এরপরই তাকে লন্ডন থেকে ফিরিয়ে আনা হয়। এ ব্যাপারে একজন সিবিএ নেতা তার ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন- বিমান এই কর্মকর্তাকে লন্ডনে পাঁচ বছর লালন পালন করেছে শুধু তার নাগরিকত্ব পাইয়ে দেবার জন্য। তিনিই জানান, শামসুলকে ঢাকায় ফিরিয়ে আনার পর যাকে পাঠানো হয়েছে তিনিও বিমানের চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ। লন্ডনে নিয়োগ পাওয়ার আগে যিনি দিল্লিতে কান্ট্রি ম্যানেজারের দায়িত্বে ছিলেন।
লন্ডনের পর সবচেয়ে দুর্নীতির নিরাপদ ক্ষেত্র সিঙ্গাপুরের বিমান স্টেশন। এখানে কান্ট্রি ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করছেন আরিফুর রহমান। প্রায় তিন বছর ধরে সিঙ্গাপুর রয়েছেন তিনি। তার বিরুদ্ধেও রয়েছে ট্রাভেল এজেন্সির কাছ থেকে নিয়মিত কমিশন আদায়, অতিরিক্ত লাগেজ বাণিজ্যের অভিযোগ।
সূত্র জানায়, এই আরিফুর রহমান ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের দুর্ধর্ষ ক্যাডার। তার এক ভাই মহানগর বিএনপির প্রভাবশালী এক নেতার দেহরক্ষী। অথচ এই আরিফকেও সিঙ্গাপুরে থাকা অবস্থায় ডিজিএম পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করে।
মাত্র তিন বছর আগে ওয়ান ইলেভেনের সময় বিমানের অফিসারদের বিরুদ্ধে নানা রকম তথ্য ফাঁস করার পুরস্কার হিসেবে তখন তাকে ম্যানেজার পদে পদোন্নতি দিয়ে সিঙ্গাপুর পাঠানো হয়। এরপর মাত্র তিন বছরের মাথায় তাকে সম্প্রতি ডিজিএম পদে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে।
বিমানের মানবসম্পদ বিভাগের সাবেক একজন ডিজিএম জানান, দশ পনের বছর ধরে ম্যানেজার পদে চাকরি করছেন এমন বেশ কয়েকজনকে ডিঙ্গিয়ে আরিফকে মাত্র তিন বছরের মাথায় পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এতে বিমানের পদোন্নতিবঞ্চিতদের মধ্যে চরম ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে।
বাংলানিউজের অনুসন্ধানে জানা যায়, এখানেও রয়েছে নজরুল শামীমের হাত। নজরুল শামীম সিঙ্গাপুরে আরিফের নিয়মিত অতিথি। এমনকি গত বছর বিমান চেয়ারম্যানসস্ত্রীক সিঙ্গাপুর গেলে তারাও ছিলেন আরিফের অতিথি । চেয়ারম্যান দম্পতি আরিফের বাসায় নৈশভোজে অংশ দেন। সেখানে তাদেরকে স্যামন মাছ দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়।
সূত্র জানায়, আরিফের স্ত্রী চেয়ারম্যানের সহধর্মিনীকে মোস্তফা সেন্টারে নিয়ে গিয়ে দামি উপঢৌকন কিনে দেন। আর চেয়ারম্যান দম্পতি সিঙ্গাপুর থেকে ফেরার পরই আরিফের পদোন্নতির জন্য নজরুল শামীমের তদবির শুরু হয়। তাতেই মন্ত্রের মতো কাজ হয়ে যায়।
দুবাইয়ের কান্ট্রি ম্যানেজার আহসান হোসেন কাজীও একই ভাবে বিমানের শীর্ষ কর্তাদের আশির্বাদপুষ্ট। নজরুল শামীম তার কাছ থেকেও বিমান বসের জন্য নিয়মিত কাজু বাদাম, আলহারামাইন আতর ও পেশতা আনেন। নজরুলের আশ্বাসে শিগগিরই পদোন্নতির অপেক্ষায় রয়েছেন কাজী।
বিমানের সবচেয়ে আলোচিত নারী ব্যাংককের কান্ট্রি ম্যানেজার তানজিলা আমিন। তিনি এতটাই সৌভাগ্যবতী যে চাকরির পর থেকেই দেশের বাইরে বাইরে কাটিয়ে আসছেন।
সূত্র জানায়, ব্যাংকক গিয়ে ট্রানজিট যাত্রীদের নিয়মিত অতিরিক্ত লাগেজ সুবিধা দিয়ে বিমানের রাজস্ব আত্মসাৎ করে চলছেন তানজিলা। তার লুটপাটের একটি ঘটনা সম্প্রতি হজরত শাহজালাল আন্তজাতির্ক বিমান বন্দরে ধরাও পড়ে। এ ঘটনা পত্রপত্রিকায় ব্যাপক লেখালেখি হলেও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
সূত্রটি আরও জানায়, এ নিয়ে গত সপ্তাহে বোর্ড মিটিংয়ে একজন সদস্য ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানালেও কাজ হয়নি । বোর্ড সভায় সিদ্ধান্ত হয়, এখনই নয় - তদন্তের পর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে বিমানের প্রশাসন বিভাগের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, তানজিলার মত একই অভিযোগে অভিযুক্ত আরেক কর্মকর্তা কামালের বিরুদ্ধে কোনো রকম তদন্ত ছাড়্াই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিলো।
সূত্রটি জানায়, চেয়ারম্যানের এক আদেশেই কামালকে প্রত্যাহার করা হয়েছিল। একইভাবে রিয়াদের করিম ও মিসবাহ এবং কুয়েতের নাসরীন আমিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া মাত্রই কোন প্রকার তদন্ত ছাড়াই প্রত্যাহার করা হয়েছিল। ওই সব ঘটনায় কারো কোনো সুপারিশই চেয়ারম্যান আমলে নেননি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বৈদেশিক স্টেশনগুলোতে চেয়ারম্যানের টোল কালেকটর হিসেবে চিহ্নিত নজরুল শামীমের মন রক্ষা করতে না পারায় তাদেরকে এমন কঠিন মাশুল দিতে হয়েছে। আর তাকে সন্তুষ্ট রাখার কারণেই তানজিলা আছেন বহাল তবিয়তে।
বাংলাদেশ সময় ১৫২০ ঘণ্টা, জুন ২৫, ২০১২
এমএমকে-menon@gmail.com;জুয়েল মাজহার, কনসালট্যান্ট এডিটর jewel_mazhar@yahoo.com