 |
পথের পাশে একটি বনাঞ্চল। পথটি কোথায় গেছে? এর উত্তর- সহস্র মানুষের সহস্র গন্তব্যের দিকে গেছে এই পথ। একই পথে বহু মানুষ তার নিজ নিজ গন্তব্যে যায় এবং একই পথ ধরে বহু মানুষ একটা নির্দিষ্ট গন্তব্যেও যায়।
যে-পথটির কথা বলছি, শীতের রাত হওয়ার কারণে এই পথের পাশে মধ্যরাতে কিছু মানুষ বনের বৃক্ষ শাখা কেটে আগুন জ্বালিয়েছে শীতের প্রচণ্ডতা থেকে বাঁচবার জন্যে। তারা আগুনকে সামনে নিয়ে গোল হয়ে বসে আছে। তাদের ঘর-বাড়ি নাই- এ কথা বলা যাবে না। ঘর-বাড়ি থাকা সত্বেও জগতের ধনী গরীব মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষকে রাস্তায় থাকতে হয় কারণে অকারণে।
সেই পথে আমি হাঁটতে হাঁটতে যারা আগুন পোহাচ্ছে তাদের কাছে যাই। গাছের ডালপালা দিয়ে ওরা বারবার ঘরের কাঠোমো বানায়। কিছুক্ষণের মধ্যে সে-ঘর কাঠামো জ্বলে ভেঙে অঙ্গার হয়। বারবার ওদের দু’জন এভাবে বানায় আর তা জ্বলে শেষ হয়।
সেই আগুনের ভেতর কিছু দৃশ্য- কিছু ঘর, কিছু দেশ, কিছু ফুল, কিছু পাখি আর কিছু ছোট ছোট মানুষ, যারা জোনাথান সুইফট’র ‘গালিভারস ট্রাভেল’র লিলিপুটিয়ানদের চাইতেও ছোট আকারের, পাঁচ ইঞ্চির বেশি হবে না। এই মানুষগুলো আগুনের ভেতর নানা প্রকার ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় মেতে আছে। আশ্চর্য!
আগুনের ভেতর এসব কী? আমি প্রশ্নবিদ্ধ এবং বিস্ময়াভিভূত! আমি আগুন স্পর্শ করতেই পারি না। আর ওরা সহজ স্বাভাবিক খেলছে ওখানে! হুমম, বুঝতে চেষ্টা করলাম, ওসব জ্বলবার নয়, ওসবের অস্তিত্ব অগ্নিময়। আগুনঘর, আগুনদেশ, আগুনপাখি আর অগ্নিময ছোট ছোট মানুষ। হঠাৎ একটা মোটা আকৃতির আলোপতঙ্গ এসে পড়ল আগুনে। ফটাফট জ্বলে অঙ্গার।
আমি জ্বলন্ত আগুনের দিকে তাকিয়ে আছি। আগুনের অন্তরের দৃশ্য দেখছি। পাশে আগুন পোহাতে থাকা একজন জিগাইল -
‘আগুনের দিহে অমন কইরা চাইয়া আছেন কেরে ভাইজান? মনে অইতাছে খুব মারাত্মক কিছু দেখতাছুইন!’ সে-ও বিস্ময়মাখা প্রশ্ন রাখে।
আমি কিছু দেখছি, এই কথা ওদেরকে বললে ওরা আমাকে সাংঘাতিক পাগল বলবে নয়তো আমাকে সাধু আউলিয়া মনে করে পূজা-ভক্তি শুরু করবে। আমি পাগল বা সাধু-আউলিয়া কোনো পরিচয় তাদের কাছ থেকে পেতে চাই না। তাই কিছু না বলে আমি ধীরে ধীরে ঘরে ফিরে যাই। ল্যাপটপে কিছু পঙ্ক্তি লিখি-
আগুন লেগেছে বনে। জ্বলছে আগুনে মন
কি কারণ এ-আগুন সে-বার্তা লুকিয়েছে রাতে।
যে-রাত নিশ্চিত শীত শীত, একা একা আসে
কালের হিসাবে;
আশ্চর্যসুন্দর।
জমে থাকা শিশির-আদর জ্বলিতেছে। কি আর
করিতে পারে শিশিরের মায়া! চুপ থাকে,
কারে ডাকে, হায় হায় চারপাশে, জ্বলে,
জ্বলে ছাই হয় বন আর বনেতে ছড়ানো শিশির গহনা।
কেউ বলে এ-মরণ সহজ সুখের মরণ।
এই যে জ্বলতে থাকা, শিশিরখচিত পাতা
সবুজ প্রকৃতি, আকাশের তারাদের চোখের
সামনে বেপরোয়া; এইভাবে জ্বলে যাওয়া
নিয়তি নির্ধারিত- বললেন ‘আগুনের উৎসব’।
চারপাশে হায় হায় তা-ও মায়ার কারণে।
ওইপাশে আলোপ্রেম জাগে।
এ-আগুনে চারপাশ আলো, ফূর্তি আসে বেশ
আলোপতঙ্গের মনে, বেকারার জানেমান ‘রাহা’,
উদ্দীপনা টানটান, সামাল সম্ভব নয় একটুও।
অগ্নিদেবী স্বাহা খুব তেজী, ছুটে আসে আলোপ্রেম
জ্বলিবে এখনি আহা! হয়তো এ-অগ্নিতে জ্বলে
দেওয়ানা মথম্যান- ইমরুয়ালকায়েস,
এ-বন বুঝি জুলজুল স্নানোদ্যান!
আগুনে জ্বলেছে, আলোতে জ্বলেছে বেশ বেশ
অগ্নিদেবী স্বাহা জ্বালাও জ্বালাও, পারো যদি
এ-বনে লুকানো সব ‘পিঁউ কাঁহা’ পাপিয়ার
বোলও জ্বালাও জ্বালাও।
আলোপতঙ্গটি যেই প্রেমের আগুনে পড়ে, দিশাহারা,
জানে না বেচারা, কানতেও সময় পায় না, জ্বলে
ছাই হয়; আগুনেই মিশে যায়।
আগুনও রাখে না হিসাব, কেন মরে এসে উ’ড়ে
আলোপ্রেমে জগতের পতঙ্গসকল। আলো শুধু আলো
নয়, আলোও হরণ করে।
পঙ্ক্তিগুলো লেখার পর ভাবতে থাকি ইমরু আল কায়েস’কে নিয়ে। পুস্তকপাঠ এবং আরব সন্তানের মুখের বয়ানে জেনেছি, ষষ্ঠ শতকের আরব কবি, যাকে আরব সাহিত্যের পিতা ধরা হয় বহুকাল; তার নাম ইমরু আল কায়েস। রাজপুত্র ছিলেন। কিন্তু দিল-দিওয়ানা। নারী সৌন্দর্যের প্রেমে পাগল পারা। শরাব পান করে পথে খেজুর তলায় পড়ে থাকতেন। একদিন তার প্রিয়তমা ওনয়যা দারতুল জুলজুল স্নানোদ্যানে সখিদের নিয়ে গোসল করছিলেন। ইমরু আল কায়েস শুধু মেয়েদল দেখে আগে বাড়েন। জানতেন না ওখানে তার জানেমান ওনয়যা আছে। নারীর শরীর দেখবার জন্যে, যখন তারা পানি থেকে উঠে আসবে, ইমরু আল কায়েস ঘাটে রাখা মেয়েদের কাপড়-চোপড় সরিয়ে কিছুদূরে এক পাশে বসে থাকে। লেবাসহীন ওনয়যা ‘ঘুরিয়ে গলার বাঁক’ পারের দিকে তাকাতেই দেখেন তার হাবিব তাদের কাপড় সরিয়ে বসে আছে। এতে ওনয়যা ভীষণ রেগে যান। গাঢ় অভিমান প্রকাশ করেন ভালোবাসাতে বিচ্ছেদ এনে।
সেকালের আরব সমাজে কোনো মেয়ের উদ্দেশ্যে ক্বসিদা (মৌখিক কাব্য ছন্দোবদ্ধ) রচিলে, ক্বসিদা রচয়িতাকে আর কেউ কনে দিতো না এবং যে-মেয়ের উদ্দেশ্যে ক্বসিদা, সেই মেয়েকে আর কেউ বিয়ে করতো না। কারণ তাদের বিশ্বাস ছিলো, ওই দুইয়ের হৃদয়ের কানেকশন পাক্কা, ওই ঘরে আর দ্বিতীয় কেউ ঢুকে লাভ নেই। ষোল আনা ভালোবাসা পাওয়া যাবে না।
ইমরু আল কায়েস যদিও তার বাবার সাথে বনিবনা ছিলো না, তার মদ আর নারী নিয়ে ডুবে থাকার খাসলতের কারণে, তবু তার বাবাকে হত্যা করবার পর, দেশছাড়া ইমরু আল কায়েস বাবা হত্যার প্রতিশোধ নিতে চেষ্টা চালায়। নিজের দেশ ছেড়ে যায় বাইজেনটাইন রাজা জাস্টিনিয়ানের কাছে নিজ রাজ্য ফিরে পাওয়ার জন্যে সহযোগিতা নিতে। কিন্তু প্রেমিক কবি ইমরু আল কায়েস জাস্টিনিয়ানের কোর্টের প্রিন্সেসকে পটানোর চেষ্টার কারণে প্রকাশ থাকে রাজা ক্ষিপ্ত হয়ে বিষাক্ত পোশাক পরিধান করিয়ে হত্যা করে। আরবের ঘরে ঘরে এখনো ইমরু আল কায়েস-এর একটি প্রেমরঞ্জিত পঙ্ক্তি শোনা যায়- قفا نبكى ذكرا حبيبًا و منزلى (ক্বিফা নাবকী জিকরা হাবিবান ওয়া মানজিলি) -Halt, Let us weep for the memory of beloved and abode.- থামো, বন্ধুগণ! কান্না পেয়েছে খুব রে! এসো কাঁদি, ওরে আমার হাবিব! ওরে গৃহ মায়া!
প্রেমাগুনের মথম্যান ইমরু আল কায়েসের একটি কবিতাতে সাফ কথা ছিলো, তার প্রিয়তমার ভালোবাসা তাকে মেরে ফেলছে। ভালোবাসার আগুনে পুড়ে মরা যাকে বলে। এ-আগুনে মরা তার নিয়তি ছিলো কেউ বলে, কিংবা অমন প্রেমাগুনে মরবার দরকার নাই কেউ বলে, অথবা অমন আগুনে সচেতনভাবে না-মরলেও পারতো ইত্যাদি ইত্যাদি কথাবার্তার ঝগড়া যেনো ওই বনের পাশের আগুনের ভেতর, যে-আগুন কিছু লোক পোহায় চুপচাপ আগুনের দিকে তাকিয়ে কিন্তু কিছুই দেখে না আগুন ছাড়া। আগুন পোহাচ্ছে যারা, তাদের একজন অন্যজনকে বলেন-
‘হুনরে ভাই, আগুনের ক্ষেমতা নাই সব কিছু জ্বালাইয়া ফালাইবার। কাউরে আগুনে ডরায়, বুঝছো? ইব্রাহিম নবিরে বাদশাহ নমরুদ অগ্নিকুণ্ডে ফালাইছিলো। সেই আগুন শীতল ঠাণ্ডা আরামের হইছিলো, তাপ-তেজ আছিলো না, আগুন হইছিলো ফুল বাগিচা, বুঝছো?’
অন্যজন বলে-
‘হ, বুঝছি।’
আমি দেখলাম, আগুনের ভেতর অগ্নিময় মানুষগুলো প্রেমাগুনের দরকার কি না তা নিয়ে তর্ক করতেই থাকে যতক্ষণ আগুন থাকে ততক্ষণ তর্কও থাকে। আগুন নিভে গেলে অগ্নিময় মানুষও নাই তর্কও নাই। যেমন নদী না থাকলে উজান ভাটার কোনো প্রসঙ্গ থাকে না; নদীর স্রোতও নাই বাঁকে বাঁকে বয়ে যাওয়াও নাই।
সহস্র শব্দার্থের একটি মায়াময় মুখ আমার সামনে উদ্ভাসিত হয়ে বললেন-
‘আগুন মানেই আগুন না, মৃত্যু মানেই মৃত্যু না। যারা আগুন পোহাচ্ছে, তারাও অগ্নিশোভিত, সে-আগুনের অন্য রূপ, অন্য পরিচয়। আগুনও আগুন পোহায়, আগুন ভালোবেসে মনোহর অগ্নিময়তার শোভাতে সমর্পিত হয়।’
বাংলাদেশ সময়: ১৫৩৫ ঘণ্টা, ১৫ অক্টোবর, ২০১২
সম্পাদনা: এম জে ফেরদৌস mjferdous0@gmail.com