 |
ঢাকা: বর্তমান বাজারমূল্যের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাড়ানো হলেও বাড়ানো হয়নি বিভিন্ন সেক্টরের শ্রমিকদের মজুরি। বেতন বাড়ানোর দাবিতে গার্মেন্টসসহ অন্যান্য সেক্টরের শ্রমিকরা বিভিন্ন সময় দাবি করে এলেও সেদিকে কর্ণপাত করেনি সরকার ও মালিকপক্ষ।
কোনো কোনো ক্ষেত্রে অবশ্য সরকার অনুরোধ জানালেও মালিকপক্ষ সে অনুরোধে সাড়া দিয়ে বেতন বাড়ানোর ঘোষণা দেয়নি।
সূত্রে জানা গেছে, গার্মেন্টস শ্রমিকদের জন্য সর্বশেষ ২০১০ সালে সর্বনিম্ন মজুরি ৩০০০ টাকা নির্ধারণ করে বেতন বাড়ানো হয়। অন্যদিকে চিংড়ি শ্রমিকদের জন্য সর্বশেষ মজুরি কাঠামো ঘোষণা করা হয় ২০০৯ সালে, যেখানে তাদের সর্বনিম্ন মজুরি ধরা হয় ২৯৪৫ টাকা। অন্যান্য সব খাতের শ্রমিকরাও ৩/৪ বছর ধরে একই হারে বেতন-ভাতা পাচ্ছেন। বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন করলেও তাদের বাড়তি মজুরি কাঠামো ঘোষণা করা হচ্ছে না।
অথচ এ দীর্ঘ সময়ে দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে বাড়িভাড়া, পরিবহন ভাড়াসহ জীবনযাত্রার জন্য আনুষঙ্গিক সব খাতের খরচ। ফলে বাজারমূল্যের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে না পেরে এক ধরনের মানবেতর জীবনযাপনই করতে হচ্ছে সব সেক্টরের শ্রমিকদের।
এর ওপরে অনেক কারখানায় সরকার নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরিও পরিশোধ করা হয় না। শ্রমিকদের অভিযোগ, অনিয়মিত মজুরি, মানহীন কর্মপরিবেশসহ তাদের ওপর মালিকপক্ষের বঞ্চনার নানা কথা খোদ সরকারের অনুসন্ধানে উঠে এলেও বরাবরই নিশ্চুপ থেকেছে সরকার।
শ্রম মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন বিশ্লেষণেও দেখা গেছে, দেশের পোশাক কারখানাগুলো এখনো পুরোপুরি মানসম্মত নয়। কোনো কারখানাতেই কোনো নিয়ম শতভাগ মানা হয় না। দেওয়া হয় না শতভাগ নিম্নতম মজুরি। সময়মতো মজুরিও পরিশোধ করে না অনেক কারখানা। অনিয়ম রয়েছে নিয়োগপত্র ও পরিচয়পত্র দেওয়ার ক্ষেত্রেও।
তবে শ্রমিক নেতারা বলছেন, দেশে সার্বিকভাবে সর্বনিম্ন মজুরি কাঠামো তো নেইই, এমনকি সেক্টরভিত্তিক মজুরি নির্ধারণ করাও নেই। তারপরও শ্রমিকদের বেতন বাড়ানোর কথা উঠলে বিষয়টি এড়িয়ে যান সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া সাম্প্রতিককালে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানো হলেও অবহেলিত থেকেছেন হতদরিদ্র জীবনযাপনে বাধ্য হওয়া বিভিন্ন সেক্টরের শ্রমজীবী মানুষেরা।
সম্প্রতি গার্মেন্টস সেক্টরের বেতন বৃদ্ধির দাবিতে আশুলিয়ায় শ্রমিকদের সহিংস আন্দোলনে কয়েকশ’ কারখানা বন্ধের মত ঘটনা ঘটলেও এখনো নিশ্চুপ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। সেখানে সরকারের আশ্বাসে শ্রমিকরা কাজে ফিরে যান। সরকারি পক্ষ মালিকদের প্রতি অনুরোধ জানায়, শ্রমিকদের ন্যার্য দাবি, বেতন-ভাতা বাড়ানোর জন্য। কিন্তু আন্দোলন থেমে যাওয়ার পর মালিকপক্ষ প্রতিশ্রুতি ও অনুরোধ রক্ষা করেনি।
এ বিষয়ে শ্রমিক নেতা ও সমাজতান্ত্রিক শ্রমিকফ্রন্টের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, ‘‘আমাদের দেশের সরকার শুধু মালিকদের। তারা শ্রমিকদের নয়, জনগণেরও নয়। শ্রমজীবীদের ভোট নিয়ে ক্ষমতায় গিয়ে সরকার মালিকদের স্বার্থ দেখে। এজন্য দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির বর্তমান সময়ে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ালেও তিন হাজার কিংবা দুই হাজারে থেমে আছে শ্রমজীবীদের ন্যূনতম মজুরি।’’
তিনি বলেন, ‘‘ন্যায্য দাবিতে শ্রমিকরা আন্দোলনে নামলেও পেটের দায়ে একসময় আবার কাজে ফিরতে হয় তাদের। এ সুযোগটাই নিচ্ছে মালিক পক্ষ এবং সরকার। তাই তাদের মজুর বাড়ানোর দাবি বারবার উপেক্ষিতই থেকে যায়।’’
সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর পর এখন শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর কোনো উদ্যোগ আছে কিনা জানতে চাইলে শ্রম মন্ত্রণালয় বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ইসরাফিল আলম এমপি শ্রমিকদের মজুরি কাঠামো বাড়ানোর কোনো উদ্যোগ নেই এমনটিই ইঙ্গিত করে বলেন, ‘‘যখন শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানো হয়েছিল, তখন চালের মূল্য ছিল প্রতি কেজি ৪০ থেকে ৪৫ টাকা। বর্তমানে ২৩-২৪ টাকায় এক কেজি চাল পাওয়া যাচ্ছে। এক সময় মূদ্রাস্ফীতি বেড়ে গিয়েছিল। এখন কমে গেছে। এসব দিক বিবেচনা করলে দেখা যায়, শ্রমিকদের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে। আমরা বলতে পারি শ্রমিকদের জীবন-মান কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। অন্যান্য জিনিসের কিছুটা মূল্য বৃদ্ধি হলেও তা সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে যাচ্ছে।’’
ইসরাফিল আলম আরো বলেন, ‘‘দেশে আপাতত সার্বিকভাবে সর্বনিম্ন মজুরি কাঠামো না থাকলেও বিভিন্ন সেক্টর ভিত্তিক শ্রমিকদের জন্য নিম্নতম মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করা আছে।’’
তবে নির্ধারিত এ কাঠামোর চেয়ে বেশি বেতন-ভাতাই পান এসব শ্রমিকরা বলেও দাবি করেন তিনি।
বাংলাদেশ সময়: ০৫৩৪ ঘণ্টা, আগস্ট ১২, ২০১২
জেপি/ সম্পাদনা: অশোকেশ রায়, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর