ঢাকা : সুখের সন্ধানে দেশ ছেড়েছিলেন তারা। সুখের বদলে জুটেছে অশেষ কষ্ট। তাঞ্জানিয়ার জেলের অন্ধকারেই ঈদ কাটাতে হবে সেদেশে আটক ১৯ বাংলাদেশিকে। দালালদের মাধ্যমে দক্ষিণ আফ্রিকা যাওয়ার পথে কয়েকমাস আগে সেখানে আটক হন তারা।
ওই ১৯ বাংলাদেশি এখন তাঞ্জানিয়ার দারুস সালামের মাতয়ারা কারাগারে আটক আছেন বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও পরিসংখ্যান ব্যুরো স্বজনদের মাধ্যমে এ খবর পেয়ে তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। অবৈধ উপায়ে বিদেশ যাওয়ায় তাদের ফিরিয়ে আনার খরচ দিতে অপারগতা জানিয়েছে সরকার।
খরচ চাওয়া হয় পরিবারের নিকট। কিন্তু মাত্র ছয়টি পরিবার ছাড়া অন্যান্যরা দারিদ্রের কারণে টাকা দিতে তাদের অক্ষমতার কথা জানায়। এরপর থেকেই আটকে যায় সেই ১৯ হতভাগ্য বাংলাদেশির দেশে ফেরা।
তবে আশার কথা হল সম্প্রতি এনজিএস নামে একটি গ্রুপ এসব শ্রমিককে দেশে ফিরিয়ে আনতে এগিয়ে এসেছেন। গ্রুপটি জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও পরিসংখ্যান ব্যুরোকে তাঞ্জানিয়া থেকে বাংলাদেশে ফেরার ১৯টি টিকিটসহ আনুষঙ্গিক অন্যান্য খরচ দিয়েছে।
তবে ঈদের আগে এ বিষয়ে কেনিয়া দূতাবাসের সঙ্গে আলাপ চূড়ান্ত না হওয়ায় তাদের ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।
বাংলাদেশ জনশক্তি কর্মসংস্থান ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর পরিচালক (কল্যাণ) মু. মোহসীন চৌধুরী বাংলানিউজকে বলেন, বেশ কিছুদিন আগে এসব আটক বাংলাদেশিদের স্বজনদের কাছ থেকে তাদের আটক হওয়ার বিষয়ে জানতে পারি। এরপর থেকে কেনিয়ার দূতাবাসের মাধ্যমে তাদেরকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা নেয় সরকার।
কিন্তু সরকারের ক্লিয়ারেন্স না নিয়ে বিদেশ যাওয়ায় তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া জটিল হয়ে দাঁড়ায়। তবে কেনিয়া দূতাবাসে আমরা চিঠি দিয়ে টাকা আদান প্রদানের উপায় জানতে চেয়েছি। আমরা আশা করছি ঈদের পর এদেরকে ফিরিয়ে আনতে পারব।
এদিকে প্রিয়জনদের ভিনদেশের জেলে আটকের খবর পাওয়ার পর থেকে এসব পরিবারগুলোতে দুঃখের ছায়া নেমে এসেছে। একটু ভাল আয়ের আশায় ভিটেমাটিসহ প্রায় সর্বস্ব বিক্রি অথবা দেনা করে তাদের বিদেশে যাওয়ার টাকার যোগান দিয়েছে পরিবার। অথচ আয় করা দূরে থাক- সবাই প্রাণে বেঁচে আছে কিনা তাও জানেনা তারা।
এদেরই একজন নরসিংদী জেলার পলাশ উপজেলার মোয়াকা গ্রামের মাসুম মিয়া। তার ভাবি রিমা আক্তার বাংলানিউজকে বলেন, জমি বন্ধক রেখে ও ধার করে ৭ লাখ টাকা দালালের হাতে দিয়ে মাসুমকে দক্ষিণ আফ্রিকা পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়।
কিন্তু দালালদের চক্রান্তে সে জেলে পড়ে আছে প্রায় আট থেকে ১০ মাস হতে চলল। সে এখন কেমন আছে খবর পাইনি। এ অবস্থায় ঈদ আর ঈদ থাকছেনা। শুধু আমরা অপেক্ষা করছি মাসুমের ফিরে আসার।
আটক আরেক বাংলাদেশি বিল্লালের স্ত্রী জনি জানান, স্থানীয় দালাল রিপন ও মিজানের খপ্পরে পড়ে দক্ষিণ আফ্রিকা যাওয়ার উদ্দেশ্যে নরসিংদীর শিলমন্দিরে ইলেকট্রনিক্সের দোকান বিক্রি করে বিল্লাল। সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা খরচ করে গেলেও এখন সে তাঞ্জানিয়ার জেলের অন্ধকারে পচে মরছে।
তিনি বলেন, সুখের সংসার ছিল আমাদের। এখন কিভাবে যে দিন পার করছি তা শুধু আমি জানি। জনি সরকারের কাছে তার স্বামীসহ আটক বাংলাদেশিদেরকে দ্রুত ফিরিয়ে আনার দাবি জানান।
প্রসঙ্গতঃ দক্ষিণ আফ্রিকা নেওয়ার কথা বলে ২০ জন বাংলাদেশির কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা নেয় স্থানীয় দালালরা। দালালদের লোকজন বিনা পাসপোর্টে ভারত-পাকিস্তান ইত্যাদি দেশের সীমান্ত পার করে তাদের। ঝুঁকিপূর্ণ ওই পথ পাড়ি দিতে গিয়ে পথেই একজন মারা যান।
বন-জঙ্গল পাড়ি দিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় যেতে তাঞ্জানিয়ার মরুভূমি পার হওয়ার চেষ্টাকালে সে দেশের সীমান্তরক্ষীরা বাকি ১৯ জনকে আটক করে কারাগারে পাঠায়।
তাঞ্জানিয়ায় কোনো বাংলাদেশি দূতাবাস না থাকায় কেনিয়ার বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে তাঞ্জানিয়া কর্তৃপক্ষ এ দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করে। তারা জানায়, ১৯ জন বাংলাদেশি এ দেশের মরুভূমি পাড়ি দেওয়ার সময় তাঞ্জানিয়ার সীমান্ত রক্ষীরা তাদের আটক করে কারাগারে পাঠান। এসব বাংলাদেশির কাছে কোনো পাসপোর্ট ছিল না।
পুশ-ইনের জন্য যাবতীয় খরচ পাঠানো হলে তাদেরকে ফেরত পাঠানো হবে বলেও জানানো হয় বাংলাদেশকে।
বাংলাদেশ সময় : ১৯১৯ ঘণ্টা, আগষ্ট ১৮, ২০১২
জেপি/ সম্পাদনা : সুকুমার সরকার, কো-অর্ডিনেশন এডিটর
kumar.sarkerbd@gmail.com