 |
রোমেলা খাতুন গৃহকর্মীর কাজ করত পুলিশ অফিসারের বাসায়। পান থেকে চুন খসলেই তার পিটের চামড়া আর অক্ষত থাকত না। এক দুই দিন নয়, প্রতিনিয়ত সে নির্যাতনের শিকার হয়েছে। রোমেলাকে নিয়ে পত্রিকায় সচিত্র সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। পুলিশ অফিসারের স্ত্রী পিঠের চামড়া তুলে নেয়ার জোগাড় করায় পিছনের দিকের কোনো ছবি সাংবাদিক দেখাতে চায়নি। সামনের দিকের যে ছবিটা পত্রিকাতে এসেছে তাতে দেখা যায় জড়সড় হয়ে বসা একটি জড়বস্তু রোমেলা। সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে এমনই একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে।
আমাদের চারপাশে তাকালে দেখা যায়, ছোট ছোট শিশুরা বিভিন্ন বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে নিয়োজিত রয়েছে। সংসারের সার্বক্ষণিক দেখাশুনা ছাড়াও সন্তান পালন, পানি তোলা, ঘর মোছা, হাড়িবাসন ও কাপড়-চোপড় পরিষ্কার করা, সবজি কাটা, বাটনা বাটা যাবতীয় কাজ তারা করে থাকে। তার বিনিময়ে তারা পায় ন্যূনতম খাবার সংস্থান (যার বেশির ভাগই উচ্ছিষ্ট, পঁচা-বাসী খাবার), ব্যবহৃত পোষাক পরিচ্ছদ। তারা ব্যবহার পায় ক্রীতদাসের মতো। তাদের ঠিক মানুষ বলে গণ্য করা হয় না। তাদের হাসতে মানা, তাদের কাঁদতে মানা, তাদের অনুভূতি প্রকাশ করতে মানা, তাদের পড়াশুনা করতে মানা। আর চলাচলের ওপর থাকে কড়া নজরদারি। তাদের বোবা ভাষাগুলো চার দেয়ালে গুমরে গুমরে কাঁদে। অনেক সময় গৃহকর্তা-গৃহকর্ত্রী তাদেরকে তালাচাবি বন্ধ করে কর্মক্ষেত্রে যান। ফলে কার্যত তারা কারাজীবন কাটাতে বাধ্য হয়।
এ শারীরিক ও মানসিক আঘাত পাওয়া তাদের অনেকেই ভাগ্যলিপি বলে মেনে নিয়েছে। তাদের অধিকার, পাওনার কথা খুব কমই গোচরে আসে। গোচরে আসে কেবল তখনই, যখন তারা মৃত্যুশয্যায়। যে মা-বাবা তাদের প্রিয় সন্তানকে অভাবের তাড়নায় বাসায় কাজ করতে পাঠায় তারা মনে করে হয়তো ভালোই আছে তাদের আদরের সন্তান। তবে বাস্তবতা হলো দু’টির জায়গায় তিনটি মরিচ পোড়ানোর জন্য, ভাত বেশি গলে বা পুড়ে গেলে, গৃহকর্ত্রীর সন্তান একটু আঘাত পেলে, প্লেট ভেঙ্গে ফেললে, আরো কত রকম কারণে একজন গৃহকর্মী নির্যাতনের শিকার তার হিসাব কেউ রাখে না। অনেক সময় তারা যৌন নির্যাতনেরও শিকার হয়।
এসব ক্ষেত্রে তারা বেশির ভাগ সময়ই পাশে পায় না কাউকে। পৃথিবীর সমস্ত বঞ্চনা যেন তাদের জন্য রাখা হয়েছে। তাদের প্রায় ১২-১৫ ঘন্টা কাজ করতে হয়। তাদের নেই কোনো ছুটি, নেই কোনো অবসর। তাদের খাবার দেওয়া হয় সবার শেষে। বসতে দেওয়া হয় সবচেয়ে নিচুতে, ঘুমাতে দেওয়া হয় মেঝেতে। অবশ্য সব গৃহে গৃহকর্মীর অবস্থা এরকম নয়।
তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এমনটিই ঘটে। তাদেরকে নির্যাতনের যেসব চিত্র আমরা দেখতে পাই তার সবই মধ্যযুগীয় বর্বরতা। অথচ এরা অধিকাংশ শিক্ষিত পরিবারে কাজ করে। তাহলে নিষ্পাপ এ মুখগুলোর জন্য কেন দয়া বা বিবেকবোধ কাজ করে না তা একবার ভাবার সময় এসেছে।
নগরায়ন ও শিল্পায়নের পাশাপাশি জীবন-জীবিকার কারণে মানুষ আজ শহরমুখী। যৌথ পরিবার ভেঙ্গে একক পরিবার গঠিত হচ্ছে। এসব পরিবারে স্বামী-স্ত্রী প্রায়ই কর্মরত থাকে। সেক্ষেত্রে গৃহকর্মী রাখা আবশ্যক হয়ে দাঁড়ায়। ঠিক দারিদ্র্যের কষাঘাতে যখন একজন পিতা সন্তানদের ভরণ-পোষণে ব্যর্থ হন কেবল তখনই তার সন্তানকে বাইরে কাজ করতে পাঠান।
ফলে শিশুটির পক্ষে পারিবারিক আবহে থাকা সম্ভব হয় না। অল্প বয়স থেকে সে অপরিচিত পরিবেশে নিজেকে খাপ খাওয়াতে চেষ্টা করে। সেই অপরিচিত পরিবেশের মানুষেরা যদি হয় নিষ্ঠুর তাহলে তার অস্তিত্ব রক্ষা আরো কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। যখন একটি শিশুর সুকুমার বৃত্তিগুলো প্রস্ফুটিত হওয়ার সময় তখন অংকুরেই তা বিনষ্ট হয়। এসব শিশুর অভিভাবক যেমন ১০-১৫ বছর ধরে একজন শিশুর লেখাপড়া চালানোকে অলাভজনক মনে করে তেমন গৃহকর্তা-গৃহকর্ত্রীও নিজের সংসারের কাজকর্মের বাইরে স্কুলে যাওয়া মেনে নিতে পারে না।
অথচ সংবিধানের ধারায় শিশুসহ সকল নাগরিকের মৌলিক অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পর “শিশু আইন ১৯৭৪” প্রবর্তিত হয়। এখানে শিশুর সংজ্ঞা, শিশুর বয়স, তার অধিকারের পরিধি প্রভৃতি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া ‘বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬’-এ একজন শিশু বা কিশোরকে নির্দিষ্ট কর্মঘন্টার জন্য শর্তাধীনে নির্ধারিত হালকা কাজে নিয়োজিত করার বিধান রয়েছে। জাতীয় শিশু নীতি ২০১১-তে ১৮ বছরের কম বয়সী সকলকে শিশু হিসেবে সংজ্ঞারিত করা হয়েছে।
১৯৮৯ সালের ২০ নভেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ “জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ” অনুমোদন ও গ্রহণ করে। ১৯৯০ সালের ৩ আগস্ট বাংলাদেশ এই সনদে অনুসমর্থন করে আইন বাস্তবায়নে রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার গ্রহণ করে।
জাতীয় শিশুশ্রম নিরসন নীতি ২০১০ এর আলোকে বাংলাদেশ সরকার শিশুদের সার্বিক কল্যাণে ব্যাপক কার্যক্রম গ্রহণ করেছে, যার মধ্যে রয়েছে শ্রমজীবী শিশুদের দারিদ্র্যের চক্র হতে বের করে আনার লক্ষ্যে তাদের পিতামাতাদের আয় বৃদ্ধিমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্তকরণ, স্কুলে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য বৃত্তি ও আনুতোষিক প্রদান ছাড়াও ২০১৫ সালের মধ্যে শিশুশ্রম নির্মূলের লক্ষ্যে বিভিন্ন স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা।
এই নীতি অনুযায়ী যেসব শিশু দৈনিক সর্বোচ্চ পাঁচ কর্মঘন্টার অতিরিক্ত সময় কাজ অথবা বিনা মজুরি, অনিয়মিত মজুরি, স্বল্প মজুরিতে কাজ করে, বাধ্য হয়ে কাজ করে সেসব ক্ষেত্রে মালিক, নিয়োগকর্তা, শিশু এবং শিশুর অভিভাবকের সাথে আলোচনা সাপেক্ষে ১৪ বছরের কমবয়সী শিশুকে সার্বক্ষণিক কর্মী হিসেবে নিয়োগ না করা, তাদের লেখাপড়া, থাকা-খাওয়া, আনন্দ-বিনোদনের
ব্যবস্থা করার শর্ত নির্ধারণ করে দেয়া হয়। শিশুদের সপ্তাহে অন্তত একদিন ছুটির ব্যবস্থা থাকবে।
নির্দিষ্ট হারে নিয়মিত বেতন পাওয়ার অধিকারও তাদের থাকবে। অথচ বাস্তবতা এই নীতির সাথে
আকাশ-পাতাল তফাৎ।
পবিত্র ইসলাম ধর্মে রয়েছে, তোমরা নিজেরা যা খাবে-পরবে, কাজের লোকদেরও তাই খেতে পরতে দেবে। ইসলামে তাদের হক ও অন্যের ব্যাপারে অবহেলাকে জুলুম বলা হয়েছে।
ক্রীতদাস প্রথা বিলুপ্ত হয়েছে সেই কবে। কিন্তু মানুষের মনে প্রভুত্ব করার বাসনা মরে যায়নি আজও। তাইতো অসহায়, নিরীহ গৃহকর্মীর ওপর চলে স্টিমরোলার। তাদেরকে কাঁদতে দেখে
আমাদের প্রভুত্ব জেগে ওঠে। তার রক্ত পানি করা শ্রমের বিনিময়ে ফিরিয়ে দেওয়া হয় শুধু অবহেলা আর অত্যাচার।
তাই যেখানে বিবেকবোধ কাজ করে না, সেখানে আইনের হাত প্রসার করতে হবে। যাদের বিরুদ্ধে নির্যাতনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আছে তাদেরকে আইনের আওতায় শাস্তির বিধান করা এবং কঠোর আইন প্রণয়ন করে কোমলমতি শিশুদের রক্ষা করার এখনই সময়। তাদেরকে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনতে হবে। তা না হলে সমাজ তথা দেশ অনেকখানি
পিছিয়ে পড়বে।
বাংলাদেশ সময়: ১৬৫০ঘণ্টা, ফেব্রুয়ারি ০৯, ২০১২