 |
আমার মৃত্যুদিনে
আমার জীবদৈহিক মৃত্যুদিনে মানুষের ঢল নেমেছিলো
কিছু চাপা কান্না আর অভিসম্পাতে ভারি হয়েছিলো পরিবেশ
কিছু কিংকর্তব্যবিমূঢ়তায় বুঝে উঠতে পারিনি অনেকেরই প্রতিক্রিয়া।
আমি ছিলাম ঠায় জাগতিক নীরবতা ভর করেছিলো মুহূর্তেই
এ এক অদ্ভুত দৃশ্য আমাকে দিয়ে সাজানো মঞ্চ
অথচ অংশগ্রহণের সামান্য সামর্থ্য হারিয়েছিলাম নিমিষেই,
বুজে আছি চোখ, বন্ধ করা মনোদুয়ার দেখছি সব তবু মনে হয়
দেখিনি অথবা দেখা হয়নি কিছুই কেমন অচেনা-অজানা ক্ষণ।
হাত নাড়াতে গিয়ে দেখি নড়েনা হাত, নড়ে উঠে পৃথিবী
পা চালাতে দেখি বরফখণ্ড পা, সরে যায় পুরো ভূ-খণ্ড
চাঁদ-সূর্যের ভেদ ভুলে মনে হয় এমন কিছুই ছিলো না কোনোকালেই
মিহি বাতাস আসে শনশন স্বরে তবু অনুভূতিশূন্যতা মোড়া!
আমার জীবদৈহিক মৃত্যুদিনের মানবঢলে আমি কাউকেই চিনতে পারিনি
এমনকি আমার পরিজন যাদের সাথে ছিলো আমার জন্মসহযোগ
আমার ধমনীতে বয়ে যাওয়া যে রক্তের ধারাতে আরো ক’জন
শেয়ার করেছিলো তাদেরও আলাদা করতে পারিনি সময়ের তোড়ে,
আমার রক্তে কিছু রক্তের জন্ম হয়েছিলো বলে জানে লোকে তারাও অজানা ক্ষেত্র
মনে হয় আমি ছিলাম একাকী একজন; অনাহূত আগন্তুক কোনো!
কেন এত মানুষের ঢল ,কেন এত প্রার্থনাসভা অথবা শেষকৃত্যানুষ্ঠান
আমি ভাবতে গিয়ে থমকে যাই-কেউ একজন কেড়ে নেয় ভাবনা সক্ষমতা
আমার ভাবনাসমূহ আমাতেই ফিরে আসে সে বিরূপ সময়ে।
আমার জীবদৈহিক মৃত্যুদিনে আমার সক্ষমতা হারালাম আনুষ্ঠানিক
তার আগেই কোন একসময়ে হয়েছিলো মনোদৈহিক মৃত্যু,
সে মৃত্যুদিনে আমার বাড়িতে নামেনি কোনো মানুষের ঢল
এক ফোঁটাও অশ্রু ঝরেনি কারো চোখ দিয়ে
কেউ বসেনি প্রার্থনাসভায়, কোনো আয়োজনই ছিলো না শেষকৃত্যানুষ্ঠানের
পরিজন ভেবেছিলাম জনমভর যাদের তারাও খেয়ালে নেয়নি কখনো
অবেলায় নিজেকে হারিয়ে ঠায় পড়েছিলাম নিজস্ব ভূমিসমতটে।
আমার মৃত্যুদিন আমাকে শিখিয়েছে বিস্তর তাই আমি একাকীজন
আমার মৃত্যুদিন আমাকে বলেছে আমি ছিলাম প্রকৃতই অস্তিত্বহীন।
নীল চাঁদ
একটা আস্ত চাঁদ, নীলাভ ভীষণ মনের নোঙরে
ঢুকে পড়ে আচমকা বিষাদে নদীর বুকে
বাতাসের ফাঁকে কদাচ চোখ যায়, বিষাদে মাখামাখি
আলগা পথ মাঝপথে, উতলে ওঠে নদীর বুক
খবরটি হয়তো গুরুত্বহীন, তাই ছাপেনি কোন সংবাদপত্র।
সেদিন দখিনা হাওয়ার গায়ে ভেসেছিল একটা টুইটুম্বুর কামার্ত বুক
নগরের অলিগলিতে সারিবদ্ধ মানুষে সারি,উল্লসিত অনলাইনী যুবা
বাতাসের শীৎকার, কপাট বন্ধ উলুখড় অথবা ধ্রুপদী নৃত্য
সব তেড়ে আসে নির্নিমেষ সহজিয়া আদিপোশাকে।
আদিতে অন্ত ছিল না বলে যুবামন আহা কালের কাল
ভবিতব্য ভাবেনি কেউ তাই নগরে নাগরিক হাঁটে উচাটন মনে
একটা আস্ত চাঁদ বিষণ্ণ ভীষণ, পোশাকী ঢঙে নাড়িয়ে দেয় সব
নীল-নীল; নীলে মাখামাখি হয়ে পোয়াতি হয়ে উঠুক সারা বিশ্ব।
পৌনঃপুনিক
আমাকে বোধটুকু জাগিয়ে দেয় বৈরি জাহাজ
দূরত্ব কাহাতক জানে না শিল্প জাদুঘর
বৃত্ত থেকে বৃত্তায়ন হয়ে চন্দ্রবিন্দু-
কোথা গেলে টানা যাবে অভব্যতার রাশ।
সমুদ্রে নেমে আবিষ্কার করেছিলাম নুড়ি সমগ্র
হাতে হাতে উঠে আসে সভ্যতার ফসিল
উন্মুক্ত বাজারের টুকরিতে বসে হয়েছিলাম সওদাপণ্য
অগুন্তি মাথার একটা চোখও হিসেবে আনেনি তখন-
স্বভাব আমি শেষ বিচারে থেকেছিলাম বাতিলসম এক।
আমাকে অবাক করে কাশফুল বন
মাতাল হাওয়া সমানে চালায় গণধর্ষণ
ধর্ষিতা সে তবু চেনেনি শীৎকার, সহ্যের মালা গায়ে তার
দিবসী আয়োজন মন্ত্রমুগ্ধ; আশ্চর্য জলছাপ।
আজ শরতের আকাশে একঝাঁক পায়রা ডানা মেলুক
আজ হেমন্ত নেমে আসুক আগেভাগেই পূর্বঘোষণা ছাড়া-
আজ বেত হাতে ভূখা ছাত্র পেটাতে ইস্কুলে যাক অমিয় মাস্টার!
বিদেহী আত্মা
রাত হলে বাড়ি ফিরি বলে আমার দিকে হেলে পড়েছে ঘরের দেয়াল। তার নির্বিকার চাহনিতে আমি দগ্ধ
হই নিয়ত। মনে হয় কে জানি ইঁদুরচোখে দেখছে আমায়। জানোই তো, ইঁদুরে আমার ভীষণ অপছন্দ
সেই আদিকাল থেকে। শুনেছি জন্মাবার পর থেকেই। বিশ্বাস করো, ইঁদুরবিদ্বেষি আমি ছিলাম সেই
আদি থেকে যখন আমাদের আত্মারা লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থেকেছিলো কোনো না কোনো দেহ পাবার
আশায়!
আমি ছিলাম আত্মা ছাড়া এক। শুধু শুধু দেহ নিয়ে আচানকলয়ে ঘুরছিলাম। তারপর মাঝপথে এসে কোন
এক আত্মাকে বগলদাবা করে নিজেকে দিয়েছিলাম মানুষে অবয়ব! তাই পৃথিবীপথে আসতে গিয়ে হাওয়ায়
ভাসা সবগুলো প্রশ্নকে উড়িয়েছিলাম নির্বিকার। ভাবনায় আমি ছাড়া ছিলনা কেউ বলে শুধাতে পারিনি
আত্মার পেছনকার মালিকের নাম। তাই কিছুদিন থেকেছিলাম পরিচয়হীন!
ইত্যবসরে শোনা গেলো কোন এক বিদেহি আত্মাচরিত্র চুরি গেছে। যার নাম ছিল কবিদের কাতারের
ঠিক সামনে। আমি আমাকে লুকাই, আমার আত্মাকে লুকাই কিন্তু দেহ লুকাতে গিয়ে ধরা পড়ি নিজের
কাছে। চুরি করা মন চুপি চুপি চুপ হয়। নিজেকে আবিষ্কারের কালে আবিষ্কার করি কলম্বসের
সহোদর।
আমার ঘরের বারান্দায় আজ আমি একটা ছবি লটকে রাখতে চাই; ঠিক ঠিক আমিপ্রতিরূপ। ঘরে ঘরে
আমার বাস বলে বারান্দাতেই থাক আমাপ্রতিকৃতি। আমি আমাকে দেখতে গেলে উঁকি দেবো বারান্দায়!
যেখানে রাতের চাঁদ এসে সরাসরি উপচে পড়বে আমার ওপর!
আমার আত্মা আমাকে ডাকে। আমি ডাকি দেহকে। দেহ ডাকে আত্মাকে। পড়ে যাই ঘূর্ণাবর্তে।
ঘূর্ণনের কালে ঘূর্ণি উঠে সময়ে। বিদেহী আত্মা আবারো দেহ খুঁজে নির্লিপ্ততাকে সাথে করে।
সুশীলের গণতন্ত্র
সন্ধ্যারাতে আকাশ দেখতে যেয়ে থমকে যাই
আকাশের মাঝে বসত গাড়ে কতিপয় সেনা আইন
সেনা আইনে খানিক অনাসক্তি আমাকে আপ্লুত করে
তাই বার বার ভাঙতে যেয়ে পিছিয়ে আসি কতিপয় স্রোতের তোড়ে!
মনে রেখো, একদিন আমিও আইন করবো আইন ভাঙার
নিঃসীম কালো পিচঢালা রাজপথ না হোক একান্ত মনের ঘরে
অথবা একটা শুভ্র মাইক্রো ভাড়া করে নিয়ে এসে নিজের বাড়ি,
জানোই তো, দরোজার খিল এঁটে দিলে-
আমিও হতে পারি সেনাশাসকসম শক্তিমান
ভয় কেটে গেলে নিঃসীম আকাশ দাঁড়িয়ে যাবে মাথার ওপর
সে আলগোছে ছায়াশোভিত ঢঙে কানে কানে বলে যাবে- ভাঙো আইন!
আমি আইন ভেঙে আইনের পথে দাঁড়িয়ে গিয়ে জারি করে দেব আরেক আইন
প্রকাশ্যে রাস্তায় নেমে আসবে বিপ্লবীরা আইন ভেঙে; সেনা আইন ভেঙে
সেনারা সব নেমে যাবে রাস্তায় আইনের তুড়ি নিয়ে
আমার আইন বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাবে তাদের তোমাকে সাথে নিয়ে,
যে দরোজা খিল আঁটা গেয়ো রথ সেখানে পৌছায় না আইন
হোক না সে সেনা আইন কোনো অথবা গেয়ো বুনো আইন
সবকিছু মুখ থুবড়ে পড়ে আমাদের একান্ত গণতন্ত্রের কাছে
একজন ফতোয়াজীবী বাড়ি বাড়ি যাবে তল্পিতল্পা সাথে নিয়ে
ভিখিরি বেশে করে যাবে আইন অমান্যের সমূহ সংজ্ঞায়ন।
জগতের সুশীলেরা পত্রিকায় ঝড় তুলে করে যাক কুৎসা রটনা
আমি তবে খিল আঁটা ঘরে গণতন্ত্র শিখবো, করে যাবো গণতন্ত্রের শ্লোকপাঠ!
বাংলাদেশ সময়: ১৪৩৮ ঘণ্টা, ০৯ সেপ্টেম্বর, ২০১২