৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২০, বৃহস্পতিবার মে ২৩, ২০১৩ ১:৫৩ পিএম BDST banglanew24
09 Sep 2012   06:36:07 PM   Sunday BdST
E-mail this

জেব্রামাস্টার

‘জ্যোতির্ময় ঘুঘু’র সাক্ষাৎকার, ভাষার ভেতরে ভাষা


সারওয়ার চৌধুরী
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
‘জ্যোতির্ময় ঘুঘু’র সাক্ষাৎকার, ভাষার ভেতরে ভাষা জেব্রামাস্টার

‘বজ্রনির্দেশিত পথ খুলে যাচ্ছে পাপড়ির মতো, নাকি এও কোনো তত্ত্ব অভিনয়! ঈগলের বাসা খুঁজে, জহরের দানা খেয়ে এ গহন আমিত্ব ফুরায়।’

‘রক্তবর্ণনার ভিতর দিয়ে যাই। হে অভিরূপ, তুমি কোন পাখি? নির্জন ঘাটে শুয়ে কেউ কেউ ক্ষয় হয়ে যায়। মাছরাঙা এক প্রকার আলোজাদু।’

‘অশেষ উড্ডয়নের কাল এসে পড়ল, হে উড়ুক্কু মাছ আমাকে সঙ্গে নাও।’

‘অয়দিপাউস, মৃত্যুও এক বিবাহ- এই সারমর্মটুকু, তুমি আজ মেনে নিতে হয়তোবা প্রস্তুত-’

‘জানি ঘাসফুলের আর্তনাদ পার হয়ে আসতে পারে না গোপিনীরা, অধিবিদ্যার ভেতর লুকাতে গিয়ে হারিয়ে যায় ঘুঘুরাও।’

‘ভাষার উর্ধ্বে, সন্তনির্জন নীলের মহাআঙিনায়, মাথা ঝাঁকায় এক আসমানি গাছ, পৃথিবীতে আমি একটা করে তৃণ-ঢাকা কথা বলি, আর মাথা ঝাঁকায় আসমানি গাছ, ফাটে কার্পাসের স্বপ্ন, একটা রঙিন ফুটো দিয়ে দেখতে পাই সমস্ত রগড় ও বায়ুনাটক, পালকের নিন্দাশূন্য লেখাগুলো পাঠ করি, মাথা জোরে ঝাঁকাতে থাকে আসমানি গাছ..’

‘বিরল দর্শন তারা, শ্বেতবাক্যসকল, শিংসহ দিগন্তে উপস্থিত। ভেবেছিলাম কিছু কথা খুলে নেব রেশমগুটি থেকে, মাঝে, বাধা হয়ে দাঁড়ায় সবচেয়ে উজ্জ্বল তারা। ঘুমিয়ে পড়ি, জুড়িগাড়ি ফিরে আসে বুঝি, রঙরাক্ষস পদচ্ছাপ রেখে যায় আঙিনায়। আর ভ্রান্তি ছড়ানো জ্যোৎস্নার ভেতর সাপলুডু বোর্ড যেন সমস্ত চরাচর।’

‘একটু পরে, প্রতিফলিত চাঁদের দিকে লাফ দেবে তন্ময় হরিণ। রাত নিজেই তার উপসংহার লিখছে এখন।’

‘অগ্নিকুণ্ডের পাশে বসে থাকি আমি আর কাগজের বাঘ। একমুঠো স্বর্ণধুলি নিক্ষেপ করে আগুনে, আর বলি, হে রঙিন, হে স্বপ্নশিক্ষক, রাত্রির সব অস্ফুট গান আমাকে দাও।’

‘শুধু বৃষ্টিভেজা পাখির ডিমগুলো কুড়োতে থাকি। আকাশের সাত ঋষি আর মৃত্যুঞ্জয়ী পুষ্পসকল ভর্ৎসনা করে, তবু, ঘুরে ফিরে এই নিরুপম কুড়োবার নেশা ক্রমে সপ্তমে ওঠে।’

‘আমার মৃত্যুর তারিখের ওপর মেরুন রঙের একটা পাহাড় বসে আছে।’


উপরে উল্লেখিত ঝরঝরে ঝিলমিল কবিতা-কথা কবি মজনু শাহ-এর ‘জেব্রামাস্টার’ থেকে নেয়া। এই উদ্ধৃতাংশে কী আছে না-আছে ঠিক তা নিয়ে কোনো শিল্পতত্ত্বের ভিতরে ঢুকে বিচার-বিবেচনা করতে যাচ্ছি না এখন। দেখলাম, এক জগতমণ্ডল বিষয়ক কলা জগতের নির্ধারিত অথচ অশেষ পাঠবস্তু ‘জেব্রামাস্টার’।

যে-জগত ‘সহস্র দরজার জগৎ’ পরিভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে আসে। চলতে চলতে শব্দ বাক্যের ভাঁজ খুলতে থাকে একের পর এক। এক শব্দার্থের ভেতরে ভিন্ন শব্দার্থের সবুজ সমাবেশ পাওয়া যায়।

‘Poetry is the record of the best and happiest moments of the happiest and best minds.’ – Percy Bysshe Shelley

আমি ‘জেব্রামাস্টার’ ভ্রমণ করি। পথে পথে তাতে ‘স্বর্ণপ্রশ্নের গভীরে’ যাওয়ার নানা পথও দেখি। পথগুলো বহুবিধ সুন্দরের দিকে ইশারা করে। একটি কাব্যগ্রন্থ কিভাবে ছায়াপথের মর্ম ধরে তা পর্যবেক্ষণের চেষ্টা করি। নিজেকে দেখি, ‘জেব্রামাস্টার’ দেখি, মজনু শাহ দেখি। পেয়ে যাই এক ‘জ্যোতির্ময় ঘুঘু’র সাক্ষাৎ পরোক্ষভাবে। সরাসরি দৃশ্যপটে নেই। কিন্তু আছেন, অনেকটা এমনভাবে যে, ভাষার সিঁড়ি বেয়ে অনির্বচনীয় ভাব কিছুটা বুঝি কিন্তু ষোল আনা অনির্বচনীয় ভাষার বাইরে। আমি কথা বলি তার সাথে।

আমি-
আপনাকে পেয়ে খুশি হলাম।
জ্যোতির্ময় ঘুঘু-
আমি তো আড়ালে, এখানে এলেন কি করে! খুশি হওয়ার কারণ জানতে পারি?
আমি-
কিছু তথ্য জানাতে পারবো। কেমনে এলাম জানি না!
জ্যোতির্ময় ঘুঘু-
জানাজানি, হুম, আপনাদের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ। আমার কাছে তো ‘পরলোকগামী সিংহের কারুকাজ থেকে আলো আসে’।
আমি-
কেন আসে?
জ্যোতির্ময় ঘুঘু-
সুন্দরের ভাঁজ খুলবার জন্যে।
আমি-
মানে?
জ্যোতির্ময় ঘুঘু-
কলা জগতে প্রধান বিবেচনা সৌন্দর্যের বিশেষ ভাঁজ খুলতে পারা। সরাসরি দেখলে যে-ভাঁজ খোলে তাতে ওই বিশেষ সুন্দর ধরা যায় না।
আমি-
ভাষা যে-অর্থ বিন্যাস করে তার উর্ধ্বে যাবার কথা বলছেন কি?
জ্যোতির্ময় ঘুঘু-
ঠিক উর্ধ্বে নয় আবার উর্ধ্বে এবং ভেতরেও থাকা, যেখানে দুঃখও খুশি নিয়ে আসে, মানে, বচনের দ্বারা অনির্বচনীয় ধরবার প্রয়াস বিস্ময়কর বর্ণচ্ছটার মাধ্যমে। আপনি চান্স পেতে পারেন ছয় রিপুর প্রত্যেকটির একটা সুন্দরম বিন্যাস দেখতে দেখতে অতিক্রম করে যাওয়া। তখন আপনি প্রশ্ন করবেন না, কেন ‘মাথা ঝাঁকায় এক আসমানি গাছ’ এবং অর্থ খুঁজবেন না কেন ‘ফাটে কার্পাসের স্বপ্ন’। আপনি সহজে বুঝে নেবেন, কী কারণে নারীদের এলোচুলে ঢাকা থাকে গল্প উপন্যাস কবিতা কিংবা নতুন শিল্পকলার পাঠবস্তু। বুঝবেন, ‘মৃত্যু এক বিবাহ’ অনায়াসে। টের পেয়ে যাবেন নতুন দেশে নতুন নাইওরি যাওয়ার মর্ম।
জানেন মনে করি, ভাষাতে ভর করে খুব বেশি যাওয়া যায় না। ভাষার ভেতর দিয়ে চলতে চলতে নিশ্চিত আপনি সুখ এবং অসুখ আনেন অথবা পেয়ে যান। ভাষার ভেতরে থাকা ধারণাদের ধরে আপনি চিন্তাপদ্ধতির একটা ধারা বুঝেন। তবু আপনার ‘চিন্তাপদ্ধতি সরাইখানার হট্টগোল’ আকারে বিরাজ করে। যে-কারণে আপনি জানেন না, কী কারণে আপনি মানুষ, আমি জানতাম না কেন ঘুঘু আমি, মজনু শাহও জানেন না কেন তিনি মজনু শাহ। জল স্থলের সকল পশু পাখি কীট পতঙ্গ লতাগুল্ম কেউ জানে না তারা কেন অমন রূপে উদ্ভাসিত।

আমি-
মজনু শাহ`র পরিচয় কিছু বলেন।
জ্যোতির্ময় ঘুঘু-
কিছু বলতে পারি, হুমম.... আচ্ছা ঠিক আছে বলি...
‘জেব্রামাস্টার’-এর নানা প্রান্ত-প্রসঙ্গে আপনি মজনু শাহ-এর সহস্র পরিচয় পাবেন প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে। কোথাও ‘চন্দ্রপরামর্শ’দাতা ‘তান্ত্রিক পাখি’, কোথাও যথার্থ বাদ্যযন্ত্র, কখনো মনে হবে মহাজাগতিক দুঃখ ধারণ করে থাকা ‘সূফি কবুতর’। কোনো এক মোড়ে তার আদলে আপনি দেখবেন আমাকে। আমি তার ‘তন্ময় হরিণ’ রূপটির প্রভাব দেখতে পাই বেশ চমকপ্রদ, কোথাও ‘শয়তানের সাথে বসে কফি খাওয়ার ইচ্ছে সত্ত্বেও’। হরিণের ওই কিচ্ছাটা জানেন নিশ্চয়ই- ওই যে, নিজের নাভীদেশে ফোটা কস্তুরীর ঘ্রাণে দেওয়ানা হয়ে দিশাহারা দৌড়তে থাকে ঘ্র্রাণের খোঁজে, সে জানে না এই অসাধারণ ঘ্রাণ তারই নাভীদেশ থেকে আসছে, সে ভাবে আশেপাশে কোথাও আছে সে-ঘ্রাণের ধারক মালিক, তাই খুঁজতে থাকে, যদি জানতো এই ঘ্রাণের মর্ম তার কাছেই, তবে সে আর ছুটোছুটি করতো না দিশাহারা।  (The musk gland is found only in adult males.) এই ‘তন্ময় হরিণ’ পুরুষ হরিণ, কিন্তু তার কস্তুরী ঘ্রাণের লিঙ্গ পরিচয় নেই, আছে অন্যরকম বিস্ময় সুন্দর মুগ্ধতা। যে-কি না সহজেই দেখতে পারে, একটি রাত নিজে নিজে কিভাবে লিখে তার উপসংহার। যিনি রেশমগুটি থেকে কিছু কথা খুলে বের করবার জন্যে অনায়াসে এগিয়ে যান; যিনি ভালোভাবে দেখেন- ‘জলত্যাগী এক ঝাঁক কৈ মাছ কান দিয়ে হেঁটে কাব্যসমালোচককে ধাওয়া করছে’।
 
আমি-
করবেই তো, পৃথিবীর কোনো মৌলিক রঙের ভেতরে কাব্যসমালোচক বা শিল্প সমালোচক দেখতে পাই না। আছে শুধু ধারণা আরোপিত ফেরিওলা। আমার মনে হয়, ভাষার ভেতরে সুসজ্জিত ভাষা কবিতা-শিল্পকে প্রকাশ করে। ওই ভেতরকার ভাষা উন্মোচন করে দৃশ্যসমূহের প্রবর্তিত অর্থের অধিক অর্থময়তা। পাঠক সিগনিফায়ারদের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হবার সাথে সাথে সিগনিফায়েডসদের উন্মোচন দেখে অভিভূত হন।
জ্যোতির্ময় ঘুঘু-
হুম, একটু মগ্ন হলেই দেখবেন তার শব্দদের ভেতর দিয়ে ‘সারাক্ষণ এক কুমকুমবর্ণ চক্রবাক তাকে ডাকে’। এই ফাঁকে বলি, মানে, আপনাকে স্মরণ করিয়ে দেই উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ-এর কথাটি- spontaneous overflow of powerful feelings কবিতার পঙ্‌ক্তিরা বিকিরণ করে। দেখেছেন নিশ্চয়, এই ‘জেব্রামাস্টার’-এর ভেতরে মজনু শাহ ‘বাতাসের গায়ে ফোটা’ চিন্তা ও স্বপ্নকে মনোহর তরিকায় ধরেছেন। খুব সাংঘাতিক! ‘সূক্ষ্মদেহ পেয়ে’ ‘মৃণালের ভেতর’ ঢুকে যাবার বাসনাও আছে তার! আর ‘গাঁদা ফুলে সাজানো নৌকায় গিয়ে’ বসে থাকেন যখন মন চায়; ‘জলপাই পাতার মুকুট খুলে ঘুমিয়ে’ পড়েন। এবং সরাসরি জানিয়ে দেন– ‘নিদ্রা দিয়ে লিখি, নিদ্রা দিয়ে মুছে ফেলি’। আমিও মুগ্ধ দেখি, ‘আকাশের সাত ঋষি আর মৃত্যুঞ্জয়ী পুষ্পসকল ভর্ৎসনা’ সত্ত্বেও ‘শ্যাম পাহাড়ে’ গিয়ে তালজ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। এ এমন এক হারিয়ে যাওয়া, হারানোর ফলেই শিল্পের পর্দা খোলে। ফলে ফানা ফানা হয়ে ‘শুধু বৃষ্টিভেজা পাখির ডিমগুলো’ কুড়োবার জন্যে ঘরের বাহির হতে হয়। আর বলবো না, এইখানে থামি, চুপ হই, আরো বর্ষাকাল বলতে থাকলেও এক সময় অসম্পূর্ণই থামতে হবে। কবিতারাও এভাবে থামে।

আমি-
আপনাকে অনেক ধন্যবাদ জ্যোতির্ময় ঘুঘু!
জ্যোতির্ময় ঘুঘু-
আপনাকেও ধন্যবাদ।

(উল্লেখ্য এই রচনার কথনে/কথোপকথনে উদ্ধৃতিগুলোও ‘জেব্রামাস্টার’-এর বিভিন্ন অঞ্চলের কবিতাংশ।)

বাংলাদেশ সময়: ১৮১০ ঘণ্টা, ০৯ সেপ্টেম্বর, ২০১২
সম্পাদনা: এম জে ফেরদৌস

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Bookmark and Share
REVE Systems
VISA Center Inc
Holy Hajj BD
RehabHousing.com

শিল্প-সাহিত্য

8877
Kaspersky Lab - Antivirus Software [ Bangladesh ]
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম | এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

ফোন: +৮৮০ ২ ৮৪০২১৮১, ৮৪০২১৮২ আই.পি. ফোন: +৮৮০-৯৬১২১২০০০০ নিউজ রুম সেল: +৮৮-০১৭২৯০৭৬৯৯৬, ০১৭২৯০৭৬৯৯৯ ফ্যাক্স: +৮৮০ ২ ৮৪০ ২৩৪৬
ইমেইল: news.bn24@gmail.com, editor.banglanews@gmail.com, editor@banglanews24.com    বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম    এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

বাংলায় লেখা হলে ইউনিকোডে পরিবর্তন করে ইমেইল করুন    কপিরাইট © 2013 সকল স্বত্ব ® সংরক্ষিত    একটি ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেড প্রতিষ্ঠান