 |
| ছবি: রুবেল/বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম |
আশুলিয়া থেকে ফিরে: টানা ৪ দিন বন্ধ থাকার পর আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চল খুলে দেওয়ায় এলাকার সব শ্রেণীর মানুষের মধ্যে স্বস্তি নেমে এসেছে। একই সঙ্গে বন্ধ কারখানাগুলো শ্রমিক অসন্তোষের কারণে যে কয়দিন বন্ধ ছিল, সে এক সপ্তাহের বেতন শ্রমিকরা পাবেন কি না এ নিয়ে আশংকাও তৈরি হয়েছে।
শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কারখানা বন্ধ থাকায় তাদের জীবনে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসে। যে দোকানগুলো থেকে তারা মাসিক ভিত্তিতে বাকি সওদা করত, গত ৪ দিন সেসব দোকানি তাদের মালামাল দেয়নি। অনেক বাড়িওয়ালা শ্রমিকদের সন্দেহের চোখে দেখা শুরু করে এবং ভাড়া না দিয়ে যাতে শ্রমিকরা পালিয়ে যেতে না পারে সে জন্য পাহারাদার নিয়োগ করে। অনেকের কাছে নগদ টাকা না থাকায় তারা টাকা ধার করে গ্রামের বাড়িতে চলে যাওয়ায় হঠাৎ করে বেড়েছে বাড়তি দেনার দায়।
তবে বুধবার কারখানা খোলার ঘোষণার পর থেকে অবস্থা পাল্টাতে থাকে। দোকানিরা আবার শ্রমিকদের ডেকে হাসি মুখে কথা বলা শুরু করেন। যেচে সওদা গছিয়ে দেন, রাত থেকেই বাড়িওয়ালারা ভাড়াটিয়াদের খবর নিতে শুরু করেন। এ যেন পুজিঁবাদী সমাজের এক করুণ নাটক।
রংপুরের পীরগাছার মামুন, খুলনার তেরোখাদার জুয়েল, সাতক্ষীরার শ্যামনগরের সাখাওয়াত, ফরিদপুরের সদরপুরের বাদশা, ররিশালের মূলাদির মহসিন, ভোলার চরফ্যাসনের কামরান, নোয়াখালীর সোনাগাজীর টিপু আরো কত কত নাম, তাদের কাছেই জানা গেল আশুলিয়ার এ করুণ চিত্র।
আশুলিয়ায় সারাদিন ঘুরে সব ধরনের মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কারখানা বন্ধ থাকায় এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, বাড়িওয়ালা, শ্রমিক সবার মধ্যেই এক ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছিল। এর মধ্যেই অনেক শ্রমিক চলে গিয়েছিলেন গ্রামের বাড়িতে।
বৃহস্পতিবার কারখানা খুলে দেওয়ায় বেশিরভাগ কারখানাতেই ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ শ্রমিক কাজে যোগ দিয়েছেন বলে জানা গেছে কারখানা সূত্রে।
চালু হওয়া কয়েকটি কারখানার ব্যবস্থাপকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শনিবার থেকে শতভাগ শ্রমিকই কাজে যোগ দেবেন বলে আশা করছেন তারা।
মেঘনা গার্মেন্টসের সহকারী ব্যবস্থাপক গোলাম ফারুক বলেন, ‘আশা করছি আগামীকালের মধ্যে বাড়িতে যাওয়া শ্রমিকরা কর্মস্থলে ফিরে আসবেন এবং শনিবার থেকে তারা কাজে যোগ দেবেন।’
আশুলিয়ার নরসিংহপুর এলাকার মুদি দোকানদার মুরাদ বলেন, ‘অনির্দিষ্টকালের জন্য কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় খুব বড় অনিশ্চিয়তায় পড়েছিলোম।’
কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘প্রায় ৫শ’ শ্রমিক আমার দোকানের বাকির খাতার খরিদ্দার। মাসের মধ্য সময়ে কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়াতে আমার প্রায় ৪ লাখ টাকার পুঁজি চরম অনিশ্চিয়তায় পড়েছিল। কারখানা না খুললে শ্রমিকরা বেতন পাবে না, আমিও আমার টাকা তুলতে পারতাম না।’
তিনি বলেন, ‘অনেকদিন কারখানা বন্ধ থাকলে অনেক শ্রমিক হয়তো ফিরেই আসতো না। কেবল মালামাল বাকিই নয়, অনেক শ্রমিক বাড়িতে যাওয়ার ভাড়ার টাকা পর্যন্তও আমার কাছ থেকে নিয়ে গেছেন।’
আশুলিয়া বাজার, ঘোষবাগ, জিরাবো বাজার, বাংলাবাজার, নরসিংহপুর, পিয়ারপুর, নাইটিংগেল, জামগড়া, বগাবাড়ি, বাইপাল এলাকার শত শত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর মূল খরিদ্দার আশুলিয়া এলাকার সাড়ে তিনশ’ তৈরি পোশাক কারখানয় কর্মরত সাড়ে ৫ লাখ শ্রমিক। শ্রমিকেরা এসব ব্যাবসায়ীর কাছ থেকে মাসওয়ারি বাকিতে পণ্য কেনেন। অনির্দিষ্টকালের জন্য গার্মেন্টস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এসব ব্যবসায়ী তাদের ক্রেতা শ্রমিকদের মতোই পড়েছিল অনিশ্চয়তায়।
কেবল ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাই নয়, বাড়িওয়ালা, চা-দোকানদার, রিকশাশ্রমিক সবক্ষেত্রেই গার্মেন্টস খুলে দেওয়ায় অনিশ্চিয়তার মেঘ কেটে আনন্দের আভা দেখা গেছে। তবে এক সপ্তাহের বেশি শ্রমিক অসন্তোষ চলায় এই এক সপ্তাহের বেতন শ্রমিকরা পাবে কি না তা নিয়েও চরম আশঙ্কা দেখা গেছে।
শ্রমিকদের দাবি, মালিকরা যেন তাদের ওই সময়ের বেতন কর্তন না করেন। এক সপ্তাহের বেতন না পেলে অনেকেরই জীবন চালানো কঠিন হয়ে পড়বে বলে জানান তারা।
আশুলিয়ায় কর্তব্যরত ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জাকারিয়া বাংলানিউজকে বলেন, ‘আমরা আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার রেখেছি। তবে সকাল ৮টার আগেই শ্রমিকরা শান্তভাবে এখানকার সাড়ে ৩শ’ পোশাক কারখানায় যোগ দিয়েছেন। অনেকেই বাড়ি চলে যাওয়ায় কাজে যোগ দিতে না পারলেও শনিবারের মধ্যে সবাই কাজে যোগ দেবেন বলে মালিক ও প্রশাসন আশা করছে।’
শিল্প পুলিশের আশুলিয়া জোনের উপ পরিচালক ফয়েজুল কবীর বাংলানিউজকে বলেন, ‘বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে কারখানাগুলো খুলে দেওয়া হয়েছে। শ্রমিকরা ফিরে শান্তিপূর্ণভাবে কাজে যোগ দিয়েছেন। কোথাও কোনো সমস্যার খবর আমরা পাইনি।’
আশুলিয়া এলাকায় ‘পর্যাপ্ত’ সংখ্যক পুলিশ-র্যাবের টহলও মোতায়েন ছিল সারাদিন।
উল্লেখ্য, বুধবার শ্রমমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সঙ্গে বৈঠকে শিল্প মালিকদের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ নেতারা কারখানা খুলে দিতে সম্মত হন।
ওই বৈঠক শেষে মন্ত্রী সাংবাদিকদের জানান, বৃহস্পতিবার থেকে সব কারখানা খোলা থাকবে। মালিকরাও সব কারখানা খুলে দেওয়ার ব্যাপারে তাদের সম্মতি দিয়েছেন।’
বেতন বাড়ানোর দাবিতে শ্রমিক বিক্ষোভে গত ১১ জুন থেকে অস্থিরতার পর গত শনিবার আশুলিয়ার সব কারখানা বন্ধের ঘোষণা দেয় বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ। ফলে আশুলিয়ার প্রায় সাড়ে তিনশ’ পোশাক কারখানার সাড়ে ৪ লাখ থেকে ৫ লাখ শ্রমিক অনিশ্চয়তায় পড়ে।
মালিকপক্ষ চার দিন বন্ধ রাখলেও তার আগের চার কার্যদিবসেও বিক্ষোভ-সংঘর্ষের কারণে আশুলিয়ার পোশাক কারখানাগুলোতে কোনো কাজই হয়নি।
বাংলাদেশ সময়: ১২০০৪ ঘণ্টা, জুন, ২১, ২০১২
আরএম/ সম্পাদনা: জাকারিয়া মন্ডল, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর