 |
ঢাকা : মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত আবুল কালাম আজাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকারের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।
আদেশ পাওয়ার পরে যতো দ্রুত সম্ভব এ আদেশ কার্যকর করার জন্য ডিএমপি কমিশনারকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। গ্রেফতারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করার জন্যও বলা হয়েছে।
মঙ্গলবার ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান এটিএম ফজলে কবিরের নেতৃত্বে ৩ সদস্যের ট্রাইব্যুনাল এসব আদেশ দেন। অপর দুই বিচারক হলেন বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও শাহিনুর রহমান।
আবুল কালাম আজাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকার রাজধানীর উত্তরার ৭ নং সেক্টরের ৬নং সড়কের ৩৩নং বাড়িতে বসবাস করেন। তবে তদন্ত দলের কাছে তার অপর একটি ঠিকানাও রয়েছে। সেটি হচ্ছে রাজধানীর উত্তরখানের মাস্টারপাড়া কাজি বাড়ি।
আদালতের নির্দেশের পরে সাংবাদিকদের কাছে প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম বলেন, মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকারের ৫টি এনজিও তার নিজের স্বার্থে পরিচালিত হয়। প্রচুর অর্থবিত্তের মালিক ও প্রভাবশালী হওয়ায় তিনি এসবের জোরে সাক্ষীদের হুমকি দিচ্ছেন। এসব হুমকির বিষয়ে ফরিদপুরের কোতোয়ালি থানায় সাক্ষীরা জিডিও করেছেন। তদন্তের স্বার্থে তাকে গ্রেফতারের আদেশ দেওয়ার আবেদন জানানো হলে ট্রাইব্যুনাল ওই আদেশ দেন।
এর আগে সোমবার বাচ্চু রাজাকারের বিরুদ্ধে তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদন ডেপুটি রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে দ্বিতীয় ট্রাইব্যুনালে জমা দেওয়া হয়।
ওই দিনই শুনানি শেষে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির আদেশের জন্য মঙ্গলবার দিন ধার্য করেন চেয়ারম্যান এটিএম ফজলে কবিরের নেতৃত্বে ৩ সদস্যের ট্রাইব্যুনাল।
গত ২৫ মার্চ আবুল কালাম আজাদের বিচার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই আন্তর্জাতিক অপরাধ বিষয়ক দ্বিতীয় ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম শুরু হয়। ওই দিন তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদন ২ এপ্রিলের মধ্যে প্রদান করার আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। সেদিন ‘বাচ্চু রাজাকার’র বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির বিষয়ে আবেদন জানান প্রসিকিউশন।
সোমবার ট্রাইব্যুনালে বাচ্চু রাজাকারের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদনের কিছু অংশ পড়ে শোনান প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলী। তিনি বলেন, ‘আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের বেশ কিছু অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাচ্চু রাজাকার ফরিদপুরের বোয়ালমারী, সালথাসহ আরো বেশ কিছু এলাকায় হত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুণ্ঠণ, ধর্ষণ প্রভৃতি অপরাধ সংঘটিত করেছেন বলে আমাদের তদন্তে উঠে এসেছে। আরও তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।’
তিনি ৯টি গ্রাউন্ডে ‘বাচ্চু রাজাকার’র বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির আবেদন জানান।
তিনি ট্রাইব্যুনালে বলেন, `মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকার এখন খুবই প্রভাবশালী। তিনি ধর্মের নামে ব্যবসা ও ৫টি এনজিও স্থাপনের মাধ্যমে প্রচুর অর্থবিত্তের মালিক হয়েছেন। এসবের জোরে তিনি সাক্ষীদের হুমকি দিচ্ছেন।`
সৈয়দ হায়দার আলী বলেন, `ফরিদপুর জেলার বোয়ালমারী এলাকার রণজিৎ দেবনাথ তদন্ত কর্মকর্তার কাছে বাচ্চু রাজাকারের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন। এ কারণে বাচ্চু রাজাকারের সহযোগীরা তাকে হুমকি দিচ্ছে। এ ব্যাপারে রণজিৎ দেবনাথ স্থানীয় থানায় জিডিও করেছেন।`
তিনি দাবি করেন, `কিছুদিন আগে একই এলাকার মলয় চেয়ারম্যান নামের একজনকে হত্যা করেছে বাচ্চু রাজাকারের সহযোগীরা। এই মলয় চেয়ারম্যান ছিলেন একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ভিকটিম এবং এই মামলায় বাচ্চুর বিরুদ্ধে একজন সাক্ষী। তাকে হত্যা করায় আশেপাশের সাক্ষীরাও এখন ভীত-সন্ত্রস্ত। তারা সাক্ষ্য দিতে ভয় পাচ্ছেন।`
বাচ্চু রাজাকারকে গ্রেফতার করা হলে সাক্ষীদের নিরাপত্তা রক্ষিত হবে বলে উল্লেখ করে সৈয়দ হায়দার আলী বলেন, ‘এসব কারণে দ্রুত বাচ্চু রাজাকারকে গ্রেফতারের আদেশ দেওয়ার আবেদন জানাচ্ছি।’
এর আগে ২৫ মার্চের শুনানিতে সৈয়দ হায়দার আলী আরো বলেছিলেন, ‘ফরিদপুর শহরে ১২০০ বধ্যভূমিতে যে হাজার হাজার মানুষ শায়িত আছেন, তাদের হত্যার নির্দেশদাতা এবং নিজেও সরাসরি হত্যাকারী আবুল কালাম আজাদ। তিনি নিজে গুলি করে অসংখ্য মানুষ হত্যা করেছেন। হত্যা করে ফরিদপুর স্টেডিয়ামে মাটিচাপা দিয়েছেন, নদীতে ফেলে দিয়েছেন, শহরের বিভিন্ন স্থানে মাটিচাপা দিয়েছেন। তিনি বিভিন্ন স্থান থেকে নিজে লোকজনকে ধরে আনতেন আবার অন্যদের দিয়েও ধরিয়ে আনতেন।’
হায়দার বলেন, ‘তিনি জামায়াতের আরেক নেতা মুজাহিদের সঙ্গে যোগ দিয়ে এসব হত্যাকাণ্ড চালান।’
তিনি বলেন, `আবুল কালাম আজাদ সে সময় মাদ্রাসায় পড়তেন। আর তাই উর্দু ভাষায় তার দক্ষতা ছিল। তিনি পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে দেখা করে ওই এলাকায় স্বেচ্ছাসেবী রাজাকার বাহিনী গঠন করেন। স্টেডিয়াম ও সার্কিট হাউসে অবস্থানরত পাকবাহিনীর সঙ্গে যোগসূত্র গড়ে তোলেন।’
প্রসিকিউটর হায়দার আলী ওই দিনও ট্রাইব্যুনালে বলেন, ‘ফরিদপুর শহর, বোয়ালমারী, নগরকান্দাসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালাতেন ‘বাচ্চু রাজাকার’। মুক্তিকামী মানুষ, আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষদের ধরে এনে গুলি করতেন। ১৯৭১ সালের ২১ এপ্রিল তিনি ফরিদপুর পুলিশলাইনে অসংখ্য মানুষকে হত্যা করেন। ফরিদপুর জসীম উদ্দিন রোডে রাজাকার ক্যাম্প ও নির্যাতন সেল স্থাপন করেন।’
আবুল কালাম আজাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকারের বিরুদ্ধে ২০০৯ সালে করা দুটি মামলার নথি থেকেও জানা গেছে, ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার দাদপুর ইউনিয়নের নতিবদিয়া গ্রামের শোভা রানী বিশ্বাস একাত্তরে এই রাজাকারের কাছে সম্ভ্রম হারান। একই গ্রামের নগেন বিশ্বাসের স্ত্রী দেবী বিশ্বাসেরও সম্ভ্রমহানি হয় তার হাতে। আরও অভিযোগ রয়েছে, বাচ্চুর রাইফেলের গুলিতে মর্মান্তিকভাবে শহীদ হন ফরিদপুরের ফুলবাড়িয়ার চিত্তরঞ্জন দাস। স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে মামলা না করলেও ২০০৯ সালের ৩ মে বাচ্চু রাজাকার ও তার শ্যালক মোহাম্মদ কাজীসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে চিত্তরঞ্জন দাসের স্ত্রী নগরকান্দা উপজেলার ফুলবাড়িয়া গ্রামের জ্যোৎস্না রানী দাস মামলা দায়ের করেন। এজাহারেও হত্যাকাণ্ডের বিষয়টিও উল্লেখ রয়েছে।
বাংলাদেশ সময়: ১১৫৫ ঘণ্টা, এপ্রিল ০৩, ২০১২
জেএ/জেপি
সম্পাদনা: অশোকেশ রায়, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর; মাহমুদ মেনন, হেড অব নিউজ;
জুয়েল মাজহার, কনসালট্যান্ট এডিটর।