 |
যশোর : দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে দীর্ঘ হচ্ছে সাংবাদিকদের লাশের সারি। একজনের রক্তের দাগ শুকানোর আগেই পড়ছে আরেকজনের লাশ। এভাবে গত দেড় যুগে এ অঞ্চলে দুর্বৃত্তদের হাতে খুন হয়েছেন ১৫ জন সাংবাদিক।
এভাবে একের পর এক সাংবাদিকের লাশ পড়লেও এ পর্যন্ত সঠিক বিচার হয়নি কোনো খুনেরই। ফলে, বেপরোয়া হয়ে উঠেছে খুনিরা।
সর্বশেষ গত শুক্রবার রাতে খুনের শিকার হলেন যশোর থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক গ্রামের কাগজ’-এর কাশিপুর প্রতিনিধি জামাল উদ্দিন। সাংবাদিকদের লাশের মিছিলে যোগ হলো আরেকজন।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়- ১৯৯৪ সালে যশোরের দৈনিক স্ফূলিঙ্গ পত্রিকার সাংবাদিক আব্দুল গফফার চৌধুরী খুন হন। পরের বছর ১৯৯৫ সালে যশোরের রানার পত্রিকার অভয়নগরের সাংবাদিক ফারুক হোসেন খুন হন। ১৯৯৬ সালের ১২ জুন চুয়াডাঙ্গার দিনবদলের কাগজের সাংবাদিক বজলুর রহমানকে সন্ত্রাসীরা অপহরণ করে নিয়ে যায়। পরে আর তাঁকে পাওয়া যায়নি।
একই বছরের ১৯ জুন সাতক্ষীরায় খুন হন দৈনিক পত্রদূত সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা স ম আলাউদ্দিন। ১৯৯৮ সালের ১৬ জুলাই ঝিনাইদহের কালিগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম রেজা খুন হন। এর কয়েকদিন পর ৩০ আগস্ট খুন হন যশোরের রানার পত্রিকার সম্পাদক সাইফুল আলম মুকুল।
ঝিনাইদহের বীরদর্পণ পত্রিকার মীর ইলিয়াস হোসেন দিলীপ খুন হন ২০০০ সালের ১৫ জানুয়ারি। একই বছরের ১৬ জুলাই যশোরের অফিসে খুন হন দৈনিক জনকণ্ঠের বিশেষ প্রতিনিধি শামছুর রহমান। খুলনা জেলাধীন ডুমুরিয়া উপজেলার সাংবাদিক নহর আলি খুন হন ২০০১ সালের ২১ এপ্রিল। তিনি কাজ করতেন খুলনা থেকে প্রকাশিত দৈনিক অনির্বাণ পত্রিকায়।
২০০২ সালের ২ মার্চ খুলনা শহরে খুন হন খুলনার দৈনিক পূর্বাঞ্চল পত্রিকার সিনিয়র রিপোর্টার হারুন-অর-রশিদ ওরফে রশীদ খোকন। ২০০২ এর ৫ জুলাই ডুমুরিয়ার সাংবাদিক শুকুর হোসেন নিজ এলাকা থেকে অপহৃত হন। পরে তাঁকে আর পাওয়া যায়নি। ২০০৪ সালের ১৫ জানুয়ারি খুলনা প্রেসক্লাবের অদূরে বোমার আঘাতে খুনের শিকার হন দৈনিক সংবাদ ও নিউএজ পত্রিকার সিনিয়র রিপোর্টার, বিবিসির সংবাদদাতা মানিক সাহা। এর মাত্র ৫ মাস ১২ দিনের মাথায় ২৭ জুন খুলনার দৈনিক জন্মভূমি পত্রিকার সম্পাদক হুমায়ূন কবির বালুকে বোমা মেরে হত্যা করা হয় ।
বোমার আঘাতে খুলনা প্রেসক্লাব চত্বরে ২০০৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি গুরুতর আহত হন দৈনিক সংগ্রামের সিনিয়র রিপোর্টার শেখ বেলাল উদ্দিন। পাঁচ দিনেরও বেশি সময় মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে তিনি মারা যান ১১ ফেব্রুয়ারি। সর্বশেষ গত শুক্রবার রাতে নৃশংসভাবে খুন হলেন শার্শা কাশিপুরের সাংবাদিক জামাল উদ্দিন।
এ অঞ্চলের ১৫ সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের মধ্যে খুলনার সাংবাদিক হুমায়ূন কবির বালু ও হারুণ অর রশিদ হত্যা মামলায় খালাস পেয়েছে আসামিদের সবাই। শেখ বেলাল উদ্দিন হত্যা মামলার কার্যক্রম শেষ হলেও এ নিয়ে পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন তার পরিবার ও সাংবাদিকরা।
খুলনার আরেক সাংবাদিক মানিক সাহা ও সাতক্ষীরার স ম আলাউদ্দিন হত্যা মামলার বিচার শেষ হয়নি এক যুগেও। যশোরের রানার সম্পাদক সাইফুল আলম মুকুল হত্যাকা-ের প্রায় ১৪ বছর পার হলেও বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি আজও। মামলার অভিযোগপত্র নিয়েও রয়েছে যথেষ্ট বিতর্ক। জনকন্ঠের বিশেষ প্রতিনিধি শামছুর রহমান হত্যা মামলার বিচার প্রক্রিয়া থমকে আছে গত ৭ বছর ধরে।
এভাবে বেশিরভাগ সাংবাদিক হত্যা মামলাগুলো হারিয়ে যাচ্ছে প্রশাসনের দায়িত্বহীনতার কারণে। স্বাভাবিক কারণে সর্বশেষ সাংবাদিক হত্যার ঘটনার পর সাংবাদিক সমাজ রাজপথে নামলেও তাদের মধ্যে বিরাজ করছে একধরনের হতাশা।
বাংলাদেশ সময়: ২১৫১ ঘণ্টা, জুন ১৬ ২০১২
সম্পাদনা: প্রভাষ চৌধুরী, নিউজরুম এডিটর