 |
ডিজিটাল চ্যালেঞ্জর মুখে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যগুলো। বিশেষ করে প্রিন্ট মিডিয়াগুলো এখন এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ব্যস্ত। আর এর খাড়া প্রথমেই আসে কর্মী বাহিনীর ওপর। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক টাইমস তার টিকে থাকার সংগ্রামে কর্মী ছাঁটাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে যারা তাদের মেধা ও শ্রমে নিউইয়র্ক টাইমসকে অনেক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন তাদেরই আজ ঝরে পড়তে হচ্ছে ডিজিটাল চ্যালেঞ্জের মুখে।
অনলাইন সংবাদমাধ্যমের তোড়ে ক্রমেই অকেজো হয়ে পড়ছে এইসব বিশ্বখ্যাত সংবাদপত্রগুলো। যেগুলোকে নিজের টিকে থাকার সংগ্রামে আরও বেশি জোর দিতে হচ্ছে অনলাইন ভার্সনের দিকে।
তবে এনওয়াই টাইমস কাজটি করছে বেশ মানবিকতার সঙ্গে। পত্রিকাটি ব্যাপক কর্মচ্যূতির পথে না গিয়ে বেছে নিয়েছে বাইআউট পদ্ধতি। অর্থের বিনিময়ে পদ ছেড়ে দিয়ে যাচ্ছেন কর্মীরা। আবার কেউ কেউ বেছে নিচ্ছেন মান বাচাতে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ। আর এতে খুশি পত্রিকাটির সম্পাদক জিল আব্রামসন।
তিনি বলেছেন, অর্থের বিনিময়ে স্বেচ্ছায় পদ ছেড়ে যাওয়ার এই প্রক্রিয়ায় কর্মচ্যুতি বা অবসরের সংখ্যা ধারনার চেয়ে কম হয়েছে। তবে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ ও অর্থের বিনিময়ে পদ ছেড়ে যাওয়ার যে লক্ষ্য পত্রিকাটি নির্ধারণ করেছে তা এখনো পূরণ হয়নি। অন্তত ত্রিশজন কর্মীকে এই পথে সরিয়ে দিতে চাইছে নিউইয়র্ক টাইমস।
বৃহস্পতিবার নিউইয়র্ক টাইমস অনেকটা জোরপূর্বক ছাঁটাই করছে ২০ জন নিউজরুম কর্মীকে। এই দিন কিছুটা রূঢ় ভ’মিকা নিতে হচ্ছে সম্পাদক জিল আব্রামসনকে। তিনি এক অফিস মেমোতে বলেছেন বাইআউটের অফার কে নিলেন কে নিলেন না সেটা আর দেখার সুযোগ নেই। এই ছাঁটাই প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে আরও ২০ জনকে কাজ হারাতেই হচ্ছে।
গত তিন বছরে এই দ্বিতীয় বারের মতো কর্মী ছাঁটাই করছে টাইমস। ২০০৮ সালের গোড়ার দিক থেকে এপর্যন্ত ২০০ সংবাদকর্মীকে কর্মচ্যুত করেছে পত্রিকাটি। তবে একই ধরনের অন্য সংবাদপত্রগুলোর তুলনায় এই সংখ্যা কম।
দুই মাস ধরেই পত্রিকাটিতে চলছে নতুন ছাঁটাই প্রক্রিয়া। এরই মধ্যে বেশ কয়েকজন অত্যন্ত সিনিয়র সাংবাদিক পত্রিকাটি ছেড়ে চলে গেছেন। অফিস নোটে আব্রামসন লিখেছেন, উচ্চপদগুলোতে আরও কিছু পরিবর্তন আসছে। যাদের মধ্যে সহকারী ব্যবস্থাপনা সম্পাদক পর্যায়েরই রয়েছে তিনটি নাম। এরা হচ্ছেন লরেন্স ইংগ্রাসিয়া, ইয়ান ফিশার ও জ্যানেট এলডার।
সহকর্মীদের উদ্দেশ্যে লেখা এই অফিস নোটে আব্রামসন লিখেছেন, আমরা স্বেচ্ছায় অবসর ও কর্মচ্যুতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। তবে শেষ পর্যন্ত কর্মচ্যুতির সংখ্যা হয়তো যতটা ধারনা করা হয়েছিলো তার চেয়ে কম হবে। স্বেচ্ছায় কাজ ছেড়ে দেওয়ার কারণেই এমন বেদনাদায়ক ঘটনা কম ঘটলো।
আব্রামসন বলেন, ডিজিটালের যুগে নতুন করে তৈরি হওয়ার চ্যালেঞ্জ নিয়ে আমাদের জন্য নতুন পদের জন্য যোগ্য হয়ে উঠতে হবে। পরিবর্তনের এই প্রক্রিয়া ও তার মধ্যদিয়ে আমাদের যাত্রা আরো আগে শুরু হয়েছে। যেখানে প্রিন্ট ও ডিজিটাল পদ্ধতির মধ্যে সমন্বয়, রিপোর্টিংয়ের পরিধি বাড়ানো, খবর পরিবেশনার ধরন আরো গভীর ও গ্রহণযোগ্য করা আর সর্বোপরি সাংবাদিকতা পেশাকে আরো ইর্ষণীয় জায়গায় নিয়ে যেতে আরও অভিনব পদ্ধতির প্রয়োগ করতে হচ্ছে।
নিউইয়র্ক টাইমসেই কর্মীরা আগে যা করতেন এখন আর তা করছেন না। অনেকেরই কাজের ধরন পাল্টে গেছে বা যাচ্ছে। যেমন রিক বার্ক এখন থেকে ভিডিওর ওপর বেশি কাজ করবেন কারণ এটিই হয়ে উঠছে নতুন ধারার রিপোর্টিংয়ে সবচেয়ে বড় অংশ। গ্লেন ক্রামন প্রযুক্তির খবর প্রকাশের মাত্রা বাড়িয়ে দেবেন কারণ এটিই বিশ্বের গতিপথ পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে।
আব্রামসন বলেন, আমাদের এখন সেই ধরনের কর্মী বা নেতা প্রয়োজন যারা নিউজরুম পরিচালনার অনেকদিক বা অনেককিছুই এক হাতে সামলাতে পারবেন।
তিনি জানান, দুই সপ্তাহের মধ্যেই নতুন সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদকের নাম ঘোষণা করা হবে। জ্যাসন স্টলম্যান হতে যাচ্ছেন পত্রিকাটির নতুন স্পোর্টস এডিটর। ল্যারি ইংগ্রাসিয়া সহকারী ব্যবস্থাপনা সম্পাদক হিসেবে নতুন নতুন উদ্যোগগুলোর বাস্তবায়ন করবেন। আয়বৃদ্ধির কাজও তাকেই দেখতে হবে। ল্যারির তত্ত্বাবধানে এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক খবর পরিবেশনের মাত্রা বাড়ানোর কাজ শুরু হয়েছে।
জ্যানেট এলডার নিউজরুমের প্রশাসন দেখবেন। এর অংশ হিসেবে বাজেট, কর্মসুবিধা, পেশাগত উন্নয়নের বিষয়গুলো নিশ্চিত করবেন।
ইয়ান ফিশার কনটেন্ট অপারেশনের দায়িত্বে থাকবেন। তিনি ডিজিটাল ও প্রিন্ট মিডিয়ার কাজগুলো সমন্বয় করবেন। সংবাদসংগ্রহে মোবাইল ফোন ও অন্যান্য প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহারগুলো দেখবেন।
এই নোটে সম্পাদক যারা পত্রিকাটি ছেড়ে গেলেন তাদের দীর্ঘ অবদানের কথাও স্মরণ করেন এবং তাদের প্রতি অপরিসীম কৃতজ্ঞতার কথা উল্লেখ করেন আব্রামসন। তিনি বলেন, নিউজরুম কয়েকজন দীর্ঘদিনের কর্মীকে হারিয়েছে যারা তাদের নিজেদের সবটুকু যোগ্যতা ও দায়িত্ববোধকে বিলিয়ে দিয়ে কাজ করে গেছেন।
এদের মধ্যে জন গেডেসের কথা উল্লেখ করে আব্রামসন বলেন, হারিকেনের আঘাত থেকে বিদ্যুৎহীনতার মতো সকল সঙ্কটময় পরিস্থিতিতেই এই যোগ্য হাত আমাদের জন্য কাজ করেছে। টিমকে হাসিখুশিতে ডুবিয়ে রাখা এই কর্মীর অনুপস্থিতি আমরা অনুভব করবো। জন ল্যান্ডম্যানও এরই মধ্যে ছেড়ে গেছেন নিউইয়র্ক টাইমস। জিল আব্রামসন বলেন, তিনি ছিলেন সেরা সমন্বয়ক। বিল স্কিমিড নিউজরুম পরিকল্পনায় ছিলেন অসাধারণ। আরও ছেড়ে যাচ্ছেন জিম রবার্টস, জো সেক্সটন।
যারা চলে গেছেন তাদের দায়িত্ব বাটোয়ারা হয়ে গেছে অন্যদের মাঝে। আব্রামসন বলেন, এর মধ্য দিয়ে আমরা একটি নতুন অধ্যায় শুরু করেছি। এখন আমরা আমাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বেশি সচেতন এবং মানোন্নয়নের ব্যাপারে আরো বেশি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। আসুন আমরা কোনো প্রশ্ন বা সমালোচনার পথ না মারিয়ে নতুন জগতের পথে পা বাড়াই।
বাংলাদেশ সময় ০০০৫ ঘণ্টা, জানুয়ারি ৩১, ২০১৩
এমএমকে