 |
কক্সবাজার: কক্সবাজারের উপকূলের মানুষ এখনও অরক্ষিত রয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেন তাদের নিত্যসঙ্গী।
পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্রের অভাব, অধিকাংশ বেড়িবাঁধ বিলীন, ঝুঁকিপূর্ণ ভাঙন, বেড়িবাঁধের অভাবসহ নানা কারণে উপকূলীয় এলাকার মানুষ চরম ঝুঁকিতে বসবাস করছে।
ভয়াল ২৯ এপ্রিলের ২১ বছর পেরিয়েও উদ্বেগ উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন উপকূলের ১৫ লক্ষাধিক মানুষ।
জানা যায়, ১৯৯১ সালের এই দিনে ‘ম্যারি এন’ নামে ভয়াবহ এক ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছিল বাংলাদেশের উপকূলে। উপকূলের মানুষ এখনও ভুলতে পারেনি দুঃসহ সেই রাতের স্মৃতি।
১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল স্বজন হারানো আমেনা খাতুন বাংলানিউজকে জানান, স্বজন হারানোর বেদনায় এখনও তিনি কাদেন। সাগরে লঘুচাপ বা কোন নিম্নচাপের খবর শুনলেই তারা আঁৎকে ওঠেন। তাদের ভয় আবার যদি ২৯ এপ্রিলের মতো একটি ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে।
তাদের এই উদ্বেগের কারণ, ১৯৯১ সালের মহাদুর্যোগের পরও উপকূলীয় এলাকার লোকজনের নিরাপত্তা এখনও উপেক্ষিত।
জেলা প্রশাসনের সূত্র বাংলানিউজকে জানান, কক্সবাজারের উপকূলের ১৫ লাখ মানুষের জন্য ৫৩৪টি আশ্রয় কেন্দ্র রয়েছে। যার ধারণ ক্ষমতা ৫ লাখ ১৫ হাজার ৬৬৩ জন। এর মধ্যে চকরিয়ায় ৮১টি আশ্রয় কেন্দ্রের ধারণ ক্ষমতা ১ লাখ ৩শ জন, কক্সবাজার সদরে ৫৯টি আশ্রয় কেন্দ্রে ৪৫ হাজার ১শ জন, রামুতে ৩১টি আশ্রয় কেন্দ্রে ১৮ হাজার ৫শ ১১জন, কুতুবদিয়ায় ৯১টি আশ্রয় কেন্দ্রে ৭০ হাজার ৩শ ৫০ জন, মহেশখালীতে ১শ ২৩টি আশ্রয় কেন্দ্রে ৭৪ হাজার ২শ ৫০ জন, টেকনাফে ৪০টি আশ্রয় কেন্দ্রে ৪৪ হাজার ২২জন, উখিয়া ৪১টি আশ্রয় কেন্দ্রে ৪১ হাজার ও পেকুয়া উপজেলায় ৬৮টি আশ্রয় কেন্দ্রে ১ লাখ ২২ হাজার ১ শ ৫০ জনের ধারণ ক্ষমতা রয়েছে। এছাড়া জেলায় ১শ ৭৭টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দুর্যোগকালীন আশ্রয় কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। যার ধারণ ক্ষমতা ১ লাখ ৯৭ হাজার ৩শ জন।
পানি উন্নয়ন বোর্ড কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মাঈন উদ্দিন বাংলানিউজকে জানান, কক্সবাজার উপকূলীয় এলাকায় ৫শ ৯৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে জলোচ্ছ্বাসে ১০ কিলোমিটার এবং বর্ষকালে প্রায় ৫০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
বর্তমানে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের আওতায় উপকূলীয় এলাকার ২৪ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণ কাজ চলছে। এছাড়াও ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য ফান্ডের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, মহেশখালী, টেকনাফ, কক্সবাজার সদর, কুতুবদিয়া ও পেকুয়া উপজেলার সাগরের কাছাকাছি এলাকার বেড়িবাঁধও চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ওখানে নিয়মিত জোয়ার-ভাটা হয়। প্রতিবছর সাগরের করাল গ্রাসে হারিয়ে যাচ্ছে অনেক গ্রাম।
মহেশখালীর ধলঘাটা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আহসান উল্লাহ বাচ্চু বাংলানিউজকে বলেন, ‘এই এলাকায় বেড়িবাঁধ বিলীন ও ভাঙনের ফলে মানুষ ঝুঁকিতে বসবাস করছে। যে কোনো মুহূর্তে এলাকায় পানি ঢুকতে পারে। এ আশংকায় পুরো ইউনিয়নবাসী এক প্রকার আতংকে আছে। মানুষের জানমালের নিরাপত্তার স্বার্থে সরকার দ্রুততার সঙ্গে জরুরি ভিত্তিতে এখানে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করুক এটা সকলের দাবি বলে তিনি জানান।
টেকনাফ সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নুরুল আলম বাংলানিউজকে জানান, নাফনদীর বেড়িবাঁধে প্রায় ১৫ কিলোমিটারের বিভিন্ন স্থানে জরাজীর্ণ হয়ে পড়লেও মূলত ৭০-৮০ ফুট ও ৪০-৫০ ফুটের দু’টি ভাঙা অংশ দিয়ে জোয়ারের পানি ঢুকে প্রতিদিন ১৯টি গ্রাম প্লাবিত হচ্ছে।
সাবরাং ইউনিয়নের নয়াপাড়া, চৌধুরীপাড়া, মগপাড়া, ঝিনা পাড়া, আছারবনিয়া, শাহপরীর দ্বীপের মাঝার পাড়া, দক্ষিণ পাড়া, ঘোলা পাড়া, মিস্ত্রি পাড়া, টেকনাফ সদর ইউনিয়নের নাজিরপাড়া ও মৌলভীপাড়ার প্রায় আটশতাধিক ঘরবাড়ি ইতোমধ্যে হাঁটু সমান পানিতে ভাসছে। হুমকির মুখে পড়েছে আরও একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দু’টি মসজিদ, একটি মাদ্রাসা ও কয়েকটি শুঁটকির পল্লী।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক জয়নুল বারী বাংলানিউজকে জানান, কক্সবাজার উপকূলে দুর্যোগ মোকাবেলার জন্য প্রস্তুতি আগের তুলনায় অনেক ভালো আছে এখন। দুর্যোগ মোকাবেলায় সরকারি বিভিন্ন কার্যক্রমের অব্যাহত রয়েছে। এছাড়াও প্রতিটি অঞ্চলে দুর্যোগ মোকাবেলায় পর্যাপ্ত স্বেচ্ছাসেবকের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
তিনি বাংলানিউজকে জানান, বর্তমানে জেলার উপকূলীয় অঞ্চলে জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষার জন্য বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও মেরামতের কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে। এ বছর আট কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণ হয়েছে। আরও ২২ কিলোমিটার নির্মাণের কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এছাড়াও এবছর ১৩টি আশ্রয় কেন্দ্র অনুমোদন হয়েছে।
এগুলোর নির্মাণ কাজ শিগগিরই শুরু হবে বলে তিনি জানান।
বাংলাদেশ সময়: ১৩৫০ ঘণ্টা, এপ্রিল ২৯, ২০১২
প্রতিবেদন: নুপা আলম/সম্পাদনা: তানিয়া আফরিন, নিউজরুম এডিটর