‘পাত্তা পাত্তা, বুতা বুতা’, ‘কাব কি বিছরে’ আর ‘জিন্দেগি মে তো সাভি`-র মতো অজস্র জনপ্রিয় গান গেয়ে কণ্ঠের জাদুতে যিনি অর্ধেক শতাব্দীকাল বিশ্ব মাতিয়েছেন সেই কিংবদন্তির গজলসম্রাট মেহেদি হাসান পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে গেছেন। দুনিয়ামশহুর সেই কিন্নর কণ্ঠ আজ থেমে গেছে চিরতরে। আর সেই সঙ্গে যেনবা থেমে গেছে কোটি শ্রোতার হৃদয়ের স্পন্দন!
করাচির আগা খান হাসপাতালে ১৩ জুন বুধবার বেলা ১২টায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন গজলসম্রাট মেহেদি হাসান । শ্বাস-প্রশ্বাস জনিত সমস্যার কারণে দীর্ঘদিন ধরেই অসুস্থ ছিলেন। প্রায় বছর খানেক ধরে অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে হার মেনে মৃত্যুকে সঙ্গী করলেন এই গজলসম্রাট।
৮৪ বছর বয়সী ভুবনজয়ী এই মহান গজলশিল্পী গত ১২টি বছর ধরেই ভুগছিলেন ফুসফুসের সমস্যায়। তার ছেলে আরিফ খান জানান, এ বছরই তাঁর অবস্থা উত্তরোত্তর খারাপ হতে থাকে। গত মাসে তাকে হাসপাতাল থেকে বাড়ি নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু হঠাৎই তার অসুস্থতা আবারও বেড়ে গেলে তাকে ১২ জুন মঙ্গলবার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর একদিন পরেই তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন।
মেহেদি হাসানের জন্ম ১৯২৭ সালে ১৮ জুলাই ভারতের রাজস্থান রাজ্যের ঝুনঝুন জেলার লুনা গ্রামে ১৯২৭ সালে। বাবা উস্তাদ আজিম খান ও চাচা উস্তাদ ইসমাইল খান ছিলেন ধ্রুপদী গায়ক। তাদের কাছ থেকেই তালিম নেন মেহেদি হাসান। স্টেজে পারফর্ম করা শুরু করেন তরুণ বয়সেই। প্রথম কনসার্টে ভাইয়ের সঙ্গে পারফর্ম করেছেন পাঞ্জাবের ফাজিলকা বুংলায়(Fazilka Bungla)। ভারত ভাগ হলে ২০ বছর বয়সে মেহেদি হাসান তার পরিবারের সঙ্গে পাকিস্তানে পাড়ি জমান। এরপর তার পরিবার আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল হয়ে পড়লে তিনি মোটরসাইকেলের গ্যারেজে কাজ করেছেন বেশ কিছুদিন। তার ভাগ্যের চাকাটা ঘুরে যায় ১৯৫৭ সালে রেডিও পাকিস্তানে গান গাওয়ার সুযোগ পেয়ে। সেই থেকে গানের জগতে তার রাজসিক পথ চলা শুরু। উস্তাদ বরকত আলী খান, বেগম আখতার ও মুক্তার বেগমের সহযোগিতায় তিনি গজল জগতে নিজের প্রতিভার রোশনাই ছড়াতে শুরু করেন। গানের পাশাপাশি উর্দু কবিতার প্রতিও ছিল তাঁর দুর্মর আকর্ষণ। তবে সর্বসেরা গজলগায়ক হিসেবেই তার পরিচিতি বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। ক্রমশ গজল আর মেহেদি হাসান--এদুটি হয়ে ওঠে পরস্পরের সমার্থক।
দীর্ঘ সঙ্গীতজীবনে মেহেদী হাসান অসংখ্যবার বিরল সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। জেনারেল আইয়ুব খান ‘তমগা-ই-ইমতিয়াজ’, জেনারেল জিয়াউল হক ‘দ্য প্রাইড অফ পারফর্মেন্স’ ও জেনারেল পারভেজ মোশাররফ তাকে ‘হিলাল-ই-ইমতিয়াজ’ উপাধিতে ভূষিত করেন। এছাড়াও ১৯৭৯ সালে পাকিস্তানের নিগার ফিল্ম ও গ্রাজুয়েট অ্যাওয়ার্ড থেকে ‘সায়গল অ্যাওয়ার্ড’, ১৯৮৩ সালে নেপালে তাঁকে গুর্খা দক্ষিণাবাহু অ্যাওয়ার্ড দেয়া হয়। উপমহাদেশের বাইরে থেকেও পেয়েছেন সম্মাননা। ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে সফলততম এ গজলগুরু পাকিস্তানে ‘শাহেনশাহ-ই-গজল’ খেতাবে ভূষিত হয়েছেন।
পাকিস্তানে বসবাস করলেও জন্মস্থান ভারতের প্রতি ছিল তার গভীর অনুরাগ। সর্বশেষ তিনি ভারতে এসেছিলেন ২০০০ সালে। অসুস্থতার পর ভারতে যাওয়ার জন্যে আকুল হয়ে ওঠেন। ২০১০ সালে তিনি চিকিৎসার জন্য ভারত আসার ইচ্ছে প্রকাশ করেন। ভারতে এসে লতা মুঙ্গেশকর, দিলীপ কুমার ও অমিতাভ বচ্চনের সাথে দেখা করতে চান বলে নিজের ইচ্ছের কথাও জানিয়েছিলেন। কিন্তু বিধি বাম! মুম্বাইতে বোমা বিস্ফোরণের কারণে তার যাত্রা বাতিল হয়ে যায়। সে আশা অপূর্ণ রেখেই তাকে অবশেষে পৃথিবী মায়া ছেড়ে চলে যেতে হয়।
বাংলাদেশেও গজলসম্রাট মেহেদি হাসানের আছেন লাখো ভক্ত-অনুরাগী। তাদের সেই অনুরাগের ছোঁয়া গভীরভাবে উপলব্ধি করতেন। তাঁর ``গোল্ডেন ভয়েসে`` তিনি বাংলাতেও বেশ কয়েকটি গান গেয়েছেন।
সুদীর্ঘ সঙ্গীতজীবনে মেহেদি হাসানের গাওয়া গজলের বহু অ্যালবাম বেরিয়েছে যা গজলের ইতিহাসে সেরা রত্নভাণ্ডার হিসেবে আদৃত ও বিবেচিত।এসবের মধ্যে দুনিয়াজোড়া তুমুল জনপ্রিয় কয়েকটি অ্যালবাম হচ্ছে: ‘নাজরানা’, ‘আন্দাজ-ই-মস্তানা’, ‘গালিব গজলস’, ‘সারহাদে’, ‘সাদা-ই-ইশক’, ‘নকশ-ই-ফারহাদে ’ ।
আর জনপ্রিয় গজল গানগুলোর মধ্যে আছে ‘আজ তক ইয়াদ হে ও পেয়ার কা মানজার’ , ‘আখোঁসে মিলি আঁখে’ , ‘আপকি আঁখো কে’, ‘ আবকে হাম বিছরে তো সায়াদ কাভি খোয়াবো মে মিলে’, ‘ইক বার চালে আও’, ‘দিল কি বাত লাবো পার লেকার’, ‘দিলমে তুফান চুপকে‘ , ‘জাব ভি আতিহে তেরি ইয়াদ কাভি সাম কে বাদ’ , কিয়া হে পেয়ার জিসে হামনে জিন্দেগি কি তারাফ’, ‘কিউ হামসে খাফা হো জায়ে এ জানে তামান্না’, ‘রাফতা রাফতা ও মেরি হাসতি কা সামান হো গ্যয়া‘, ‘ তেরে মেরে পেয়ার কি ’, ‘তানহা থি অর হামেশা তানহা হে জিন্দেগি’ ও `তু মেরে জিন্দেগি হে’ সহ তার মুক্তোঝরা কণ্ঠে গাওয়া আরও অনেক অনেক গান। সেসব গান আজ ভেসে বেড়াচ্ছে-বেড়াবে পৃথিবীর ইথারে ইথারে; কিন্তু নেই সেই গানের পাখি। সে উড়ে চলে গেছে দূরে--- আকাশের ওপারে আকাশে!
বাংলাদেশ সময়, ১৫২০, জুন ১৩, ২০১২
সম্পাদনা: জুয়েল মাজহার, কনসালট্যান্ট এডিটর
Jewel_mazhar@yahoo.com