চট্টগ্রাম: রমজান ও ঈদকে সামনে রেখে ভেজাল ও মানহীন ভোগ্যপণ্য উৎপাদনের হিড়িক পড়েছে চট্টগ্রাম মহানগর ও আশপাশের বিভিন্ন উপজেলায়। ইতিমধ্যে বেশ কিছু কারখানা ও বিক্রয়কেন্দ্রে ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযান পরিচালিত হলেও এর বাইরে শত শত কারখানা ধরা ছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে।
ভেজাল, নকল, মানহীন অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বাংলা সেমাই, লাচ্ছা সেমাই, নুডলস, ঘি, হলুদ, মরিচ, মসলা, বেসন, আটা, ময়দা, ভোজ্যতেল, লবণ, পাউরুটি, কেক ইত্যাদির ব্যাপক উৎপাদনের পাশাপাশি সাবান, পারফিউম, কসমেটিকস, খনিজ পানি, পাকা কলা, ফলমূল, মাছ, শুঁটকিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক পণ্যে জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর নানা উপকরণ ও রাসায়নিক মেশানো হচ্ছে। মেয়াদোত্তীর্ণ কাঁচামাল, ফরমালিন-কার্বাইড, সূতা রাঙানোর বিষাক্ত রং, ভেজাল পাম তেল, সেন্ট, পচা ডিম ইত্যাদি মেশানো হচ্ছে খাদ্যপণ্যে।
বাংলানিউজের অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেশের বৃহত্তম ভোগ্যপণ্যের পাইকারি বাজার চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের আশপাশের কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে বেশ কিছু নকল ও নিম্নমানের বাংলা ও লাচ্ছা সেমাই, নুডলস, মসলার গুঁড়ো, লবণ ও ঘি উৎপাদনের কারখানা গড়ে উঠেছে। রাজাখালী, বাকলিয়া, চরচাক্তাই, ডিসি রোড, খাতুনগঞ্জ, আসাদগঞ্জ, কোরবানিগঞ্জ, খলিফাপট্টি, বউবাজার এলাকায় রয়েছে কিছু সেমাই-মসলা ও ঘি তৈরির ভ্রাম্যমাণ কারখানা। পশ্চিমমাদারবাড়ি ও বহদ্দারহাট এলাকায় কিছু লাচ্ছা সেমাই কারখানা গড়ে উঠেছে। ভেজাল কেক ও পাউরুটি কারখানা ছড়িয়ে আছে নগরজুড়ে।
রমজান ও ঈদে সেমাইর পাশাপাশি হরেকরকম ইফতার ও নাশতা তৈরির জন্য ঘিয়ের চাহিদা বেড়ে যায়। এ ছাড়া বছরব্যাপী বিয়ে, মেজবানসহ নানা আয়োজনেও পণ্যটির চাহিদা থাকে। এ চাহিদাকে পুঁজি করে নগরীর বায়েজিদের বিসিক, রাজাখালী, হামজারবাগ, মাদারবাড়ি, চকবাজারসহ বাড়বকুণ্ড, দোহাজারী, পটিয়া, আনোয়ারা, ফটিকছড়ি, রাউজান গড়ে উঠেছে অর্ধশতাধিক ঘি কারখানা। এ ছাড়া অলিগলিতে ছড়িয়ে আছে বেশকিছু ‘ভ্রাম্যমাণ’ ঘি কারখানা। ডানোফা, এ সেভেন, এপি ওয়ান, রাজা, মীম, প্যারিস, গ্রিন মাউন্ট, কুইন কাউ, হোয়াইট কাউ, বিটা, টাটকা-১, মদিনা, ত্রিস্টার, রাজবাড়ি, আসল বাঘাবাড়ি, গোল্ডেন, ডায়মন্ডসহ হাজারো ঘিয়ে ভরে গেছে বাজার।
ঘি উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত এক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করে বলেন, বাঘাবাড়ি ঘিয়ের সুনামকে পুঁজি করে ২ ডজনেরও বেশি নকল ঘি বাজারে রয়েছে। এ ছাড়া আসল ব্রান্ডগুলোর কাছাকাছি নামে শতাধিক ঘি এখন বাজারে পাওয়া যাবে। লেবেল, কৌটা, সুগন্ধ দেখে সাধারণ মানুষের আসল-নকল পার্থক্য বোঝা কঠিন। অন্যদিকে খোলা ঘিয়ের বাজারে একচ্ছত্র আধিপত্য নকল ঘি উৎপাদকদের।
তিনি বলেন, আসল ঘি দুধ থেকে তৈরি হলেও ভেজাল ঘি তৈরি হয় ছাকা (ছানা বা ক্রিমের বর্জ্য), ভেজাল পাম অয়েল ও ঘিয়ের খুশবু মিশিয়ে। তাই এক কেজি ভালো ভোজ্য তেলের মূল্য যেখানে ১৪০ টাকা। সেখানে ১ কেজি ভেজাল ঘি পাইকারি বাজারে বিক্রি হয় ১৩০ টাকায়। এছাড়া কিছু ভেজাল ঘি কোম্পানি বাবুর্চিদের মাসোহারা দিয়ে রমরমা বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। ৩০০ টাকার ঘিয়ের কৌটায় একটি টোকেন থাকে যা কোম্পানির প্রতিনিধির হাতে দিলে বাবুর্চিকে ১০০ টাকা দেওয়া হয়।
কিছু কিছু মৌসুমী কারখানা কয়েকমাস পরপরই স্থান পরিবর্তন করে প্রশাসনের চোখে ধুলো দেওয়ার উদ্দেশ্যে। অনেক কারখানায় দিনের বেলা বাইর থেকে তালা ঝুলিয়ে ভেতরে শ্রমিকেরা পণ্য উৎপাদন করে। কোনো কোনো কারখানা দিনের বেলা বন্ধ থাকে, শুধু রাতের বেলা বেশি শ্রমিক লাগিয়ে কাজ চালানো হয়।
এসব কারখানার চকচকে মোড়কজাত পণ্য দেখে সাধারণ মানুষের বোঝার উপায় থাকে না আসল না নকল। বেশিরভাগ মোড়কে বিএসটিআই’র লোগো (মনোগ্রাম) ও পণ্যের গুণগানসমৃদ্ধ স্লোগান ছাপিয়ে প্রতারণা করা হচ্ছে ক্রেতাদের।
রাজাখালী এলাকায় দেখা গেছে, রমজান শুরুর কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই বাংলা সেমাই উৎপাদনের ধুম পড়েছে। বাইরে তালা ঝুলিয়ে আলো-আঁধারি পরিবেশে উৎপাদিত হচ্ছে সেমাই। শ্রমিকদের ঘাম অবাধে মিশে যাচ্ছে সেমাইর খামিতে (কাঁচামাল)। ডায়াসের (যন্ত্র) ঢালার সময় যেসব খামি মেঝেতে পড়ে যাচ্ছে সেসব পুনরায় ডায়াসে দেওয়া হচ্ছে। ভর্তি ক ছোট ছোট বাঁশের কঞ্চিতে কাঁচা সেমাই সাজিয়ে শুকানো হচ্ছে বদ্ধ ঘরে মাচা বানিয়ে। কিছু কারখানায় সেমাই লাল করা হচ্ছে বিস্কুট তৈরির চুল্লিতে। পরে বিভিন্ন ব্রান্ডের লেবেল সেঁটে টুকরি ভরে বাজারজাত করা হচ্ছে।
খাতুনগঞ্জে পাইকারি বাজারে প্রতি টুকরি (৩৫ কেজি) বাংলা সেমাই বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ১৫০ টাকা। মেসার্স দত্ত সন্সের ঝন্টু দত্ত বাংলানিউজকে বলেন, গত বছরের চেয়ে ‘ডাবল আম’, ‘তিন আম’, ‘৪৭’ ব্রান্ডের প্রতি টুকরিতে সেমাইর দাম বেড়েছে ১০০ টাকা।
ইতিমধ্যে রমজানকে সামনে রেখে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জয়নুল আবেদিনের নেতৃত্বে একটি এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক জুবায়ের আহমদের নেতৃত্বে অপর একটি ভ্রাম্যমাণ আদালত নগরীতে বেশ কিছু অভিযান পরিচালনা করেছেন। পাশাপাশি ১৫ জুলাই থেকে জেলা পরিষদের ৫ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রের নেতৃত্বে সপ্তাহে ২দিন বাজার মনিটরিং কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
২ জুলাই রাজাখালীর মেসার্স আবদুল মন্নান সেমাই ফ্যাক্টরির মালিককে নোংরা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে, মেয়াদোত্তীর্ণ ময়দা দিয়ে সেমাই তৈরির অপরাধে ও মেসার্স পূর্বাণী সল্ট ক্রাশিং ইন্ডাস্ট্রিকে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে আয়োডিন ছাড়া লবণ তৈরি ও ‘আয়োডিনযুক্ত হাসান সুপার সল্ট’ নামের মোড়কে ভরে বাজারজাত করার অপরাধে, ৯ জুলাই বিএসটিআই’র অনুমতিপত্র (লাইসেন্স) ছাড়া অস্বাস্থ্যকর, নোংরা পরিবেশে ‘প্রগতি’ ব্রান্ডের লাচ্ছা সেমাই ও ‘ফুডম্যাক্স’ ব্রান্ডের চানাচুর উৎপাদন ও বাজারজাত করায় পশ্চিম মাদারবাড়ির যুগী চাঁদ মসজিদ এলাকার মেসার্স প্রগতি বেকারি অ্যান্ড কনফেকশনারি ও মাস্টার বেকারি অ্যান্ড কনফেকশনারিকে, ১৪ জুলাই পচা ডিম দিয়ে কেক তৈরি ও পরিবেশ ছাড়পত্র না থাকায় চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার ঝর্ণা বেকারি, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে বেকারি পণ্য উৎপাদন ও বিক্রির জন্য আল হাসান বেকারি ও সুগন্ধা বেকারিকে, ১৬ জুলাই ভেজাল ঘি, সসসহ নানা খাদ্যপণ্য তৈরির অপরাধে গুলজার ফুড প্রোডাক্টসকে, ১৭ জুলাই পণ্যের গায়ে ওজন লেখা না থাকা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্য বিক্রির দায়ে কোতোয়ালির মিষ্টিমেলাকে, ১৯ জুলাই পচা আঙুর, মূল্য জালিয়াতি, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের জন্য মীনাবাজারকে জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।
কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি নাজের হোসাইন বাংলানিউজকে জানান, রমজান ও ঈদকে সামনে রেখে সারা দেশের মতো চট্টগ্রামেও ভেজাল খাদ্যপণ্য উৎপাদন অব্যাহত রয়েছে। সেমাই, ঘি, মসলাসহ সব ধরনের ভোগ্যপণ্যে ভেজাল, নকল, মানহীন, জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করে ফলমূল-মাছ-সবজি সংরক্ষণ ও পাকানো, ওজন ও মূল্যে কারচুপি, পচা-বাসি খাবার বিক্রি, মহিষের মাংসকে গরুর মাংস বলে চালিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা নিত্যনৈমত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। নানা ভাবে ক্রেতাদের তথা ভোক্তাদের ঠকানো হচ্ছে, প্রতারিত করা হচ্ছে।
উত্তরণের উপায় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা লক্ষ করছি এক্ষেত্রে প্রশাসনিক মারপ্যাঁচ রয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলো লোকবল নেই, যন্ত্রপাতি ও পরীক্ষার উপকরণ সংকট, যানবাহন সংকট, রুটিন কাজে সময় ব্যয়সহ নানা অজুহাতে জনস্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে উদাসীন রয়েছে। এত বড় একটি মহানগরে হাতেগোনা কিছু অভিযান দিয়ে ভেজাল, মানহীন, নকল পণ্য উৎপাদন বন্ধ করা যাবে না। এরজন্য জেলা প্রশাসন, বিএসটিআই, সিটি কর্পোরেশন, পরিবেশ অধিদপ্তর, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, র্যাব, পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত ও নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রাখা দরকার।
বাংলাদেশ সময়: ১৮৫৫ ঘণ্টা, জুলাই ২০, ২০১২
এআরএম/সম্পাদনা: আহমেদ জুয়েল, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর