 |
০১.
লালনের গান শুনছি। লক্ষ করছি জগতের আর অতিজগতের মধ্যে তাঁর সাবলীল অবস্থানের বিস্ময়কর প্রতিচ্ছবি। ধর্ম বলি, সাধনা বলি অথবা আত্মানুসন্ধান সব কিছুই যেন একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যবিন্দুর অভিমুখে অগ্রসরমান। যত দিন যাচ্ছে ক্রমে ক্রমে এই দেখতে পাচ্ছি যে, সেই লক্ষ্যবিন্দুতে পৌঁছাতে পারলেই যেন তার সর্বশ্রেষ্ঠ পাওয়াটি হয়। এটিকেই কেউ মোক্ষ বলছেন, কেউ বলছেন নির্বাণ।
মাঝে, বেশ কিছুদিন পূর্বে, গ্রামের একদল গৃহী বৈষ্ণব সাধকদের সাপ্তাহিক আরাধনা অনুষ্ঠানে ঈশ্বর আর স্বর্গ-নরক সম্মন্ধে তাঁদের বিশ্বাসে সংক্রমিত হয়ে আমারও মনে হয়েছিলো স্বর্গ বোধ করি আকাশের ওপারে থাকে। আর ঈশ্বর সাধারণ মানুষের ধরা ছোঁয়ার বাইরে এক নিরাকার সত্তা। আজ বুঝি, স্বর্গ আসলে আকাশের ওপারে নেই। এই বস্তু জগতের ভেতরেই স্বর্গ। মানুষের ভেতরেই বিভিন্ন রূপে ঈশ্বরের অবস্থান। আরও বিস্তৃত বললে, ঈশ্বর, স্বর্গ-নরক এগুলো কয়েকটি শব্দ মাত্র। এই শব্দগুলোর আড়ালেই এর প্রকৃত রূপ। সেই রূপের সন্ধানই মানব জন্মের মূল সাধনা। রবীন্দ্রনাথের ‘বৈরাগ্য ও মুক্তি’ কবিতাটির কথা মনে পড়ে যাচ্ছে—
কহিল গভীর রাতে সংসার বিবাগী
গৃহ তেয়াগিব আজি ইষ্টদেব লাগি।
কে আমারে ভুলাইয়া রেখেছে এখানে?
দেবতা কহিল ‘আমি’। শুনিল না কানে।
সুপ্তিমগ্ন শিশুটিরে আকড়িয়ে বুকে
প্রেয়সী শয্যার পাশে ঘুমাইতেছে সুখে
কহিল, কে তোরা— ওরে মায়ার ছলনা?
দেবতা কহিল ‘আমি’। কেহ শুনিলো না।
ডাকিলো শয়ন ছাড়ি তুমি কোথা প্রভূ
দেবতা কহিলো ‘হেথা’— শুনিলো না তবু।
স্বপনে কাঁদিলো শিশু জননীরে টানি
দেবতা কহিল ‘ফির’ শুনিলো না বাণী।
দেবতা নিঃশ্বাস ছাড়ি কহিলেন হায়
আমারে ছাড়িয়া ভক্ত চলিলো কোথায়?
ঈশ্বর সম্পর্কে কত সরল বিশ্বাস তাঁদের! কতো সহজ জীবন যাপন করেন তাঁরা! সেদিনের আমার মতো তাঁদের বিশ্বস্ত চিত্তেও সম্ভবত এমন একটা চিত্রই সর্বদা ভেসে ওঠে। কর্মফল বলতে এখনো তাঁদের কেউ কেউ বিশ্বাস করেন পূর্বজন্মের কৃত কর্মের ফল। যা এই জন্মে, জন্মে জন্মে ভোগ করে যেতে হবে এবং তিরাশি লক্ষ যোনি ভ্রমণ শেষে মিলবে কাঙ্ক্ষিত মুক্তি। তাঁদের এই বিশ্বাস এতোটাই মৌলিক যে সামান্য আঘাতে সেটা ভাঙবারও নয়। যেখানে আমার যুক্তি ব্যাখ্যা বিশ্লেষণও ভীষণ অর্থহীন।
আহা! বিশ্বাসে মিলায় বস্তু। আমি যা বিশ্বাস করি তা যদি তাঁদের ঈশ্বর-বিশ্বাসের মতোই দৃঢ় হতো!
০২.
আজকাল প্রতিদিন প্রচুর মানুষ দেখি; মানুষ। রুদ্রাক্ষের মালা গলায় দিয়ে গোপনে তাদের চেতনার স্তরটা ভীষণ মেপে দেখতে ইচ্ছে করে। দেখিও। দেখি কারো কারো মধ্যে আমারই শৈশব ফুটে আছে, ফুটে আছে দূরন্ত কৈশোর। আর কিছু মানুষ, যারা নিজেকে ছোট ভেবে দূরে সরিয়ে রাখে, তাদের সাথে কথা বলে দেখি— যেন আমারই পরজন্মের ছায়া। যে জন্মে আমি ঈশ্বর হবো!
আবার রত্ন-পোশাকে মোড়ানো মানুষ, লোকে যাদের সম্মান করে, শ্রদ্ধায় নতজানু হয়, দেখি, তাদের ভেতরে বাস করছে আমারই পূর্বজন্মের ছায়া। যে জন্মে আমি ভ্যাম্পায়ার ছিলাম। সামান্য কারণেও কী হিংস্র যে ওয়ে ওঠে!
ভাবছি কোনও এক কমরেডকে একদিন ডেকে জিঙ্গেস করবো, শ্রেণীবৈষম্য কি শুধু অর্থনৈতিক কাঠামোর ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়? চেতনায় নয়?
বাংলাদেশ সময় : ১৬২২ ঘণ্টা, ০৭ অক্টোবর, ২০১২
সম্পাদনা : তানিম কবির, tanimkabir@gmail.com