 |
| ছবি:মোশারফ / বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম |
ঈদ আনন্দের বার্তা নিয়ে এলেও কারো কারো জন্যে ভীষণ কষ্টকর। কারো কারো জীবনে ঈদের দিনটি থাকে বিষাদে মাখা, দুঃখে ভরা। পড়ণের পুরোনো জামাটি যাদের বদল হয় না, ঈদের দিনেও যাদের বেরুতে হয় খাবারের খোঁজে, তাদের ঈদ বড় অন্যরকম।
যাদের মা পথ চেয়ে থাকার পরেও ঘরে ফেরা ভাগ্যে জোটে না,
বাইতুল মোকাররমে তখন সবেমাত্র ঈদের জামাত শেষ হয়েছে। নামাজ শেষে সবার মুখে হাসি খেলা করছে। লোকটির চোখের কোণে তখন কয়েকফোটা জল। মানুষের কোলাহল ঠেলে একপাশে দাঁড়িয়ে মোবাইলে কথা বলছেন লোকটি। প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদ করার সৌভাগ্য হয় নি তাঁর। তাইতো, ঈদের নামাজ শেষ করে আর এক মুহূর্তও দেরি নয়, মোবাইলে খোঁজ নিতেই নিজের অজান্তে ঝড়ালেন অশ্রু।
কথা বলে জানা গেল- তাঁর নাম জহিরুল ইসলাম। গ্রামের বাড়ি বগুড়ার শেরপুরে। রাজধানীর ধানমন্ডিতে এক বাসায় প্রহরীর কাজ করেন তিনি। ঈদে কখনোই বাড়ি যাওয়ার সুযোগ হয় না।
মা-বাবা আর স্ত্রী- সন্তান ছেড়ে চাকরির সুবাদে থেকে যেতে হয় ঢাকায় । ঈদ কেমন কাটে, এমন প্রশ্নের উত্তরের সঙ্গে ভেসে এলো একরাশ কষ্টমাখা অনুভূতি।
বললেন, “ঈদ কারে বলে, সেইটা দেখি না অনেক বছর। কেবল ঈদের নামাজে আসি, তারপর আবার দারেয়ানির কাজে লাগি যাই। কারো বাসা থেইকে এলে এক আধটু সেমাই খাই, আর না হয় খাই না।”
একটু থেমেই জহির বললেন, “সবচেয়ে বড় কষ্ট লাগে ছোট্ট মেয়েটার সঙ্গে একবারও ঈদ করতে পারিনি আমি। এইবার টাকার জন্য মেয়েটারে একটা জামাও কিনে দিতে পারি নাই। মোবাইলে মেয়ে আমারে বলে, বাবা ঈদে আইবা না? আমি কিছু কইতে পারি না। খালি নিজে নিজে কান্দি।”
রিকশা চালক হারুন মিয়ার সঙ্গে কথা হয় বিজয়নগর মোড়ে। অন্যান্যদিনের মতোই রিকশার উপর এক পা তুলে বসে আছেন। ঈদের দিনটি কেমন যাচ্ছে- প্রশ্নের উত্তরে প্রথমে হাসলেন খানিকটা। তারপর বললেন, “ঈদ কেমন কাটতাছে, তা তো দেখতেই পারতাছেন।
রিকশাঅলাগো আবার কিসের ঈদ? সারাদিন রিকশা চালাইয়া কয়ডা ট্যাকা পাইলে তা লইয়া ঘরে যামু। এইডাই হইলো ঈদ।”
হারুন মিয়া ঈদে বাড়ি যাননি। ঈদের দিন ঢাকায় কাটালে কিছু বাড়তি আয় হবে বলেই থেকে গেছে। তাছাড়া ঈদে বাড়ি যাওয়ার অতিরিক্ত খরচও বেঁচে গেল। তবুও হারুণ মিয়ার ভাগ্যে জোটেনি ঈদের নতুন জামা আর একটুখানি ফিরনি সেমাই।
মগবাজারে পথের পাশে দাঁড়িয়ে সাহায্যের আশায় হাত পাতলেন সত্তোরর্ধো জয়নাল পাটোয়ারি। নোয়াখালীর সোনাপুরে বাড়ি তাঁর। ঢাকায় থাকেন অনেকদিন। পরিবার বলতে ছেলে আর ছেলের বউ। নোয়াখালিতেই থাকে।
তবুও জয়নাল মিয়া ঈদের ঢাকায় কেন, প্রশ্ন করতেই উত্তর এলো, “বাজান, এই কেন’র উত্তর দিতে পারলে আপনার সামনে হাত পাততাম না। ঠিকমতো খাইতেই পারি না, ঈদে বাড়ি যামু কেমনে? আমাগো ঈদ পথে ঘাটে, আপনাগো লগে।”
পাতাকুড়ানোদের দেখা মেলে সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে। নিত্য যেখানে তাদের খেলা, ঘুম আর আড্ডার স্থান। রুবেলকে কাছে ডাকতেই দৌড়ে এলো। “মামা, ঈদের সেলামী দিবেন না” বলেই পা জড়িয়ে ধরলো। হাতের মধ্যে ছোট একটি নোট গুঁজে দিয়ে রুবেলের কাছে যখন ঈদ কেমন লাগছে, জানতে চাওয়া হলো, তখন সে বললো, “ঈদ ভালা।
আপনারা সেলামী দেন। আরেক মামা ডাইকা নিয়া খাওয়াইছে। অন্যদিন সবাই দূরে ঠেইল্যা দেয়। ডেইলি ডেইলি ঈদ হইলে খুব মজা হইবো” বলেই অন্যকারো সেলামী নিতে দিল দৌড়।
ঈদের দিন পল্টন মোড়ে ‘ফার্মগেট, উত্তরা’ বলে ডাক ছাড়তে দেখা গেলো নরসিংদীর নওয়াব হোসেনকে। নগর সার্ভিস বাসের হেলপার তিনি। ঈদের দিনেও এমন বাসের যাত্রী যে তিনি সুখে ডাকছেন না, তার প্রমাণ পাওয়া গেলো নওয়াব হোসেনের কথা বলেই।
“ভাই, ছোটবেলা থেকে আইজ পর্যন্ত ঈদ কি বুঝি নাই। খালি বুঝি কয়ডা মানুষ খুব আনন্দ ফুর্তি করে, বাসের হেলপারগোরে এক/দুই টাকা বাড়াইয়া দেয়। এই পর্যন্ত ঈদ এমনই দেখছি।” নওয়াব হোসেন ঈদ অভিজ্ঞতা শুনে আর জানতে চাওয়ার সাহস হয়নি, তার পরিবার কেমন করে ঈদ কাটাচ্ছে।
বাসে বসে থাকা একমাত্র যাত্রী নারগিস আক্তারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেলো ঈদের অন্য অনুভূতি। রংপুরের পীরগাছায় বাড়ি নারগিসের। ঢাকার মিরপুরে থাকেন। কাজ করেন মিরপুরের একটি গার্মেন্টে। দুই সন্তানের মা নারগিসের স্বামী মারা গেছেন বছর দুয়েক আগে।
তারপর থেকে নারগিসের ঈদ আর অন্যদিনের মাঝে পার্থক্য হলো, ঈদ এলেই নারগিসের সব উলট পালট হয়ে যায়। স্বল্প বেতনের গার্মেন্ট কর্মী নারগিস ঈদ থেকে পালাই পালাই করে। তবুও কেন যে ঈদ আসে ধরে ফেলে, তার কোন ব্যাখ্যা জানা নেই নার্গিসের। কেবল বাসের জানালার দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন, “আমাগো ঈদ বড় কষ্টের”।
বাংলাদেশ সময় : ১৩০১ ঘণ্টা, আগষ্ট ২০, ২০১২
সম্পাদনা : সুকুমার সরকার, কো-অর্ডিনেশন এডিটর
kumar.sarkerbd@gmail.com