 |
সিলেট থেকে ফিরে: ভূ-প্রাকৃতিক গঠনের কারণে ভূমিকম্পের ডেঞ্জার জোনে রয়েছে সিলেট। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে সিলেট অঞ্চলে ‘সক্রিয় চ্যুতি’ বেশি হওয়ায় ও এপিসেন্টার (ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল) কাছাকাছি হওয়ায় বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে সিলেট।
সরেজমিন সিলেটের বিভিন্ন স্তরের মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বেশীরভাগ মানুষই জানেন না ভূমিকম্প সর্ম্পকে। আবার অনেকের রয়েছে অনীহা। সিলেটকে পূণ্যভূমি বলাতে বাসিন্দাদের বেশীরভাগই মনে করেন, সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছা ছাড়া সিলেটে কিছুই হবে না। এছাড়াও দৃশ্যমান নয় বলে ভূমিকম্প নিয়েও মাথাব্যথা নেই তাদের।
এপিসেন্টার (ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল) ও দুটি প্লেটের (মাটির বিশেষ স্তর) সংযোগস্থলও সিলেটের কাছাকাছি হওয়ায় এ অঞ্চল ভূমিকম্পের জন্য প্রবল ঝুঁকিপূর্ণ বলে মতামত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
তারা আরো জানিয়েছেন, মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পেও বড় ধরণের প্রাণহানির আশংকা রয়েছে সিলেটে।
কিন্তু সিলেট শহরের বেশ কয়েকটি ওয়ার্ডের মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বেশীরভাগই এখনো জানেন না ভূমিকম্পের ভয়াবহতা সর্ম্পকে।
সিলেটের মনিপুরী মার্কেট এলাকার বাসিন্দা মাহফুজুর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ভূমিকম্প হলে এটা কেউ ঠেকাতে পারবে না। সিলেট হলো পূণ্যভূমি এখানে খোদা চাইলে দুর্যোগ হবে, না চাইলে হবে না।
সিটি কর্পোরেশনের ৩৬ নং ওয়ার্ডের ‘শাহজালাল ভলান্টিয়ার টিম’ কাজ করছে ভূমিকম্প নিয়ে সচেতনতা তৈরিতে। টিমের সদস্য মাওলানা রেজাউল করিম বাংলানিউজকে বলেন, সিলেটের মানুষের মধ্যে ধর্মীয় বিশ্বাস অনেক বেশী। আমি নিজেও এক সময় বিশ্বাস করতাম না। কিন্তু পরে ঈমামদের জন্যে ভূমিকম্প বিষয়ক ক্যাম্পে অংশ নিয়ে সচেতন হয়েছি।
তিনি বলেন, নূহ নবীর সময়ও দূর্যোগ হয়েছিল। এখনো হতে পারে। আমরা হয়তো দুর্যোগ আসা ঠেকাতে পারবো না। কিন্তু দূর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি যেন কম হয় সে জন্যে প্রস্তুত থাকতে পারি। এবং দুর্যোগের পরে আমাদের নিজেদের কর্তব্য সর্ম্পকে জানতে হবে।
সিলেটের মানুষের ভূমিকম্প নিয়ে এখনো অজ্ঞতা অনেক বেশী বলে জানালেন তিনি।
ধর্মীয় ভরসার জায়গা থেকে ভূমিকম্প সর্ম্পকে মানুষের এ ধারণাকে উড়িয়ে দিলেন না, সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্যানেল মেয়র শাহানারা বেগম শাহানা।
বাংলানিউজকে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় শাহজালালের মাজারে যারা অবস্থান করেছিল তাদের কোন বিপদ হয়নি। জানেন সেখানে একটি মর্টারের সেল পর্যন্ত পড়েনি।
তাই মানুষের এ বিশ্বাস থাকাটাকে স্বাভাবিক বলেন শাহানারা। তিনি বলেন, তবে আমাদের প্রস্তুতি নিয়ে থাকতে হবে। কারণ সিলেটের অবস্থান ঝুকিপূর্ণ সীমায়।
এরইমধ্যে সিলেট সিটি কর্পোরেশন কিছু প্রস্তুতির কাজ নিয়েছে বলে জানান তিনি। ফায়ার সার্ভিস এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ভার্ড ও ইসলামিক রিলিফের উদ্যেগে বিভিন্ন ওয়ার্ডে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ভলান্টিয়ার টিম তৈরি করা হচ্ছে। এছাড়াও দুর্যোগ মোকাবেলার কিছু প্রয়োজনীয় সামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে।
ঝূকিপূর্ণ এলাকা হওয়াতেও উচু ভবন নির্মাণে বিল্ডিং কোড মানছেন না অনেকেই। শাহানারা বেগম বলেন, এখানে মানুষ পাহাড় কেটে বাড়ি ঘর নির্মাণ করছেন অপরিকল্পিতভাবে। এটা আসলে ভয়ের অন্যতম কারণ। মানা করা সত্ত্বেও মানছে না।
দ্বায়িত্ব থাকা সত্ত্বেও সিটি কর্পোরেশন ঠিকমতো নজরদারি করতে পারছেন না বলে স্বীকার করেছেন শাহানারা। তিনি বলেন, আমাদের লোকবলের সংকট রয়েছে। এছাড়াও রয়েছে যন্ত্রপাতির সংকট ও প্রভাবশালীদের চাপ। এছাড়া আইনের দূর্বলতার কারণেও অনেক সময় ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না।
ভার্ড এর মাঠ কর্মকর্তা জাভির আহম্মেদ নোমান বাংলানিউজকে বলেন, এখানকার মানুষের মধ্যে ভূমিকম্প নিয়ে সচেতনতা তৈরি করা কঠিন। এর একটি বড় কারণ, বেশীরভাগ মানুষ ভাবেন সিলেট পূণ্যভূমি। এখানে কোন ধরনের বিপদের ওপর হাত নেই। এ কারণে দুর্যোগ মোকাবেলার প্রস্তুতি নিতেও আগ্রহী নন তারা।
অথচ ১৮৯৭ সালে রিখটার স্কেলে ৮ দশমিক ৬ মাত্রার ‘দ্যা গ্রেট ইন্ডিয়ান আর্থকোয়েক’ দেড়শ’ বছরের মধ্যে এ অঞ্চলের সবচে’ ভয়াবহ ভূমিকম্প। এর উৎপত্তিস্থল ছিল প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার ব্যাসার্ধ জুড়ে।
এ ভূমিকম্পের কারণে ব্রহ্মপুত্র নদের গতিপথ পরিবর্তনসহ সিলেট ও আসাম অঞ্চলের উল্লেখযোগ্য ভৌগলিক পরিবর্তন ঘটে।
তিনি বলেন, আরেকটি কারণ হচ্ছে ভূমিকম্পের ক্ষতি লোকের কাছে অদৃশ্য। মানুষ যে ক্ষতি দেখেনি সেটি সর্ম্পকে ধারণা কম।
তবে যারা পূর্বপুরুষদের কাছে ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পের সর্ম্পকে শুনেছেন, তারা অনেকটাই সচেতন।
বাংলাদেশ আর্থকোয়েক সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মেহেদী আনসারী শনিবার বাংলানিউজকে বলেন, এটাও একটি স্বাভাবিক ব্যাপার যে মানুষ অদৃশ্য দূর্যোগকে ভয় পান না। আসলে একবার ক্ষতিগ্রস্ত হলে তখন বোধ আসে। তবে আবার ভুলে যায়। মাত্র ১৫ বছর আগে ১৯৯৭ সালেও সিলেট একই বছর দুটি ভূমিকম্প হয়, তারপরও মানুষ ভুলে গেছে।
ধর্মীয় অনুভূতির ব্যপারে তিনি বলেন, ভূমিকম্প নিয়ে ধর্মীয় বিশ্বাস থাকাটা ভাল। তবে এটাও মনে রাখতে হবে, এ অঞ্চলে আগেও বড় বড় ভূমিকম্প হয়েছে। দুর্যোগ হয়তো কেউ ঠেকাতে পারবে না, কিন্তু দূর্যোগ পরবর্তী ক্ষতি সেরে উঠতে অবশ্যই ভাল প্রস্তুতি নিতে হবে।
মানুষকে সচেতন করতে, সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর পাশাপাশি গণমাধ্যমকেও বড় ভূমিকা পালন করতে হবে। দুর্যোগ ঘটার আগেই মানুষকে সচেতনতা করা বেশী প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
বাংলাদেশ সময়: ০৯২৮ ঘণ্টা, জুলাই ০১,২০১২
এমএন/সম্পাদনা: নূরনবী সিদ্দিক সুইন, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর