ঢাকা: সোমবার সন্ধ্যা সাতটা। রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমীর জাতীয় নাট্যশালা কানায় কানায় পরিপূর্ণ দর্শকে। এসব দর্শকেরা অবশ্য নাট্যশালায় উপস্থিত হয়েছেন সাতটা বাজার অনেক পূর্বেই।
দর্শক সারিতে সংস্কৃতিপ্রেমী সাধারণ মানুষের চেয়ে শিল্প-সাহিত্য অঙ্গনসহ দেশের বিভিন্ন সেক্টরে প্রতিষ্ঠিত খ্যাতিমান ব্যক্তিবর্গই বেশি। দর্শক সারিতে উপবিষ্টদের মধ্যে ভারতীয় হাইকমিশনার রঞ্জিত মিত্র, শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকিসহ বিশিষ্ট জনেরা।
এতসব ঔৎসুকের কারণ ভারতীয় কত্থকনৃত্যের জীবন্ত কিংবদন্তী পন্ডিত বিরজু মহারাজ স্বয়ং নাচবেন জাতীয় নাট্যশালায়। একই সঙ্গে নাচবেন তাঁর যোগ্য উত্তরাধিকার শিয্যা শাশ্বতী সেন ও কন্যা মমতা মহারাজ।
দেশের শীর্ষ নৃত্য শিক্ষার প্রতিষ্ঠান নৃতাঞ্চলের আয়োজনে ৬ দিনব্যাপী কত্থকনৃত্য কর্মশালার অংশ নেয়া শিক্ষার্থীদের তালিম দেন পন্ডিত বিরজু মহারাজ। তারাও পরিবেশন করবেন নৃত্য।
সোমবার সন্ধ্যায় অন্যদের মত প্রবল আগ্রহ নিয়ে আমিও উপস্থিত হয়েছিলাম জাতীয় নাট্যশালায়। সে আগ্রহ কেবল নৃত্য দেখার নয়, একজন বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্বকে কাছ থেকে দেখার, তার অমৃত বচন নিজ কানে শোনার আগ্রহ।
উল্লেখ্য, পন্ডিত বিরজু মহারাজ শুধু কত্থকনৃত্যেই নন, (ভক্তদের প্রিয় মহারাজজী) তাঁর সচ্ছন্দ বিচরণ ভারতীয় ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিকেও। চিত্রশিল্পী হিসেবেও সমান ভাবেই অসাধারণ তিনি।
এই জীবন্ত কিংবদন্তীর বাংলাদেশে আগমন তাঁর ভক্ত-অনুরাগীদের জন্য যেমন বড় প্রাপ্তি, তেমনি বড় প্রাপ্তি নাচ শেখা নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের জন্যও। তেমনটাই বলছিলেন, বাংলাদেশে ‘মহারাজজী’র সুযোগ্য শিষ্য নৃত্যশিল্পী শিবলী মোহাম্মদ।
কত্থকনৃত্যসন্ধ্যার সূচনা বক্তব্যে শিবলী মোহাম্মদ বলেন, ‘আমার জীবন আজ সার্থক হলো। আমার পরম শ্রদ্ধার-ভালবাসার গুরু মহারাজজী বাংলাদেশে। আরো বড় সৌভাগ্য হলো দেশে আমার হাজারো শিক্ষার্থী গুরুর আলোয় আলোকিত হওয়ার সুযোগ পেল।’
মহারাজজীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বক্তব্য দেন, নৃত্যাঞ্চলের সমন্বয়কারী মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর ও শিল্পকলা একাডেমীর মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী।
অনুভূতি জানিয়ে বক্তব্য দেন, মমতা মহারাজ ও শ্বাশতী সেন।
শ্বাশতী সেন তার প্রতিক্রিয়ায় প্রিয় গুরুজীকে অভিহিত করেন ‘মাল্টি ফেসিটেড জিনিয়াস’ হিসেবে।
অনুষ্ঠানের শুরুতে মহারাজজীর অসাধারণত্বের জানান দেয় তাঁরই কম্পোজিশনে নৃত্যাঞ্চলের শতাধিক নৃত্যশিল্পী। নৃত্যাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা পরিবেশনা তারানা ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা অভিসারের নৃত্যরূপ বিমোহিত করে সবাইকে। অভিসারের নৃত্যরূপে অংশগ্রহণ করেন শিবলী মোহাম্মদ ও শামীম আরা নীপা।
এরপর উপস্থাপিত হয় কাজী রকিবুল হক রিপনের সম্পাদনায় পন্ডিত বিরজু মহারাজের জীবনীর সংক্ষিপ্ত ভিডিও চিত্র। এতে সংক্ষেপে তুলে ধরা হয়, মহারাজজীর বিচিত্র ও বর্ণাঢ্য জীবন।
ভিডিও চিত্র উপস্থাপনের পর শুরু হয় মূল আকর্ষণ। প্রথমে মঞ্চে আসেন মমতা মহারাজ। দীর্ঘদেহি ও স্বাস্থবান একজন নারী কিভাবে দ্রুত লয়ের নৃত্য উপহার দিতে পারেন, এর আগে তা ধারণা ছিল না।
মমতার পর শ্বাশতী সেন। দু’জনের নৃত্যেই তবলা সঙ্গত করেন ও নির্দেশনা দেন মহারাজজী নিজেই।
সবশেষে মহারাজজী যখন মঞ্চে উঠলেন নৃত্য পরিবেশনের জন্য তখন আর সন্ধ্যা নেই, রাত এগারটা ছুঁই ছুঁই।
মহারাজজী যখন পরিবেশনা শুরু করলেন, তখন কেবল তিনি নিজেই নাচলেন না, পুরো হলভর্তি দর্শককেও নাচিয়ে তুললেন-আপদামস্তকে।
আমার পাশে বসা অনেক বিদগ্ধ দর্শকদের দেখা গেল নৃত্যের তালে দুলে উঠতে। এক বন্দিস শেষ হতেই তুমুল করতালিতে মূখর পুরো হল।
শিষ্য নৃত্যশিল্পী শিবলী মোহাম্মদ আর শামীম আরা নীপাকে মঞ্চের এককোণে দেখা গেলো নিবিষ্টমনে গুরুজীর নৃত্য দেখতে, একদন্ডের জন্য অন্য দিকে তাকালেন না তারা।
নৃত্য শেষে পন্ডিত বিরজু মহারাজ ভারতীয় রাগ সংগীতের মোহনীয় সুরের জাদুতে মাতিয়ে তুলেন সবাইকে।
রাত বারটা বেজে গেলেও বেশির ভাগ দর্শকদেরকেই দেখা গেলো নিজ আসনে ঠাঁই বসে থাকতে। একজন মহান শিল্পীর প্রতি প্রগাঢ় শ্রদ্ধার এমন দৃশ্য দেখা মিলে খুব কমই।
অনুষ্ঠান শেষে যখন জাতীয় নাট্যশালা থেকে বের হই ততক্ষনে রাত সোয়া বারটা। চাঁদের আলোয় আলোকিত রাতের ঢাকায় এগিয়ে চলছি। তখনো সেই মহারাজজীর অপূর্ব নৃত্য আর সুরের মূর্ছনায় আচ্ছন্ন। হেটে চলছি আর মনে হচ্ছে আমার উচ্চতা যেন বেড়ে গেছে কয়েক ফুট!
বাংলাদেশ সময়: ০১১৬ ঘণ্টা, জুন ২৭, ২০১২
সম্পাদনা: বেনু সূত্রধর, নিউজরুম এডিটর