 |
| ছবি: বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম |
চট্টগ্রাম: সরকার আয় বুঝে ব্যয় এবং সবাই সংযত আচরণ করলে মূল্যস্ফীতি আর থাকবে না বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সেই জায়গায় নিয়ে যেতে চাই, যার স্বপ্ন দেখেছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মুক্তিযোদ্ধারা।”
শনিবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম একাডেমি আয়োজিত বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের পরিচালক অধ্যাপক হান্নানা বেগমের ৩টি বইয়ের প্রকাশনা উৎসবে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন।
উৎসবে আলোচ্য বই তিনটি হচ্ছে: ‘নারীর মানুষ হওয়ার সংগ্রাম: জাতিসংঘের উদ্যোগ ও বাংলাদেশের চালচিত্র’, ‘বাজেটের কথা ও জনপ্রত্যাশা’ এবং নারী ও বাংলাদেশের অর্থনীতি’।
মূল্যস্ফীতি দীর্ঘদিন ডাবল ডিজিটে ছিল উল্লেখ করে গভর্নর বলেন, “৪ মাস ধরে মূল্যস্ফীতি কমছে। এখন খাদ্যে মূল্যস্ফীতি ৮-এর ঘরে।”
অর্থনীতিবিদদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “আসুন নিজেদের ওপর আস্থা রাখি। আমরা কেন দেশের অন্তর্নিহিত শক্তির কথা মাথা উঁচু করে বলবো না। হতাশার পরিবেশ সৃষ্টি করলে, সংশয়বাদিতার পরিবেশ সৃষ্টি করলে কারও কারও ব্যক্তিগত লাভ হলেও দেশের কোনো লাভ হবে না। তাই সংশয়বাদিতার পরিবেশ সৃষ্টির অপচেষ্টা বাদ দিয়ে ভরসার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। আমাদের দায়িত্বশীলদের অসংলগ্ন কথা বলা বন্ধ করতে হবে। অর্থনীতিবিদদের কেউ কেউ আত্মবিনাশী অভিযাত্রায় নামি। তারা যদি প্রচার করে দিতে পারেন জিনিসপত্রের দাম আর কমবে না, তাহলে সত্যিই কমানো কঠিন।”
স্যামুয়েল সনের উদ্ধৃতি দিয়ে গভর্নর বলেন, “অর্থনীতিবিদরা সহজ জিনিস কঠিন করে ফেলেন। আমরা অযথা ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কঠিন করে ফেলি।”
সরকারের পাশাপাশি অনেক বেসরকারি সংগঠন ও ব্যক্তি কাজ করছেন বলেই দেশ এগিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমাদের গড় আয়ু ৬৯ বছর, ভারতে ৬৭। দারিদ্র্য হার ৬০ শতাংশ থেকে কমে ৩০ শতাংশ এবং গরিব মানুষের সংখ্যা ৪ কোটি থেকে আড়াই কোটিতে নেমে এসেছে। আমি এ সাফল্য সরকারকে দিচ্ছি না। এটা সবাই মিলে অর্জন করেছি। অতিকথনে এ সাফল্য যেন ম্লান করে না দিই।”
বাজেট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “সত্তরের দশকের আগে কেউ বাংলায় অর্থনীতি নিয়ে লিখতেন না। আমিই প্রথম শুরু করেছিলাম। এখন তো বাংলায় অর্থনীতি নিয়ে প্রচুর লেখা হয়। আগে বাজেট ঘোষণার দিন পত্রিকায় এক কলামে ছোট্ট সংবাদ বেরুত। পরদিন সামান্য একটু সংবাদ হতো। এখন তো বাজেট নিয়ে ১ মাস আগে আলোচনা শুরু হয়। তারপর চলতে থাকে। এখনো তীব্রভাবে চলছে।”
ঘরের বাজেটের সঙ্গে জাতীয় বাজেটের খুব বেশি পার্থক্য নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমরা ‘বাজেট সহজপাঠ’ নিয়মিত বের করতাম। নারীর বাজেট, শিশুর বাজেট, প্রতিবন্ধীর বাজেট নামে খ- বিখ- করতাম। আসলে বাজেট একটি দলিল। কোনো সরকার কী চান তা বাজেটে ফুটে ওঠে। বাজেট সাধারণ মানুষের কাছে সহজভাবে উপস্থাপন করতে পারলে তারাও জবাবদিহি চাইবে।”
নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে গেছে উল্লেখ করে গভর্নর বলেন, “নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে ১১তম। দেড়-দুই দশক আগেও কোনো কোনো এনজিও অফিস পুড়ে ফেলা হয়েছিল নারী কর্মীদের ভয় পাইয়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু বাংলাদেশের নারী ভয় পায়নি। বাংলাদেশ ব্যাংক নারীর ক্ষমতায়নে অনেক উদ্যোগ নিয়েছে। আমরা আবশ্যিক করে দিয়েছি ব্যাংকে নারীর জন্য আলাদা ডেস্ক করার বিষয়টি। আমরা নারীর জন্য রিফাইন্যান্স হিসেবে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে ৫ শতাংশ হারে ঋণ দিচ্ছি, তারা ৯ শতাংশ হারে দেবে। ইতিমধ্যে ২৬২ কোটি টাকা নারী উদ্যোক্তারা ঋণ পেয়েছেন।”
হানান্না বেগম ও তার বই প্রসঙ্গে গভর্নর বলেন, “তিনি আমার দীর্ঘদিনের সহকর্মী। আজন্ম নিবেদিত। শুধু নারী মুক্তি নয় সামগ্রিক অর্থনৈতিক মুক্তির পক্ষে ছিলেন। ছাত্রজীবন থেকে এখনো আদর্শ থেকে সরেননি। নারী আন্দোলন ও নিষ্পেষিত নারীর কথা ফুটে উঠেছে তার বইয়ে। নারী জাগরণের ইতিহাসের অনন্য দলিল বইগুলো। তার লেখার উদ্দেশ্য মহৎ। আগামী নারী আন্দোলনের নেতৃত্ব দেবেন যারা তাদের জন্য বইগুলো অবশ্য পাঠ্য হওয়া উচিত।”
চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের ইঞ্জিনিয়ার আবদুল খালেক মিলনায়তনে উৎসবে বিশেষ অতিথি ছিলেন দৈনিক আজাদী সম্পাদক এমএ মালেক।
তিনি বলেন, “হান্নানা বেগম চিন্তা-চেতনায় একজন অর্থনীতিবিদ, গবেষক। তার বইগুলো বলে দেয় তিনি গবেষণাকর্মে আন্তরিক। নারী সমস্যার রাষ্ট্রীয় সমাধান কীভাবে হবে এটাও তার গবেষণার বিষয়। তিনি নারী অধিকার নিয়ে সোচ্চার।”
গভর্নরের উদ্দেশে তিনি বলেন, “নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অন্তত ৫০ ভাগ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রামে পেলে চট্টগ্রামবাসী আজীবন কৃতজ্ঞ থাকবে।”
চট্টগ্রাম একাডেমির চেয়ারম্যান ও বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী ড. অনুপম সেনের সভাপতিত্বে উৎসবে বইয়ের ওপর নির্ধারিত আলোচক ছিলেন কবি-সাংবাদিক আবুল মোমেন ও অধ্যক্ষ আনোয়ারা আলম। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা সংগঠক ও প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ রউফ।
আবৃত্তিকার আয়েশা হক শিমুর সঞ্চালনে স্বাগত বক্তব্য দেন একাডেমির মহাপরিচালক আমিনুর রশীদ কাদেরী।
সংযত মুদ্রানীতির কারণে মূল্যস্ফীতি এক অঙ্কে এসেছে : গভর্নর
বাংলাদেশ সময়: ২১৫০ ঘণ্টা, জুন ০৯, ২০১২
এআরএম/সম্পাদনা : আবু হাসান শাহীন, নিউজরুম এডিটর