 |
ঢাকা: বিমান চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত এয়ারমার্শাল জামাল উদ্দিনের লোক এই পরিচিতি নিয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন পলাশ নামের এক ব্যক্তি। তার আর কোনো বড় পরিচয় জানা যায়নি। বিমানের প্রতিটি বিভাগে তার দাপট চলছে। পদোন্নতি, বদলি, শাস্তি, কেনা-কাটাসহ বিমান লিজ সব ক্ষেত্রেই তার হস্তক্ষেপ। আর এসব কাজে সঙ্গী তার বিমানবালা স্ত্রী নূরজাহান।
ব্যবস্থাপনা পরিচালক থেকে পিওন পর্যন্ত সবাই এই দম্পতির ভয়ে তটস্থ।
পলাশ-নূরজাহানকে পাত্তা না দিলেই বিমানের যে কোনো কর্মীকে হতে হয় নাজেহাল। সাধারণ কর্মীরা অবশ্য এই দম্পতিকে প্রতিহত করার সুযোগ খুঁজছেন।
বাংলাদেশ বিমানের কার্যালয়ে ফ্লোরে ফ্লোরে বিমান কর্মীদের মধ্যে পলাশ আতঙ্ক কাজ করে। তাদের সঙ্গে আলাপ করেই জানা যায় এসব তথ্য।
একটি সূত্র জানায়, পলাশ বিমান চেয়ারম্যানের পারিবারিকভাবে ঘনিষ্ঠ একজন। তবে তিনি নিজেকে কারো কাছে চেয়ারম্যানের ভাতিজা কারো কাছে চেয়ারম্যানপুত্র জোবায়েরের বন্ধু হিসেবে পরিচয় দেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বিমানে পলাশের আত্মপ্রকাশ ঘটে ২০০৯ সালে। যখন বিতর্কিত কাবো এয়ারলাইন্সের উড়োজাহাজ হজের জন্য লিজ নেওয়া হয়। এসময় পলাশ নিজেকে কাবোর প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দিয়ে বিমানে যাতায়াত করতেন। এছাড়াও চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠ এই পরিচয় দিয়ে বিমানের পরিচালকদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করতেন।
এর পর থেকেই দাপট চলাতে থাকে পলাশের। ২০১১ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন থেকে দূর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করতে একটি প্রতিনিধি দল বলাকা ভবনে গিয়ে সদ্য পদত্যাগকারী তৎকালীন এমডি গ্রুপ ক্যাপ্টেন জাকিউলকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে পলাশের নাম উঠে আসে। এরপরও বিমান চেয়ারম্যানের সঙ্গে তার দহরম মহরম চোখে পড়ার মতো। অবাধে চেয়ারম্যানের ডিওএইচএসের বাসায় পলাশের যাতায়াত, বলাকার ফ্লোরে ফ্লোরে পলাশের দাপট, দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত এয়ারশোতে অংশ নেওয়ার জন্য বিমানের একই ফ্লাইটে চেয়ারম্যানের সঙ্গে পলাশ দম্পতির দুবাই যাত্রা এসব চলতেই থাকে।
সেবার দুবাই থেকে ফেরার পর শুরু হয় পলাশের স্ত্রী বিমানবালা নূরজাহানের উৎপাত। সহকর্মীদের সঙ্গে ঔদ্বত্যপূর্ণ আচরণ, ধমকা-ধমকি চলতে থাকে। একটি সূত্র জানায়, মাস চারেক আগে চেয়ারম্যানের সঙ্গে নূরজাহানের হংকং ভ্রমণের পর এ উৎপাত আরও বেড়ে যায়।
সূত্রটি জানায়, হংকংগামী বিমানের ঐ ফ্লাইটে চেয়ারম্যানের সফরসঙ্গী ছিলেন, ক্যাপ্টেন ইশরাত, ফার্স্ট অফিসার নজরুল শামীম, ও বিমানবালা নূরজাহান। ওই দিন ফ্লাইটে চেয়ারম্যান বিমান ক্যাটারিংয়েল খাবার না খেয়ে নুরজাহানের বাসা থেকে নেওয়া খাবার খান। এবং মন্তব্য করেন এমন খাবার তার বাসায়ও তৈরি হয় না।
চেয়ারম্যানের মুখে এমন উচ্ছসিত প্রশংসা শুনে বিস্মিত হন অন্যরা।
জানা যায়, ওই ঘটনার পর আরও তৎপর ও বেপরোয়া হয়ে উঠেন নূরজাহান। ঢাকায় ফিরে ঘটনাটি নিজেই প্রচার করে চেয়ারম্যানের সঙ্গে তার দহরম মহরমের কথা জানান দেন। এই সুযোগে তদ্বির বাণিজ্যও শুরু হয়ে যায় তার।
সূত্র জানায়, নূরজাহান এখন তার বিভাগের সি-নাম্বারধারী (অস্থায়ী) সহকর্মীদের স্থায় পি-নাম্বারধারী (স্থায়ী) করে দেওয়ার নিশ্চয়তা দিয়েছেন। আর এতে পদোন্নতি প্রত্যাশীরা নূরজাহানের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলছেন। লেনদেনও চলছে নানা কিছু।
বিমানের সেন্ট্রাল কন্ট্রোল বিভাগের একজন কর্মকর্তা বাংলানিউজকে জানান, পলাশ যে কাবোর কমিশনের টাকা কেউ একজনের বাসায় পৌছে দিতেন এমন অভিযোগের স্বপক্ষে বেশ কিছু আলামতও রয়ে গেছে। সে সময় জেনারেল ম্যানেজার মামদুদ খান এ সংক্রান্ত অফিস নোটে লিখেছিলেন ডিসি ১০ বসিয়ে রেখে কাবো দিয়ে ফ্লাইট অপারেট করার ফলে বিমানের অনেক ক্ষতি হচ্ছে।
সূত্র জানায়, কেবল এ কারণেই মামদুদকে ওই বিভাগ থেকে সরিয়ে কাস্টমস বিভাগে পাঠান চেয়ারম্যান। জানা গেছে, পরে এ ক্ষেত্রে পলাশের হস্তক্ষেপে মামদুদ খানকে ম্যানেজ করা হয়। এবং সম্প্রতি তাকে পরিকল্পনা বিভাগে বদলিও করা হয়েছে। এর নেপথ্যে কাহিনী হিসেবে একজন ম্যানেজার নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আবার হজ উপলক্ষ্যে উড়োজাহাজ লিজ নেওয়ার কাজ চলছে। লিজের সব কাজ করা হয় পরিকল্পনা বিভাগেই। কাজেই এখানে মামদুদ বিশ্বস্ততার সঙ্গে কাজ করবেন বলে চেয়ারম্যানকে আশ্বস্ত করেছেন পলাশ। আর বিশ্বস্ততার প্রমানও দিয়েছেন মামদুদ। মামদুদের সহায়তায় এবারও কাবোর লোকাল এজেন্টের পক্ষে পলাশ জোর তৎপরতা চালাচ্ছেন এমন খবর জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।
সম্প্রতি বিমানের মোটর বিভাগে ব্যবসা ফাঁদতে চেয়ারম্যানের সুপারিশ নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোতে পলাশের জোর তৎপরতা চলছে বলেও সূত্র জানায়।
পরিকল্পনা বিভাগের একজন কর্মকর্তা অত্যন্ত বিস্ময় প্রকাশ করে বললেন, পলাশের সঙ্গে চেয়ারম্যানের সর্ম্পক কতোটা গভীর তার প্রমাণ হচ্ছে- ২০১১ সালে যখন বোয়িং ৭৭৭ জাহাজ ইনডাকশন অনুষ্ঠানে তার উপস্থিতি। সে অনুষ্ঠানে বিমানের হাই অফিসিয়াল ছাড়া কারোর প্রবেশাধিকার ছিলনা। অথচ পলাশকে সেখানে বেশ দাপটের সঙ্গে অবস্থান করতে দেখা যায়।
বর্তমানে বিমানে হজ ফ্লাইটে কাবোর উড়োজাহাজ লিজ নেওয়ার জন্য দৌড়ঝাঁপ চালিয়ে যাচ্ছেন পলাশ। কিন্তুহজ ফ্লাইট পরিচালনায় কাবোর দূর্নীতির কথা সবারই জানা।
দুদকের তদন্তকারী এক উপ-পরিচালক বলেন, কাবোর দুর্নীতির সিন্ডিকেটে চেয়ারম্যান জামালউদ্দিনের সম্পৃক্ততা প্রমাণে পলাশকে জিজ্ঞাসাবাদই যথেষ্ট।
বাংলাদেশ সময় ১০০৬ ঘণ্টা, জুন ১৯, ২০১২
এমএমকে- menon@banglanews24.com