 |
এমন ঘটনা নিরঞ্জনের মাথায় বজ্রপাতের সামিল। যুবতীর নিরাভরণ দেহ নিথর। বোঝা যাচ্ছে- ধর্ষিত হয়েছে। চোখে-মুখে ক্ষত। হিংস্রতার চিহ্ন। রক্তের ধারা নীরবে বয়ে চলেছে। পিঁপড়েরা সারি সারি লাইন দিয়েছে।
পঞ্চ রমণীর হাসি আর ধরে না। জোছনার মতো গলে গলে পড়ে। হাসির কল্লোলে জেগে ওঠে চারিপাশ। সবাই মিলে দোষারোপ করে কামিনীকে। বলে, ‘কই পারলা? তোমার ক্ষেমতা নাই?’
কামিনী জ্বলে ওঠে। ‘দেখো, তোমরা এ সব বইলো না। তোমারাও কেউ পারো নাই।’
‘হ!’
আর চার রমণী মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে। সবাই বিফল!
‘কিন্তু কামিনী বিফল এ কথা মানা যায় না। তুমি জগৎ পুজ্য। ধারণ করে আছো- শত রসরঙ্গ। তোমারে সবাই লালন করে বুকে, চোখে চিত্তে। আর তুমিই কিনা...’
হাসি আর হাসি। ছলকে ছলকে হাসি। পঞ্চকন্যা হেসে কুটি কুটি।
‘বিফলে পয়সা ফেরত। কহে সাঁই নিরঞ্জন।’
‘জননী, তোমার বসত কই?’
‘কইয়া কী হইব, কন?’
‘তারপরেও নাম ধাম না জানলে মাইনষে শুধাইলে কমু কী?’
‘যা মুখে আসে কইয়া দিয়েন।’
‘কলঙ্ক পাইছো?’
‘হ’
লাজ-রক্তিম তার গালের আভা।
‘কত দূরে গেছে? যায় নাই। ঘুরে আশে পাশে। বেবাক মোরা ঘুরতে আছি। লাটিমের ঘোরা একদিন সাঙ্গ হবে। রসের খেলা ভাঙবে। সন্ধ্যা যখন হবে ফিরতে হবে নীড়ে।’
‘কী কন গুরু? কিছুই বুঝি না।’
‘আরে পাগল, আমরা সবাই কী আর বুঝি, সাঁই আমার কখন খেলে কোন খেলা।’
আশ্রমের মতো। কিন্তু আশ্রম নয়। প্রথমে ভেবেছিলেন ঠাঁই দেবেন কিনা। সংশয় চিত্তের ওপর হঠাৎ হলো ক্রোধ। বলে কি বিপন্ন মানবী। অবেলায়- অসময়ে যাবে কই? মানুষ হয়ে মানুষেরই অপমান। সহ্য হয়? প্রাণে নাহি সয়। আগ-পিছ আর ভাবা দায়। নিরঞ্জনের কোলে নিল ঠাঁই।
তারপর কামিনী বার বার উসলায়। নিরঞ্জন হাসে। বড় স্বর্গীয় সে হাসি। বলে, এই অধমের আরো পরীক্ষা আছে বাকি!
কামিনী কয়, ‘গুরু চাইখা দেখো না মধু। বিফল অলি বোঝে নাকি কিছু। কী আছে ধরাধামে? যদি নাই পেলে মানবীর বন্ধন।’
নিরঞ্জন হাসে। কামিনী শঙ্কায়। থাকে না বুঝি মান। এই বুঝি গেল সব। কী হবে তয় মিছেই নাম নিয়ে। নিরঞ্জন এক দুগ্ধপোষ্য শিশু। ভোলাবোই তারে আমি কামে। জর্জর করবো সর্ব অঙ্গ। সে বেদনা রাখতে কোথাও নারে। আমি জন্ম নিয়েছি মদনেরই ঘরে।
নিরঞ্জন হাসে। এই দেহে নাই ওসব কিছু। ছাইড়া দিছে অনেক আগে। রাতের পর দিন চক্রাকারে ঘোরে। মানবজমিন রইলো পতিত, আবাদ করলে ফলতো সোনা। সবাই আবাদ করে না। কেউ করে গৃহে। কেউ ফেরে দ্বারে। কেউ গুহাবাসী। আর কেউ ভ্রমিয়া বেড়ায় তারে। বাড়ির পাশে আরশিনগর মিছেই খোঁজো পড়শিনগর। পরশি তোমার বসত করে, দুই চক্ষে চেনো তারে, হৃদয় মাঝে যতন করে লুকাও তুমি কোন কাননে? ক্যান এতো লুকোচুরি? সাধের রঙমহলে বইসা তুমি আর কী অঘটন ঘটাইতে চাও?
‘গুরু শেষ দেখতে চাই।’
‘শেষ ত কবেই দেইখা ফেলাইছো। আবার কেনো বৃথা চেষ্টা করো।’
‘পুন-পুন চেষ্টায় পুরে মনোরথ।’
‘হ কামিনী। লাইগা থাক। যদি পারো তয় এ মাটির দেহ করিব ছারখার। নিমিষেই মিশাইবো ধূলির মাঝার।’
‘বিফলে পয়সা ফেরৎ, কহে সাঁই নিরঞ্জন। হা হা হা...’
গুরুর মুখের দিকে তাকিয়েছিল তরু। সবাই বলে তারে সাঁই। এই কামিনী কয় তারে গুরু। লাজ-রক্ত হইছে কন্যার প্রথম যৌবন। কূলে ঠাঁই মিলে নাই। যৌবন কলঙ্ক করে ভালে দিছে টিপ। বোঝে নাই, অবোধ। এখনো কি বোঝে? যে বোঝে সে পরথমেই বোঝে। আর যে বোঝে না সে শত চড়েও রা করে না। নদীর কূলে পইড়া ছিলো। ভোরে নিরঞ্জনের পথে সাক্ষাৎ। কামিনী বোঝায় তারে, হবে সম্পদ নিজের।
নিরঞ্জন কহে, বাজে বাহাস করো কেনো? বিপন্ন মানবী। বিপদ কেটে গেলে চলে যাবে আপন পথে।
কামিনী হাসে। ভেতরে ভেতরে জ্বলে। ‘তোমারে দিব জনমের শিক্ষা। লইছো জনম যেভাবে, তারেই করো অবহেলা? এতোদূর... কিসের এতো দেমাগ তোমার। প্রভু ওই মাটির ঢেলার মইধ্যে দেয় নাই বুঝি, কোন কাম, লালসা, ক্রোধ...? সব নারীদের কইতে হবে মা? ক্যান এই ভণ্ডামি? শরীরে অসুখ নাকি, নাকি খোজা?’
‘আইচ্ছা আমারে নিস্তার দেওন যায় না! আমারে নিয়া ক্যান টানাটানি। আমি একলা নিভৃতে থাকতে চাই, থাকবার দে। তা না হুদা কামড়া-কামড়ি।’
নদীর কিনার স্পষ্ট। বক্ষে নদীর মহাজনী নাও। কূলে বসে সাধুসন্তর দল। মগ্ন থাকে ধ্যানে কিংবা আহরণ করে জ্ঞান। ছনের ছাওয়া কুটির। এক দুইটা না। পাঁচ পাঁচটা। নিরঞ্জনের বসবাস বছর দশেক। ভাটির দেশের মানুষ। বনজঙ্গল সাফ-সুতরো করেছে। আস্তে আস্তে মানুষ আসতে শুরু করেছে। পায়ে চলা কোনো পথ নেই। আসে সব নৌকায় চড়ে। আসার সময় চাল ডাল নিয়ে আসে। কখনো রান্না হয় কখনো হয় না। আশ্রমের চারপাশে গাছের সারি। আম, বট, পাকুর যেমনি আছে, তেমনি আছে নানা স্বাদের ফল। বারো মাস ফল থাকে গাছে। আশ্রমে যারা আসে তারা খায় আর কাওয়্যা কুলি খায়। নিরঞ্জন কয়েকদিন পর দু’ এক লোকমা মুখে তুলে। নচেৎ নয়। সব মিলিয়ে এ আশ্রমে তিন রমণীর আবাস। তন্মধ্যে তরুই যুবতী। আর দু’জনের চামড়ায় যথেষ্ট ভাঁজ পড়েছে। যৌবন কখন অস্ত গেছে বের করা দুষ্কর। সে অনুপাতে নবীন সন্যাসিনী তরুর ভার বহন করা এ আশ্রমের জন্য কষ্টকর। ওর মর মর অবস্থা দু’ দিনেই কেটে গেছে। সেখানে এখন আগুনের লাল শিখা দগদগ করে। পুরুষ পতঙ্গ না হয়ে পারে? তবে আশার কথা, সেরকম পুরুষ এখানে কেউ নেই।
নিরঞ্জনকে দিয়ে কখনই কারো ক্ষতি হবে না। সে কথাই নিরঞ্জন বলে। শ্রোতা তরু, আর আশ্রমের কয়েকজন প্রবীণ সন্ন্যাসী।
‘কি কব আমার কষ্টের কাহিনী। কওয়া যায় না। সওয়া যায় না। মনে পড়লেই গা গুলায়। শরীর, মন উভয়েই গোস্বা করে। গণ্ডগোলের বছর। আমার বয়স দশ কি বারো। আমাগো গ্রামে পাকবাহিনী আসে নাই। পাশের গেরাম জইলা পুইড়া ছাড়খার। জলার ধারে কত লাশ। কে, কারে কব্বর দেয়? নিজেরে নিয়াই টানাটানি। এই দুর্দিনেই অনেকে সাহায্য করছে। যে যেভাবে পারছে আগলাইয়া রাখছে। ধর্ম নিয়া সবাই মাথা ঘামায় নাই। সময় দুর্দিন, হেইডাই আসল কথা। কিন্তু মানুষের ভিতরে তো পশু আছে। হগলে তো আর চাপাইয়া রাখতে পারে না। পশুরা যে যার ইচ্ছা পূরণে ছুটতাছে। একদিন আমাগো গেরামেও আইলো। ডরে হগলে জঙ্গলে পলাইছি। বাড়ি ঘর পুইড়া শেষ। কে য্যান খবরডা লাগাইয়া দিছে। সাথে নিয়াও আসছে। গরুর পাল যেমন কইরা খেদাইয়া নিয়া যায় তেমনে আমাগো খেদাইয়া বাইর করলো। নদীর পাড়ে লাইন দিলো। জোয়ান বেটি গুলানরে রাইখা দিল। তার ভিতরে আমার মাও আছিলো। এরপরে নদীর পাড়ের মানুষগুলানরে গুলি করলো। আমি ডরেই আধমরা হইয়া গেছিলাম। রক্তের ভিতর পইরা আছিলাম। বুঝি নাই বাঁইচা রইছি। সময় গেলেও দেখলাম আমি মরতাছি না। তহন নদী পাড়ের আরেক ঘটনা আমারে বোবা বানাইয়া দিল। আমার চোখের সামনে আমার মারে ওরা... মা আরো কয়েকজন চিল্লাচিল্লি করলো কিছুই হইলো না। তারপর সব যহন শেষ হইয়া গেল তহনও আমি বুঝি নাই আমি যে বাইচা রইছি। রাত যহন আন্ধারে তলাইয়া গেল তহন আস্তে আস্তে রক্তের ভেতর থাইকা উইঠা আইলাম। বাড়ির পথে অনেক কষ্টে পা বাড়াইলাম। এই গেরামে কেউ বুঝি বাইচা নাই। কারণ একটা শেয়াল কুত্তা কিছুই আমার সামনে পড়লো না। বাড়ির দিকে গেলাম। যাইয়া দেহি ঘরের দরজা খোলা। আমার মা ঘরের তীরের সঙ্গে ঝুলতাছে। মা আমার মইরা গেল। আমার আর কেউ থাকলো না।’
তরু চোখ মোছে। নিরঞ্জন মৃত মায়ের উদ্দেশ্যে প্রণাম ঠোঁকে। তরুর মমতাময়ী চোখে নিরঞ্জনের জন্য মমতা। পারলে সারাক্ষণ তারে চোখে চোখে রাখে। কিন্তু আশ্রমে অনেক কাজ। সব দায়িত্ব সে নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে। কখনো দেখা যায় গোঁসাইদের সঙ্গে আলোচনা করছে। কখনো দেখা যায়- মুরগির খাবার দিচ্ছে। আবার দেখা যায় সবজির বাগানে আগাছা পরিষ্কার করছে। এভাবেই তিনি দিনমান ব্যস্ত থাকেন।
সে রাতে পঞ্চ রমণীর মিটিং চূড়ান্ত হয়। নিরঞ্জনের অগ্নিপরীক্ষা। সমূহ বিপদে পড়বে সে। সন্দেহের ইঙ্গিত থাকবে ওর দিকে। উঠে আসে হার্মাদদল। রাতের অন্ধকারে মশালের আলোয় খুঁজে নেয় যুবতী নারীদেহ। কোথাও কোনো শব্দ হয় না। কোথাও কোন নড়চড় হয় না। শুধু তরুর মৃত দেহ পড়ে থাকে নদীর চরায়। গোঁসাই গোবিন্দ প্রশ্ন তোলে- ‘নিরঞ্জন লোভ সামলাতে পারলে না?’
মাথা নিচু করে চুপ মেরে থাকে সে। কিভাবে বোঝাবে, কাকে বলবে, কে বিশ্বাস করবে?
যুবতীর মৃত দেহ তাকে একেবারে বিদ্ধ করে দিয়েছে।
পঞ্চ রমণীর হাসি আর ধরে না। হাসতে থাকে তারা। মানুষের অসহায় অবস্থা দেখে তারা এভাবে হাসে।
বাংলাদেশ সময়: ১৭৪০ ঘণ্টা, ০৩ অক্টোবর, ২০১২
সম্পাদনা: এম জে ফেরদৌস mjferdous0@gmail.com