৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২০, সোমবার মে ২০, ২০১৩ ৭:০৫ পিএম BDST banglanew24
16 Jul 2012   03:55:40 PM   Monday BdST
E-mail this

দুই প্রশ্নে সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে ৭ম সাক্ষীর জেরা শেষ


চিফ ল’ করসেপন্ডেন্ট
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
দুই প্রশ্নে সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে ৭ম সাক্ষীর জেরা শেষ

ঢাকা: মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের ৭ম সাক্ষী আব্বাস উদ্দিন আহম্মেদের সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা সম্পন্ন হয়েছে। সাক চৌধুরীর বিরুদ্ধে ৮ম সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ করা হবে আগামী ২৩ জুলাই।

সোমবার দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে-১ সাক্ষ্য দেন আব্বাস চেয়ারম্যান নামে পরিচিত আব্বাস উদ্দিন আহম্মেদ। চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হকের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য শেষে তাকে জেরা করেন সাকা চৌধুরীর আইনজীবী অ্যাডভোকেট আহসানুল হক হেনা।

মাত্র দু’টি প্রশ্নে সাক্ষীর জেরা সম্পন্ন হয়। ট্রাইব্যুনালে এতো স্বল্প সময়ের মধ্যে কোনো সাক্ষীর জেরা সম্পন্ন হওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম।  
 
৬২ বছর বয়স্ক ৭ম সাক্ষী আব্বাস চেয়ারম্যান চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার পূর্ব গুজুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। আব্বাস উদ্দিন আহম্মেদ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১ সালের ১৩ এপ্রিল রাউজানের বিভিন্ন হিন্দু অধ্যুষিত গ্রামে গণহত্যা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ইত্যাদির বর্ণনা দেন। তাকে সাক্ষ্য দানে সহায়তা করেন রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম।

সাক্ষী বলেন, ‘‘একাত্তরে আমার বয়স ছিল ২০/২১ বছর। আমি সে সময় চট্টগ্রাম সরকারি কলেজের ১ম বর্ষের ছাত্র। থাকতাম রাউজানের উনসত্তরপাড়ার নিজ গ্রামের বাড়িতে। উনসত্তরপাড়া গ্রামটি ছিল হিন্দু অধ্যুষিত। আমরা ৫/৬টি মুসলিম পরিবার ছিলাম। আমরা হিন্দুদের সঙ্গে মিলে মিশে থাকতাম।’’

উনসত্তরপাড়া গ্রামের যুবকরাসহ আবাল, বৃদ্ধ বণিতা সকলেই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে কাজ করতেন বলেও জানান সাক্ষী।

তিনি জানান, ‘‘উনসত্তরপাড়ার গৌরিশঙ্কর হাটের দক্ষিণ পাশে একটি বটগাছ ছিল। আমরা সেখানে চেকপোস্ট বসিয়েছিলাম। রাস্তাটি দিয়ে যেসব গাড়ি চলাচল করতো ওই চেকপোস্টে সেগুলোতে চেক করা হতো। এভাবে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে আমরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলাম।’’

তিনি জানান, ‘‘একাত্তরের ১১ এপ্রিল দুপুর তিনটার দিকে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগ প্রধান ফজলুল কাদের চৌধুরী সপরিবারে একটি ভক্সওয়াগনে চড়ে ওই রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন। আমরা চেকপোস্টে গাড়িটিকে থামাই। তাদেরকে নামতে বলায় সকলেই প্রচণ্ড উত্তেজিত হয়ে পড়েন। ফজলুল কাদের চৌধুরীর ৩ ছেলেসহ অন্যান্যরা রাগারাগি করে চলে যান।’’

এ সময় প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম সাক্ষীকে বলেন, ওই গাড়িতে কারা ছিলেন? জবাবে সাক্ষী বলেন, “ওই গাড়িতে ফজলুল কাদের চৌধুরীর ছেলে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীসহ পরিবারের সদস্যরা ছিলেন।”

আব্বাস চেয়ারম্যান জানান, ‘‘১২ এপ্রিল চট্টগ্রাম ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী দখল করে নেয়। এদিন আমাদের গ্রামসহ আশপাশের গ্রাম থেকে অনেক হিন্দু ভয়ে পালিয়ে যান।’’

‘‘পাহাড়তলী ইউপি চেয়ারম্যান সাহেব উনসত্তর পাড়ায় এসে ডা. নিরঞ্জন দত্তগুপ্তকে বলেন, গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়া হিন্দুদের গ্রামে ফিরে আসতে বলুন। ডা. নিরঞ্জন দত্তগুপ্ত এর পর তাদের ফিরে আসতে বলায় পালিয়ে যাওয়া হিন্দুরা গ্রামে ফিরে আসেন।’’

‘‘ডা. নিরঞ্জন দত্তগুপ্তের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক থাকায় আমি এ ঘটনা তার কাছ থেকে জানতে পারি’’ বলে উল্লেখ করেন সাক্ষী।

তিনি জানান, পরদিন ১৩ এপ্রিল দুপুরের খাবারের পর পেয়ারা মিয়া, মুফতুল ও বার্মা ইউসুফসহ কয়েকজন গ্রামে এসে সবাইকে গ্রামের ক্ষিতিশ মহাজনের বাড়িতে যেতে বলে। তারা গ্রামবাসীকে বলে, ‘‘আমাদের নেতা আপনাদের সঙ্গে কথা বলবেন।’’

তার নিজ গ্রাম উনসত্তরপাড়ার গণহত্যা সম্পর্কে আব্বাস চেয়ারম্যান ট্রাইব্যুনালে বলেন, ‘‘১৩ এপ্রিল আসরের নামাজের পর আমার বন্ধু বাবুল মালি এসে আমাকে খবর দেন, উনসত্তরপাড়ার হিন্দুদের গ্রামের ক্ষিতিশ মহাজনের বাড়িতে ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। খবর পেয়ে আমি ও বাবুল মালি ওই বাড়ির দিকে রওনা হই। পথে দেখলাম, গ্রামের রাস্তা দিয়ে দুই-তিনটি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গাড়ি যাচ্ছিল।’’

‘‘এর পর বাবুল মালিকে বললাম, আমি আমার পুরোনো বাড়িতে চলে যাচ্ছি। তুমি তোমার বাড়িতে চলে যাও। আমরা দু’জনে দৌঁড়াতে শুরু করলাম। আনুমানিক দুইশ’ গজ যাওয়ার পর ব্রাশফায়ারের শব্দ শুনে পেছনে ফিরে দেখলাম, বাবুল মালি রাস্তায় পড়ে আছেন। গ্রামের লোকজনও এদিক সেদিকে দৌঁড়ে পালাচ্ছিলেন। পাকিস্তানি সেনাদের গুলির হাত থেকে কোনোমতে বেঁচে গিয়ে আমি পালিয়ে চলে এলাম।’’

‘‘পরে শুনলাম, গ্রামের অনেক মানুষকে মেরে ফেলা হয়েছে। পরদিন শুনতে পেলাম, তার কথায় হিন্দুরা ফিরে এসে গণহত্যার শিকার হওয়ার গ্লানিতে ডা. নিরঞ্জন দত্তগুপ্ত আত্মহত্যা করেছেন।’’

সাক্ষী বলেন, ‘‘পরদিন সকালে উসত্তরপাড়ায় ফেরার পথে প্রথমেই রাস্তায় বাবুল মালির লাশ দেখতে পেলাম। এর একশ’ গজ দূরে তার বাবার লাশও পড়ে থাকতে দেখলাম। এর পর ক্ষিতিশ মহাজনের বাড়িতে গিয়ে ৬০/৭০টি লাশ দেখতে পাই। ঘরের ভেতরে গিয়ে দেখলাম, দু’জন গর্ভবতী মায়ের গর্ভের বাচ্চা অর্ধেক বের হয়ে আছে। পাশে একটি গর্ত ছিল। তার ভেতরে লাশগুলো মাটিচাপা দেই।’’

এ পর্যায়ে ‘রাজাকার পেয়ারা-বার্মা ইউসুফরা যে, আমাদের নেতা সকলকে ডাকছেন বলে হিন্দুদের ক্ষিতিশ মহাজনের বাড়িতে এক জায়গায় জড়ো করেছিল, সে নেতার নাম কি জানতে পেরেছিলেন’ এমন প্রশ্নের জবাবে সাক্ষী বলেন, গ্রামবাসী তাকে জানান যে, উনসত্তরপাড়া ছাড়াও আরো কয়েকটি হিন্দু অধ্যুষিত গ্রামে সেদিন গণহত্যা চালিয়েছিল পাকিস্তানি সেনারা। এর মধ্যে জগৎমল্লপাড়া, কুন্ডেশ্বরী ইত্যাদি। গ্রামের লোকজন সেনাবাহিনীকে দেখেছেন বলেও জানান।

প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম তাকে আরো প্রশ্ন করেন, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে এ দেশীয় কাউকে গণহত্যা চালাতে দেখেননি? উত্তরে আব্বাস চেয়ারম্যান বলেন, ‘‘সবাই বলাবলি করতেন, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী পাকিস্তানি সৈন্যদের নেতৃত্ব দিয়ে গণহত্যা চালিয়েছেন। তবে আমি নিজেরে চোখে তাকে দেখিনি।’’

আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আহসানুল হক হেনা সাক্ষ্য শেষে সাক্ষী আব্বাস চেয়ারম্যানকে দু’টি প্রশ্ন করে তার জেরা সম্পনান করেন। হেনা প্রশ্ন দু’টিতে মতামত দেন যে, ১১ এপ্রিল ফজলুল কাদের চৌধুরী সপরিবারের গাড়ি নিয়ে যাওয়ার সময় বাধা পেয়ে চেচামেচি করার যে ঘটনা সাক্ষী বলেছেন তা সত্য নয়। এছাড়া গ্রামবাসী তাকে যে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী গণহত্যায় জড়িত বলে জানিয়েছিলেন, তাও সত্য নয়। প্রশ্ন দুটির জবাবে আসামিপক্ষের আইনজীবীর কথা সত্য নয় বলে জানান সাক্ষী।
 

উল্লেখ্য, সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে গত ১৪ মে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরুর পর আব্বাস চেয়ারম্যান ছাড়াও এ পর্যন্ত বাংলা একাডেমির সভাপতি বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. আনিসুজ্জামান, চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী সলিমুল্লাহ, মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম সিরু বাঙালি, শহীদ নূতন চন্দ্র সিংহের ভাতিজা গৌরাঙ্গ সিংহ ও পুত্র প্রফুল্ল রঞ্জন সিংহ এবং শহীদ পরিবারের সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট নির্মল চন্দ্র শর্মা সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাদের জেরাও সম্পন্ন করেছেন আসামিপক্ষ।

প্রথম ৫ জন সাক্ষী প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ানে সাকার বিরুদ্ধে হত্যা, গণহত্যাসহ মানবতাবিরোধী নানা অভিযোগ তুলে ধরলেও প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগী হিসেবে সাক্ষ্য দেন অ্যাডভোকেট নির্মল চন্দ্র শর্মা।

উল্লেখ্য, ২০১০ সালের ২৬ জুন হরতালের আগের রাতে রাজধানীর মগবাজার এলাকায় গাড়ি ভাঙচুর ও গাড়ি পোড়ানোর অভিযোগে সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে রমনা থানায় মামলা দায়ের করা হয়। ওই মামলায়ই সে বছরের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের প্রত্যুষে গ্রেফতার করা হয় তাকে। ১৯ ডিসেম্বর একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয় তাকে। পরে ৩০ ডিসেম্বর আদালতের নির্দেশে প্রথমবারের মতো সাকা চৌধুরীকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।

একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ২০১১ সালের ৩ অক্টোবর তার বিরুদ্ধে অগ্রগতি তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে তদন্ত দল। একই বছরের ১৪ নভেম্বর সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়। ১৮ নভেম্বর তার বিরুদ্ধে এ আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র গ্রহণ করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

৫৫ পৃষ্ঠার আনুষ্ঠানিক অভিযোগের সঙ্গে এক হাজার ২৭৫ পৃষ্ঠার আনুষঙ্গিক নথিপত্র এবং ১৮টি সিডি ট্রাইব্যুনালে জমা দেয় প্রসিকিউশন।

৪ এপ্রিল সাকার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল। এতে তার বিরুদ্ধে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় ২৩টি মানবতাবিরোধী অপরাধের উল্লেখ করা হয়। যার মধ্যে রয়েছে গণহত্যা, হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ করে গুডস হিলে নির্যাতন, দেশান্তরে বাধ্য করা, অগ্নিসংযোগসহ বিভিন্ন অপরাধ। ৩ মে ও ৭ মে রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্য (ওপেনিং স্টেটম্যান) উপস্থাপন সম্পন্ন করার মাধ্যমে শুরু হয় সাকা চৌধুরীর বিচার।

বাংলাদেশ সময়: ১৫৫০ ঘণ্টা, জুলাই ১৬, ২০১২
জেএ/সম্পাদনা : অশোকেশ রায়, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Bookmark and Share
REVE Systems
VISA Center Inc
Holy Hajj BD
RehabHousing.com

জাতীয়

8877
Kaspersky Lab - Antivirus Software [ Bangladesh ]
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম | এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

ফোন: +৮৮০ ২ ৮৪০২১৮১, ৮৪০২১৮২ আই.পি. ফোন: +৮৮০-৯৬১২১২০০০০ নিউজ রুম সেল: +৮৮-০১৭২৯০৭৬৯৯৬, ০১৭২৯০৭৬৯৯৯ ফ্যাক্স: +৮৮০ ২ ৮৪০ ২৩৪৬
ইমেইল: news.bn24@gmail.com, editor.banglanews@gmail.com, editor@banglanews24.com    বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম    এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

বাংলায় লেখা হলে ইউনিকোডে পরিবর্তন করে ইমেইল করুন    কপিরাইট © 2013 সকল স্বত্ব ® সংরক্ষিত    একটি ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেড প্রতিষ্ঠান