 |
| ছবি: জীবন আমীর /বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম |
ঢাকা: পুরান ঢাকার স্বামীবাগ থেকে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণ ভাবনামৃত সংঘের (ইসকন) উদ্যোগে রাজধানীর সবচেয়ে বড় রথযাত্রাটি ঢাকেশ্বরী মন্দিরে পৌঁছেছে।
বৃহস্পতিবার বিকেলে সারা দেশে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা শুরু করেছেন তাদের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব শ্রী শ্রী জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা। প্রতিবারের মতো এবারো দেশের সবচেয়ে বড় রথযাত্রাটি বের করা হয় ঢাকার ধামরাইয়ে।
আর রাজধানীর সবচেয়ে বড় রথযাত্রাটি বের হয় স্বামীবাগের আশ্রম থেকে। চার চাকাবিশিষ্ট তিনটি রথ ছিল এ যাত্রায়। প্রতিটি রথকেই রং-বেরংয়ের কাপড়, নানা রংয়ের ফুল, ফুলের মালা আর বাহারি পাতা দিয়ে সাজানো হয়েছিল । প্রায় ৩০ ফুট উঁচু এ রথগুলোকে টেনে নিয়ে গেছেন ধর্মভীরু ভক্তরা।
স্বামীবাগের ইসকন মন্দির থেকে বিকাল ৩টায় আনুষ্ঠানিকভাবে শোভাযাত্রা শুরু হয়। বিকেল ৫টা ১৯ মিনিটে রথের র্যালির সামনের অংশটি ঢাকেশ্বরী মন্দিরে প্রবেশ করে।
স্বামীবাগ থেকে ঢাকেশ্বরী পর্যন্ত পুরো পথটাই পুলিশি প্রহরায় পৌঁছে। সামনে পিছনে পুলিশের গাড়ি, মোটরসাইকেলের বহর ও মোড়ে মোড়ে ট্রাফিক পুলিশ রথের র্যালিকে বিনা বাধায় যাবার ব্যবস্থা করে।
স্বামীবাগ থেকে বের হওয়া রথটি টিকাটুলী, শাপলা চত্ত্বর, দৈনিক বাংলা, দোয়েল চত্ত্বর, জগন্নাথ হল, শহীদ মিনার ও পলাশী হয়ে রথের র্যালিটি পেঁৗছে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে।
তবে ইত্তেফাক মোড়, দৈনিক বাংলার মোড়, পল্টন মোড় ও হাইকোর্ট মোড়ে কিছু সময়ের জন্য যানজট দেখা দেয়।
এর আগে সকালে স্বামীবাগে বিশ্বশান্তি ও মঙ্গল কামনায় অগ্নিহোত্র যজ্ঞের মাধ্যমে এ রথ উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। আর রথযাত্রা শুরুর আগে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা । যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাংস্কৃতিক বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী প্রমোদ মানকিনসহ বিশিষ্ট অতিথিরা এতে উপস্থিত ছিলেন।
হিন্দু ধর্মমতে, শ্রী শ্রী জগন্নাথ দেব হলেন জগতের নাথ বা অধীশ্বর। তার অনুগ্রহ পেলে মানুষের মুক্তিলাভ হয়। জীবরূপে তাকে আর জন্ম নিতে হয় না। এ বিশ্বাস থেকেই রথের ওপর জগন্নাথ দেবের প্রতিমা রেখে রথযাত্রা করেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। শুরুর নয় দিনের মাথায় উল্টো রথযাত্রার মাধ্যমে একই পথে ফিরে আসে রথটি।
আত্নার শান্তির জন্য হৃদয়ের শুদ্ধতা দিয়ে নানা ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদির মাধ্যমে বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব পালন করেন মানুষ। এমনই ধর্মীয় একটি আনন্দ উৎসব রথযাত্রা। হিন্দু ধর্ম ও সংস্কৃতির আদি পর্ব থেকেই এর প্রচলন। সত্যযুগ থেকে শুরু হয়ে বর্তমান কলিযুগের একুশ শতকে এসেও নানা আকারে, নানা বৈচিত্র্যে চলে আসছে উৎসবটি। বাঙালি সংস্কৃতিতে সব ধর্মের সহাবস্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশে উৎসবমুখরভাবে রথযাত্রা উদযাপন করা হয়।
উল্লেখ্য, রথযাত্রার সাধারণ অর্থ হলো ‘রথে আরোহণ করে অন্যত্র গমন।’ সময়ের ধারাবাহিকতায় উপাস্য দেব-দেবীদের কোনো বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ লীলা অথবা কোনো মহামানবের স্মরণীয় ঘটনাকে উৎসস্বরূপ গ্রহণ করে চলে আসছে এ রথযাত্রা। বিভিন্ন পুরাণে বিভিন্ন দেব-দেবীর রথযাত্রারও উল্লেখ আছে।
আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘের আয়োজনে (ইসকন) এখন বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী পালিত হয়ে আসছে জগন্নাথ দেবের এ রথযাত্রাটি ।
আষাঢ় মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতে শুরু আর একাদশী তিথিতে হয় প্রত্যাবর্তন বা ফিরতি রথ। অর্থাৎ প্রথম দিন রথটি যেখান থেকে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়, নয়দিন পর আবার সেখানে এনে রাখা হয়। একেই বলে উল্টোরথ। ঠিক নয় দিনের মাথায় ২৯ জুন হবে এবারের উল্টো রথযাত্রা। ওই দিন বিকালে একই পথে রথটি ফিরে যাবে স্বামীবাগে।
ইসকন বাংলাদেশের যুগ্ম-সম্পাদক জগৎগুরু গৌরাঙ্গদাস বলেন, ‘‘রথযাত্রার র্যালিতে প্রতিবছরই লক্ষাধিক লোকের সমাবেশ ঘটে। জগতের নাথ বা অধীশ্বর যিনি, তিনিই জগন্নাথ। তিনি গৌর, আবার তিনিই শ্রীকৃষ্ণ। তার অনুগ্রহ পেলেই মানুষের মুক্তি লাভ হয় বলেই আমাদের বিশ্বাস। তাই মুক্তিকামী মানুষ তার কৃপা প্রার্থনা করেই রথযাত্রার অনুষ্ঠান পালন করে থাকে। প্রতি বছরেই তাই র্যালিতে মানুষ বাড়ে।’’
নিখিলেশ নামের এক রথের রশি টানা যুবক বাংলানউজকে বলেন, রথের রশি টানার জন্য ভক্তদের মধ্যে ছিল প্রতিযোগিতা থাকে। স্বর্গীয় সুখ লাভের জন্য কে কাকে সরিয়ে রশি ধরবেন, সে প্রতিযোগিতাও ছিল সবার মাঝে।
দেখা গেছে, অনেকে আবার ইহলৌকিক ও পারলৌকিক বাসনা পূরণের জন্য এ ভিড় ঠেলেই রথের কাছে গিয়ে টাকা, ধান, দূর্বা, বেলপাতা, তুলসী পাতা, ফুল ও কলা ছুড়ে মেরেছেন রথের ভেতরে। কেউ আবার পুরোহিতের হাতে তুলে দিয়েছেন এসব ভোগ।
স্বামীবাগ আশ্রমের সহ-সভাপতি পতিত উদ্ধারণ দাস ব্রহ্মচারী বলেন, সর্বস্তরের মানুষের আনন্দের জন্য ও উৎসবমুখর পরিবেশ রাখতে এ মেলার আয়োজন করা হয়। রথযাত্রার মাধ্যমে সবার মঙ্গল কামনা করা হয়।
রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে ইসকন ৯ দিনব্যাপী উৎসবের আয়োজন করেছে। এর অংশ হিসেবে স্বামীবাগ আশ্রমে প্রতিদিন ধর্মীয় আলোচনা, ভক্তিমূলক বাউল গান, হোমযজ্ঞ, পদাবলী কীর্তন, ভজন কীর্তন, বৈদিক নৃত্য, গীতিনাট্য, ধর্মীয় নাটক ও শোভাযাত্রাসহ বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
এ উৎসব উপলক্ষে ইসকনের চারপাশে ও স্বামীবাগের বিভিন্ন রাস্তায় মেলা বসেছে।মেলায় ধর্মীয় বই, সিডি-ভিসিডি, বিভিন্ন আকারের মূর্তি, নানা ধরনের খাবার, মালা, কলম, চাবির রিং, প্রসাদন সামগ্রী পাওয়া যাচ্ছে। মেলা চলবে ২৯ জুন পর্যন্ত।
দিনটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধী দলীয় নেতা খালেদা জিয়া সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ সময় : ১৭২৭ ঘণ্টা, জুন ২১, ২০১২
এমআইআর/ সম্পাদনা : অশোকেশ রায়, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর