 |
আজকের এ ব্যস্ত পৃথিবীর নগরজীবনে মা-বাবার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কেমন যেন আনুষ্ঠানিক হয়ে যাচ্ছে। কর্মজীবী সন্তান সকালে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়, ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা।
কর্মস্থল থেকে ফিরে এসে ক্লান্ত শরীরে দু’মুঠো খেয়ে হয়তো টিভির সামনে কিছুক্ষণ নয়তো বিছানায় গা এলিয়ে দেওয়া, পরদিন আবার অফিস, আবার কর্মব্যস্ততা। সপ্তাহের ছুটির দিন ছাড়া গ্রামে থাকা বুড়ো বাবার সঙ্গে কথা বলা হয়না অনেকেরই।
অথচ এ কৃতী সন্তানের আজ যে এতো ব্যস্ততা ও কর্মযজ্ঞ, শিক্ষা-দীক্ষা এবং শহুরে জীবনের পেছনে যে মানুষটির ঘামঝরা শ্রম রয়েছে, সেই মানুষটি হচ্ছেন ‘বাবা’।
পৃথিবীতে বাবা এমন এক ব্যক্তি যিনি প্রতিনিয়ত প্রার্থনা করতে থাকেন, হে আল্লাহ! তুমি ধনে-মানে-জ্ঞানে আমার চেয়ে আমার সন্তানকে বড় করে দাও। নিজের চেয়ে অন্যের জন্য এমন নিঃস্বার্থ প্রার্থনা বাবা ছাড়া আর কেউ কি করেন। সন্তানের জন্মের পর থেকে বাবা নিজেকে নিঃশেষ করে আলোকিত করেন সন্তানের অনাগত ভবিষ্যতের পথচলাকে, সামান্য কিছুর বায়না থেকে শুরু করে জীবনের পদে পদে বিপদের ওই একটিই তো আশ্রয়স্থল আমাদের?
হাদিসে রয়েছে, হযরত আবু দাউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমার বাবা তোমার জান্নাতের মধ্যবর্তী একটি দরজা। জান্নাতের এ দরজাটির সংরক্ষণ কিংবা বিনষ্ট করা তোমার হাতে। অর্থাৎ, বাবার অবাধ্যতা করে জান্নাতের দরজা বন্ধ করে দিওনা।’ (তিরমিযী শরীফ)
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ পাক বারবার তাগিদ দিয়েছেন মা-বাবার সঙ্গে সদাচারণ করতে, তাদের সন্তুষ্টি অর্জনে নিজেকে বিলিয়ে দিতে।
একজন সন্তানের জন্য প্রথম অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব হচ্ছেন তার বাবা। বাবার হাঁটাচলা, ব্যবহার ও কথা বলা, লেনদেন এবং তার নির্দেশনা সন্তানের মনে গেঁথে থাকে জীবনভর। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের ক’জন বাবা তাদের সন্তানের কাছে এমন আদর্শ হয়ে নিজেকে মেলে ধরতে পেরেছেন?
প্রচণ্ড রাগ কিংবা একেবারে বেখেয়াল- এ দুইয়ের মাঝামাঝি থেকে সন্তানের পরিচর্যা ও তাকে গড়ে তুলতে পারাটাই একজন প্রকৃত বাবার পরম সাফল্য।
আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, সবচেয়ে খারাপ তো ওই ব্যক্তি যে তার পরিবারকে কুণ্ঠিত করে রাখে। সাহাবায়ে কেরাম এর ব্যাখ্যা জিজ্ঞেস করলে রাসুল (সা.) বললেন, যে ব্যক্তি ঘরে ঢুকলেই তার স্ত্রী ভয় পেয়ে যায়, তার ছেলেরা এবং চাকররা তার কাছ থেকে পালিয়ে যায়। আর যখন সে বেরিয়ে যায়, তখন তার স্ত্রীও আনন্দে হাসে, পরিবারও স্বস্তিবোধ করে। (তাবারানী)
সমাজের অনেক তরুণ বন্ধুর বিপথগামী হওয়া বা বখে যাওয়ার একটি অন্যতম কারণ বাবার সঙ্গে মনোমালিন্য। যান্ত্রিক জীবনের যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ এ সমাজে অনেক পরিবারে বাবার সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক মোটেও সুখকর নয়। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। যারা বাবা হয়েছে, তাদের ভাবতে হবে, তার এ ছোট সন্তান একদিন গৃহকর্তা হবে। কাজেই তাকে সেভাবে গড়ে তুলতে হবে স্নেহ ও শাসনের পরিমিত সংমিশ্রণে। কারণ একটি সন্তান বিপথে চলে যাওয়া মানে ভবিষ্যতের পুরো একটি পরিবার ও প্রজন্ম ধ্বংস হয়ে যাওয়া।
সন্তানকেও মনে রাখতে হবে, সে তার বাবার সঙ্গে যে ব্যবহার করবে, ভবিষ্যতে সে তেমনই ফল পাবে তার সন্তানের কাছ থেকে। হোক না বাবা গ্রামের কৃষক কিংবা শহরের ফেরিওয়ালা, বাবা হিসেবে তিনি আল্লাহ এবং তার রাসুল (সা.) এর পরবর্তী মর্যাদার অধিকারী। বাবা যখন হাত তুলে সন্তানের জন্য পরম দয়াময় আল্লাহর কাছে কিছু প্রার্থনা করেন, আসমানের সবগুলো দরজা ওই প্রার্থনার জন্য খুলে দেওয়া হয়। সরাসরি তা গিয়ে পৌঁছায় সর্ব শক্তিমান আল্লাহর কাছে।
যাদের বাবা বেঁচে আছে, এখনও আল্লাহ পাক সুযোগ দিয়ে রেখেছেন নিজের জান্নাত অর্জন করে নেওয়ার। আর যাদের বাবা আজ বেঁচে নেই, তাদেরও আল্লাহ পাক নির্দেশ দিয়েছেন মৃত বাবার জন্য নিয়মিত দুআ করে তাদের জন্য মর্যাদা প্রার্থনা করতে, পবিত্র কুরআনের আয়াত নাযিল করে আল্লাহ পাক আমাদের সে দুআটিও শিখিয়ে দিয়েছেন-রাব্বিরহামহুমা কামা রাব্বায়ানী সাগীরা (হে আল্লাহ আমার মা বাবাকে তুমি সেভাবেই দয়া ও রহমত দান করো যেভাবে তারা আমাকে ছোটবেলায় লালন পালন করেছিলেন)। এমনকি মৃত বাবার কোনো বন্ধুবান্ধব বেঁচে থাকলে তাদেরও সম্মান করতে বলেছেন রাসুল (সা.)।
জুন মাসের তৃতীয় রোববার বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বাবা দিবস। যদিও বাবার জন্য ভালোবাসা শুধু বিশেষ কোনো দিবস পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তারপরও অন্তত এ দিনটিকে উপলক্ষ করে হলেও যেন আমাদের বদ্ধ বিবেকের দ্বার খুলে যায়, সে প্রত্যাশায় এ ছোট্ট রচনা। সব স্বার্থপরতা ও যান্ত্রিক কৃত্রিমতা ভুলে গিয়ে বাবার জন্য নিবেদিত হোক আমাদের সবটুকু আবেগমাখা ভালোবাসা এবং পরম কৃতজ্ঞতা।
লেখক- কাতার করেসপন্ডেন্ট, দোহা
সম্পাদনা: শিমুল সুলতানা
মেইল (ইসলাম ডেস্ক): bn24.islam@gmail.com