 |
(দিতে পারো এনে এক’শ ফানুস
আজীবন আশ্চর্য সাধ একদিন আকাশে কিছু ফানুস উড়াই)
মানুষ কেমন করে লেখে? কি করে লেখে? লিখতে যাবার আগে করোটিতে নাকি রহস্যের বেলুন দিয়ে ঘেরা অন্তরের মাঝে স্পন্দন জাগে? শব্দের পর শব্দ কোথা থেকে জড়ো হয়? জীবনের সাথে লেখার সম্পর্ক কতটুকু? যাপনের জন্য বিশাল শব্দ রাশি নাকি জীবনের জন্য শব্দমালা? একজন মানুষের ভেতর কতগুলোন মানুষ বাস করে?
লেখালেখির সাথে সম্পৃক্ত মানুষ দায়বদ্ধতার কথা বলেন, নিজের ভেতরে আচানক অচেনা কণ্ঠস্বরের কথা বলেন। কি করে বোঝেন এরকম বোধের গল্প? হুমায়ূন প্রচলিত মানুষের মতো জীবন যাপন করতে গিয়ে যখন বলেন:
‘তারপর একদিন হঠাৎ করেই যেন একটা অচেনা কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম নিজের ভেতর। তীক্ষ্ণ একটা শূন্যবোধ স্নায়ুর শাখা বেয়ে উঠে এল চেতনার কেন্দ্রে। অন্য একটা মানুষ সজীব হয়ে উঠলো ভেতরে। জল বিল, বৃক্ষলতার কোমল খোলস ছাড়িয়ে দেশ আমার পরিণত হলো একটা নিবস্তুক আত্মিকতায়।’
হুমায়ূন আহমেদের মাঝে ‘হঠাৎ করে’ অচেনা কণ্ঠস্বর করাঘাত করলো? কোথায় করাঘাত হলো? বোধে? এই করাঘাত কি মাতৃভাষার প্রতি, বাংলাদেশের প্রতি ঋণ শোধের তাগাদা? প্রচলিত বসন, ভাষন-পদ্ধতির মাঝে কোথা থেকে এরকম তূণ নাজেল? হঠাৎ করেই? জীবন তো তার পার্থিব বস্তু সমাহার দিয়ে হুমায়ূন আহমেদকে গ্রহীতা করেছে। কোথা থেকে এলো এই কৃপাময় বোধ? “জীবন আমাকে অশেষ করেছে, ঋণী করেছে” এই সুনির্মল বোধ? তাহলে কি তাঁর কাছে জাগতিক চেতনা পরাভূত হয়েছে অলীক বোধের কাছে? যা কিছু পশ্চাদপদ, সেই অবোধকে। তিনি তো রসায়নের ছাত্র। আসলে এখানেই তীব্র মানবিক হুমায়ূন, দর্শনেরও। এখানে জয় হয়েছে জীবনের। হুমায়ূন নিমিত্ত মাত্র। রসায়ন বিজ্ঞানের সাথে সাহিত্য-দর্শনের কোন দ্বন্দ নেই। জীবনের মমতায় বিজ্ঞান তাঁকে করেছে দার্শনিক, যা কিছু ইহলৌকিক তার কাছে ঋণী, যা কিছু কল্যাণের তার কাছে তিনি ঋজু।
আমাকে সুখী করে তখনি যখন বিজ্ঞান একজন মানুষকে ঋণী করে তোলে লৌকিক ব্রাত্যতায়, মানব বন্ধনে। যা কিছু লৌকিক তা বোধের আর তাই অনুপম। আমি চমকে উঠি যখন দেখি পদার্থ বিদ্যা’র একজন ছাত্র কালো বিড়াল দেখে অমঙ্গলের আশংকায় চমকে ওঠে। আর এ কারণে হুমায়ূন আহমেদের লেখার অনেক ‘সীমাবদ্ধতা’ আমাকে ব্যথাতুর করে দিলেও আমি আপ্লুত হই তাঁর দর্শনে, তাঁর লেখায় মানুষের মুখ দেখে, আমার জননীর মতো অসহায় আমার মাতৃভূমিকে দেখে। শুধুমাত্র "তুই রাজাকার" বলার কারণে আমি তাঁকে তিনবার করতালি দেই। কৃতজ্ঞ মানুষের কৃতজ্ঞতাবোধকে কৃতজ্ঞভাবে অনুভব করি। এখানেই আমাদের স্বর্গের সর্গ। রবীন্দ্রনাথ থেকে খানিকটা উদ্ধৃতি দেয়া যেতে পারে:
‘মহাকাল নবীনকে সম্মুখে প্রকাশ করে চলেছে। মহাকালের অন্তর্গত থেকে এইভাবে পুরাণ যখন কেবলিই নবীনকে প্রকাশ করে চলে তখন তা সত্য আর যখন তার অর্থ কেবল অতীতকে পিছনে বহন করে বেড়ানো তখন সে ঘোর মিথ্যে।’
এ কারণে তাঁর লেখায় স্বরূপ, আত্মচেতনা, দর্শন, লৌকিকতা, গতি, নবীনতা ও আধুনিকতা খুঁজি। কোনো পাঠক হয়তো গল্প খুঁজে বেড়াতে পারেন। পুরাণ তো তখনি পুরাণ হয়ে যায় যখন তা কেবলি ‘পুরাণ’ ধরে রাখে। মেকি সভ্যতা তাকে আচানক শূন্য করে তোলে বলে যে সব প্রতিষ্ঠান তাঁকে প্রাতিষ্ঠানিক করে তোলে তার বাইরের দরোজায় এসে দাঁড়ান তিনি। ‘আত্মচেতনা’র কাছে নিজেকে প্রকাশ করেন, বিনয়ী দ্রাবিড় মানুষের মতো। ‘আউটসাইডার’-এর বিচ্ছিন্ন নায়কের মতো কিন্তু হাতে তুলে নেন নন-সিনিক্যাল বেহালা, আপাত ইতিহাস-বিচ্ছিন্ন মানুষের জন্য। সন্তুষ্টির দাঁড়িপাল্লায় মাপামাপি করলে এই বা কম কি।
‘মানুষ’ যেখানে প্রিয় বিষয় হয়ে ওঠে, সেখানে নতুন করে কৃতিত্ব দেয়া জরুরি নয়, প্রাসঙ্গিকও নয়। লেখকের কাছে মানুষের সমতুল্য প্রধান আর কি হতে পারে? তিনি তো আর কবিদের মতো প্রতিভার রহস্যে বসে থাকেননি। তাঁকে সামাজিক স্তর একটার পর একটা কলমের শব্দে খুলতে হয়েছে, একটু বিশদ ভাবে, ক্রমাগত ভঙ্গিতে। সাধারণ মানুষের গল্প, নিজের বিনয়ী প্রকাশ তাঁকে জনপ্রিয় করেছে, পাঠকপ্রিয় করেছে সন্দেহ নেই। বিপুল অর্থে সামাজিকও করে তুলেছে, কারণে অকারণে দায়বদ্ধতা বাড়িয়েছে। বয়স এবং লেখা হুমায়ূন আহমেদকে প্রাতিষ্ঠানিক করেছে।
সারাজীবনের অর্জিত সাফল্য, নিজের ব্যক্তিগত অর্জন, প্রাপ্তি, নিজের রেওয়াজ ভাঙ্গতে তাঁর মায়া আছে। জীবনের পিঠাপিঠি কতকতে, প্যাঁচপ্যাঁচে, ধকধকে বাঁকগুলো নির্ণয়ে দ্বন্দ আছে সীমাহীন। সমস্যার আদিতে কিংবা বিকাশ প্রকরণে তাঁর সমীকরণ ভিন্ন। অফুরান সদিচ্ছা আছে বলেই তাঁর লেখায় নীতিবাদিতার সহজিয়া প্রকাশ, অনুপম প্রকাশ তাঁকে আলাদা করেছে। তিনি নিজেই তাঁর উপকরণ সৃষ্টি করেছেন। পাঠকদের পথ দেখিয়ে অভ্যস্ত নিরাপদ কাঠামো দিয়েছেন, সে কারণে হয়তো কোন মহাচরিত্র সৃষ্টি করেননি, কিন্তু সৃষ্ট বিদ্যমান চরিত্রের মানবিক অমানবিক সূত্র নিয়ে গাঁথা রচনা করেছেন। পাঠক হাত বাড়িয়ে দেখেছেন-এ চরিত্রকে ছুঁয়ে দেখা যায়, আয়নায় অপরের অপরূপা ছবি দেখা যায়। বাঙ্গালী মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত কিংবা সুবিধাভোগী মানুষের গল্প বলেছেন তিনি চেনা কায়দায়, সহজ ঢঙ্গে। সারাজীবন নিজের ব্যক্তিগত অর্জনেও শিকড়ের কাছে তাঁর ঋণ তাঁকে ব্যাকুল করেছে, তাঁর লেখার চরিত্রগুলো তাঁকে কখনো সুখী করেছে কখনো বা দু:খী। হতে পারে এর কারণ তাঁর ব্যক্তি জীবনের সভ্যতা, বিনয় ও উচ্চশিক্ষা।
হুমায়ূনের লেখায় ফলভারে নতমুখী ব্যাপারটা আছে, অহংকার নেই, স্বেচ্ছাবাদ নেই, যথেচ্ছার নেই, শ্রেণী সংগ্রামের দ্বন্দ নেই, যৌনতা নেই। ব্যক্তি-উচ্চারণ শত ফুলে গ্রথিত হয়েছে, সামাজিক উদ্যম, আদি দ্বন্দ, মধ্যবর্তী বিকাশ ও পরিণয় কিংবা বিকিরণ অনেক সময় দমিত হয়েছে। স্বদেশের একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তাঁর ফ্ল্যাশব্যাক স্বত্তেও তিনি দেশ নির্বাচন করেন তাঁর লেখায়, দেশের মানুষগুলো। একেবারে আটপৌরে তাঁর মানুষগুলো, মানচিত্রগুলো। মধ্যবিত্ত থেকে পুরানো ঢাকার সড়ক, ঘিঞ্জি গলিগুলো, বাবার পেশা থেকে পরিবারবর্গে ঘিরে থাকা মানুষগুলো-এ সবই বড্ড চেনা মানুষ আমাদের। ওদের না পাওয়ার যন্ত্রণা, উপরের সিঁড়ি পাবার বাসনা পাঠকের বাসনা যন্ত্রনার সাথে বিলীন হয়ে গেছে।
মিশেল ফুকো’র ‘লিমিট অ্যাটিচ্যুড’ এর মতো পাঠক পাঠ করেন আর দেখেন যে চরিত্রগুলোকে হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যায়, এ যে বড় চেনা মানুষের জলছবি। তখনি পাঠক লেখকের সাথে একাত্মবোধ করেন, মিশে যান। পাঠক হুমায়ূন আহমেদকে আর দূরবর্তী মনে করেন না, আপন দলের মানুষ করে নেন।
এটাই বোধ করি লেখক হুমায়ূন আহমেদের কৃতিত্বের টুপিতে সবচেয়ে বড় পালক।
আর এ কারণেই শোভন প্রচ্ছদের পালক সমৃদ্ধ হুমায়ূন আহমেদকে পড়েছি। পাঠক পড়েন।
বাংলাদেশ সময়: ১৭৩৫ ঘণ্টা, ১ আগস্ট, ২০১২
সম্পাদনা: এম জে ফেরদৌস, নিউজরুম এডিটর