 |
| ছবি: জনি/ বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম |
মহাজোট সরকারের সাড়ে তিন বছর চলে গেছে। ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে নানা কারণে হোঁচট খেতে হচ্ছে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন এই মহাজোট সরকারকে। দুই তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে ক্ষমতায় আসা সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা ছিলো অনেক। ছিলো দিন বদলের ইশতেহার। সরকার পরিচালনার চাপে পড়তে হয়েছে বিভিন্ন সময়। মেয়াদের এই সময়ে এসে যেন সরকারকে ‘একলা চলো’ নীতিতে চলতে হচ্ছে। অনেকের ধারণা, কমছে সরকারের জনসমর্থন। পাশে থাকছে না বিদেশি দাতারা। যেন অনেকটাই ‘বন্ধুহীন সরকার’। এসব নিয়ে কথা বলেছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন খান। তিনি দীর্ঘদিন জড়িত রয়েছেন দুর্নীতিবিরোধী সংগঠন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গে। দায়িত্ব পালন করেন এর ট্রাস্টিবোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে। তিনি যুক্ত আছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর সঙ্গেও। সম্প্রতি তাঁর উত্তরার বাসায় বাংলানিউজের সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট সাইদ আরমানের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বলেন। তার সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো:
বাংলানিউজ: দুর্নীতি প্রতিরোধ, সুশাসন, নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারের অর্জনকে কিভাবে দেখছেন?
এম হাফিজউদ্দিন খান: দুর্নীতি প্রতিরোধ, সুশাসন, নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়নে সরকারের অর্জন নেই বলা যায়। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের অন্যতম নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিলো দুর্নীতি প্রতিরোধ। কিন্তু এতে সরকারের সাফল্য শূন্য। ফলে সরকার জনসমর্থন হারাচ্ছে। জনসমর্থনে স্বাভাবিকভাবেই ভাটার টান দেখা যাচ্ছে। দেশে ও বহির্বিশ্বে সরকার অনেকটা একা হয়ে যাচ্ছে। সরকারের মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠছে। এসব অভিযোগের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া দরকার। বিদেশিরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। এতে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে।
বাংলানিউজ: আপনি কি তাহলে বলতে চাইছেন অভ্যন্তরী এবং বহির্বিশ্বে সরকার বন্ধুহীন হয়ে পড়ছে; সরকার ভিতরে ও বাইরে চাপে রয়েছে?
এম হাফিজউদ্দিন খান: অনেকটা তাই। সরকার দেশ পরিচালনায় ব্যর্থতার পরিচয় দেওয়ার ফলে একদিকে জন সমর্থন হারাচ্ছে। অপরদিকে, বিদেশিরা মুখ ফিরিয়ে নিতে চাইছে। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলসহ দাতাদেশ ও সংস্থাগুলোর সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়েছে। আমাদের তো এখন বন্ধু নেই বললেই চলে। একমাত্র ভরসা ভারত। কিন্তু ভারত তো বন্ধুত্বের কোনো প্রমাণ দেয়নি। তিস্তাচুক্তি, ছিটমহল সমস্যা, ট্রানজিট নিয়ে এক তরফা চাওয়া অমীমাংসিত। তাহলে কিভাবে ভারতকে বন্ধু বলব? বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে সরকার দেশের ক্ষতি করছে। এতে অন্যদের সঙ্গে সর্ম্পকে টানাপোড়েন তৈরি হবে।
বাংলানিউজ: দুর্নীতির অভিযোগ এনে পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন বাতিল করল বিশ্ব ব্যাংক। কিভাবে দেখছেন।
এম হাফিজউদ্দিন খান: বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির অভিযোগ এনে পদ্মাসেতুতে অর্থায়ন বাতিল করেছে। এটা জাতির জন্য দুর্ভাগ্য। কপালে দুর্নীতির ছাপ পড়ল। কলংকের ছাপ। সরকারের উচিত ছিলো বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ তদন্ত করা। আমরা বিশ্বব্যাংকের অংশীদার। সুতরাং তাদের কাছে আমাদের অধিকার রয়েছে। সরকারের উচিত হবে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনায় বসা। এখনো আলোচনার সুযোগ আছে বলে মনে করি। আলোচনায় বসে এই দুর্নীতির কলংক থেকে মুক্ত হতে হবে। অথচ আমরা উল্টো আচরণ করছি। আমি বলব না, বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে অভিযোগ নেই। তবে এখন তা বলবার সময় নয়।
বাংলানিউজ: বিশ্ব ব্যাংক অভিযোগ আনল দুর্নীতির। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাউটস ওয়াচ বলছে, র্যাব ভেঙে দিতে। প্রশ্ন তুলেছে বিডিআর বিদ্রোহের বিচারের মান নিয়ে। আপনি টিআইবির সঙ্গে দীর্ঘদিন জড়িত। আপনি কি মনে করেন, সরকারের সাড়ে তিন বছরে দুর্নীতি বেড়েছে?
এম হাফিজউদ্দিন খান: আমাদের দেশে কোনো সরকারই সমালোচনা মানতে চায় না। সমালোচনা থেকে নিজেদের শোধরাতে চায় না। কথা বলা মুশকিল। তারপরও বলছি, বিগত দিনের চেয়ে দুর্নীতি অনেক বেড়েছে। বেড়েছে এর ব্যাপকতা এবং ক্ষেত্র। মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে পর্যন্ত অভিযোগ আসছে। আর কি বলব! দুর্নীতির বিপক্ষে সরকারের অবস্থান নেই বললেই চলে। দুর্নীতি দমন আইনটি দীর্ঘদিন ঝুলে আছে। খোদ কমিশনের চেয়ারম্যান বিভিন্ন সময় হতাশা প্রকাশ করছেন। একই চিত্র মানবাধিকারের ক্ষেত্রেও। শুধু সমালোচনাকে উড়িয়ে দিলে হবে না। দুর্নীত দমনে সরকারের সদিচ্ছা নেই।
বাংলানিউজ: মানবাধিকারের কথা বললেন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদন মানতে তো সরকার নারাজ । মন্ত্রী থেকে শুরু করে অনেকেই বলছে, উদ্যেশ্যমূলকভাবে এই প্রতিবেদন করা হয়েছে। আপনার বক্তব্য কি?
এম হাফিজউদ্দিন খান: হিউম্যান রাইটস ওয়াচ যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তা শুধু মুখে বলে অস্বীকার করলে হবে না। আন্তর্জাতিক এই মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিবেদন বিশ্বজুড়ে গ্রাহ্য ও স্বীকৃত। এর বাইরে যদি বলি, আমরা সাধারণ নাগরিকরা কি দেখছি? দেশে কি ক্রস ফায়ার হচ্ছে না? মানবাধিকার লংঘন হচ্ছে না? আইন শৃংখলা বাহিনীগুলোর দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহি নেই বললেই চলে। আর এমন অন্যায় কাজের প্রতি প্রত্যেক সরকারেরই সমর্থন থাকে। সরকার কি প্রমাণ দিতে পারছে, আইন শৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা যারা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে তাদের বিরুদ্ধে তারা ব্যবস্থা নিচ্ছে? ব্যবস্থা নিলে তো দেখাতে পারতো!
বাংলানিউজ: সরকার বলছে, দেশীয় অর্থায়নে পদ্মাসেতু করা হবে। পদ্মাসেতুর মোট ব্যয়ের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ ব্যয় হবে বৈদেশিক মুদ্রাতে। দেশীয় অর্থায়নে করতে গেলে এর যোগান সম্ভব হবে বলে মনে করেন?
এম হাফিজউদ্দিন খান: দেশের অর্থায়নে পদ্মাসেতু করা সম্ভব কিনা সে বির্তকে যেতে চাই না। তবে এখন পর্যন্ত আমরা যা বলছি, অনেকটা না বুঝে বলছি। আমরা কোনো তথ্য নিয়ে কথা বলছি না, কোনো বিশ্লেষণ করছি না, স্রেফ হুজুগে কথা বলছি। আপনি বললেন, প্রায় ৮০ শতাংশ অর্থ ব্যয় হবে বৈদেশিক মুদ্রায়। এর যোগন আসবে কিভাবে? বলা হচ্ছে, বন্ড ছেড়ে সংগ্রহ করা হবে। তবে এর সুদ কি হবে তার কোনো তথ্য নেই। আবার বলা হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ডলার নেওয়া হবে। কিন্তু পৃথিবীতে এমন নজির নেই। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত ২০০৩ সালে তাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে অবকাঠামো উন্নয়নে ডলার চেয়েছিলো। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক তা দেয়নি। কারণ ঐ অর্থ দেশের অবকাঠামোর জন্য নয়, আমদানি ব্যয় নির্বাহ করার জন্য।
বাংলানিউজ: পদ্মাসেতু নিয়ে যে রাজনৈতিক বিভাজন তৈরি হয়েছে, কিভাবে দেখছেন সেই বিভাজনকে?
এম হাফিজউদ্দিন খান: দেখুন, এটা সত্য, আমরা ধীরে ধীরে সংঘাতের দিকে যাচ্ছি। চরম হতাশার মধ্যে যাচ্ছে সময়। জাতির জন্য এক দুঃখের এবং দুর্ভাগ্যের যে, জাতীয় কোনো ইস্যুতে এবং দেশের বৃহৎ স্বার্থে পর্যন্ত আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো এক হতে পারে না। অথচ জাতীয় স্বার্থে একমত হওয়াটা গণতন্ত্র, উন্নয়ন, মানবাধিকার, সুশাসনের জন্য জরুরি। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিকদের মধ্যে এমন চর্চা নেই। এর থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। আর এর উদ্যোগটাও নিতে হবে রাজনীতিকদেরই। কারণ সুশীল সমাজের উদ্যোগ শেষমেষ কোনো কাজে আসে না। তারা, রাজনীতিকরা, সুশীল সমাজের কথা শোনে না বললেই চলে।
বাংলানিউজ: আপনাকে ধন্যবাদ।
এম হাফিজউদ্দিন খান: আপনাকেও ধন্যবাদ।
বাংলাদেশ সময়: ১০১০ ঘণ্টা, ১৬ জুলাই, ২০১২।
এসএআর/এআর
সম্পাদনা: জুয়েল মাজহার, কনসালট্যান্ট এডিটর jewel_mazhar@yahoo.com