 |
মিয়ানমার থেকে ফিরে: ‘‘অল রোডস লিড টু রোম’’...সুপ্রাচীন এই আপ্তবাক্যটি এবার ইয়াঙ্গুনের জন্য প্রযোজ্য। সম্প্রতি পাঁচ দিন মিয়ানমারের রাজধানী ইয়াঙ্গুন ও নতুন রাজধানী নিপিটো ঘুরে এমন উপলব্ধিই হয়েছে।
এই ধারণার সঙ্গে একমত আমার সফরসঙ্গীরাও। মিয়ানমারে বসবাসকারী বাংলাদেশিদেরও একই মত। একই অভিমত ইয়াঙ্গুন রিজিয়ন গভর্নমেন্ট অফিসের চিফ মিনিস্টার উ মিনসু, মিয়ানমার ইকোনমিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সান থাউং ও ইয়াঙ্গুন নগরীর ট্যাক্সিচালক মিন থাবেসহ আরও অনেকের।
ইয়াঙ্গুনের প্রধান তিনটি হোটেল ট্রেডার্স, সেডোনা ও পার্ক রয়্যালের লবি ঘুরে দেখা যায় গিজ গিজ করছে বিদেশি পর্যটকে। লবিতেই চলছে মিটিং। দল বেঁধে হয়তো কোথাও চলে যাচ্ছে আবার আসছে। এই বিদেশিরা কারা ? খোঁজ নিয়ে জানা গেলো চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ছাড়াও রয়েছে ইউরোপ, আমেরিকা থেকে আসা লোকজন। এরা কি কেবলই পর্যটক? উত্তর খুঁজে জানা গেলো এরা প্রায় সবাই মিয়ানমার গেছেন ব্যবসা-বিনিয়োগ চিন্তা মাথায় নিয়ে।
নতুন মিয়ানমার এখন বিনিয়োগকারীদের অন্যতম গন্তব্য। বাংলাদেশ থেকে এবি ব্যাংকের যে দলটির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম তারাও গিয়েছিলেন সেখানে একটি প্রতিনিধি কার্যালয় উদ্বোধন করতে। আন্তর্জাতিক ব্যাংকের শাখা স্থাপনের অনুমতি মেলেনি। তবে প্রতিনিধি কার্যালয় স্থাপনে কোনো বাধা নেই বরং কিছুটা খুশিই মিয়ানমার সরকার। সে কথাই ধ্বনিত হলো দেশটির ইয়াঙ্গুন রিজিয়ন গভর্নমেন্ট অফিসের চিফ মিনিস্টার উ মিনসুয়ের কণ্ঠে। এবি ব্যাংকের প্রতিনিধি কার্যালয়ের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, এ ধরণের একটি ব্যাংকিং উদ্যোগ দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়াতে ভূমিকা রাখবে। এবি ব্যাংককে সব ধরণের সহযোগিতারও আশ্বাস দেন তিনি।
সীমান্ত-বাণিজ্যে সহযোগিতা দিতে বাংলাদেশের প্রথম বেসরকারি ব্যাংক এবি ব্যাংকের সঙ্গে কাজ করতে রাজি মিয়ানমারের প্রধান সরকারি ব্যাংক এমইবি। ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সান থা উং বলেন, ‘‘মিয়ানমারের ব্যাপারে অনেক দেশই আগ্রহ দেখাচ্ছে। প্রতিবেশী দেশ হিসেবে বাংলাদেশকেও আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি।’’
অনেকেই এখন মিয়ানমারে বিনিয়োগের বিষয়ে উদ্যোগী হচ্ছেন। বাংলাদেশিরাও যাচ্ছেন কেউ কেউ। এমনই একজন তরুণ উদ্যোক্তার দেখা মেলে ঢাকা থেকেই। প্রথমে বিমানে এবং পরে মিয়ানমারে হোটেলেও তার সঙ্গে কথা হয়। নাজমুল হুদা মেহদী নামের এই তরুণ উদ্যোক্তা জানালেন, অনেকেই এখন মিয়ানমারের ব্যাপারে আগ্রহী হচ্ছেন। তারও উদ্দেশ্য ওখানে ব্যবসায় বিনিয়োগ করা। ফেরার দিনে বিমানবন্দরে ফের দেখা। জানালেন পাঁচ দিনের সফর তার ফলপ্রসূ। বেশ কয়েকটি সম্ভাবনার ক্ষেত্রে আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে। শিগগিরই আবার যাবেন।
তবে বাংলাদেশ বা ভারতকে নয়, প্রতিবেশী হিসেবে চীনের ওপরই বেশি ভরসা মিয়ানমারের। বিনিয়োগে কিংবা ব্যবসায় চীনের পাল্লাই ভারী। সেকথাই বলছিলেন মিয়ানমারে দীর্ঘদিন ধরে গাড়ির ব্যবসা করে আসা একজন বাংলাদেশি। শফিক আহমেদ নামের চট্টগ্রামের বাসিন্দা এই ব্যবসায়ী জানালেন, চীনের ব্যাপারেই মিয়ানমার সরকার বেশি উদার।
তবে এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগের ঘাটতিকেই চিহ্নিত করলেন এবি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ওয়াহিদুল হক। তিনি বলেন, ১৯৯৫ সাল থেকে রিপ্রেজেন্টেটিভ অফিস খুলে সীমান্ত-বাণিজ্যে সহযোগিতা করে এলেও গত ওয়ান ইলেভেনের পর এবি ব্যাংক ওই কার্যক্রম বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়। কিন্তু মিয়ানমারে এখন গণতন্ত্র ফিরে এসেছে। বাংলাদেশেও গণতান্ত্রিক সরকার দেশ চালাচ্ছে। এ অবস্থায় নতুনভাবে উদার নীতি গ্রহণ করে উভয় পক্ষ এগিয়ে গেলেই দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্ক দৃঢ় ভিত্তি পেতে পারে। আর সেটা হবে দুদেশের জন্যই উইন উইন সিচুয়েশন।
মিয়ানমার এবি ব্যাংককে নতুন করে প্রতিনিধি কার্যলয় চালু করার সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু ইয়াঙ্গুনে একটি অনুষ্ঠান করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে সাড়ে সাত হাজার ডলার নেওয়ার অনুমতি পেতে তাদের বেশ বেগ পেতে হয়েছে, সখেদে জানালেন এবি ব্যাংক প্রধান।
এবি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার ফাহিমুল হকও ছিলেন ওই টিমে। তিনি বললেন, হোটেলগুলোতে বিদেশিদের এত ভীড় দেখে মনে হচ্ছে- অল রোডস লিড টু ইয়াঙ্গুন।
মিয়ানমারের ব্যাপারে এবার অন্য অনেক দেশের মতো আগ্রহী হয়ে উঠেছে অর্থনৈতিক পরাশক্তি জাপানও। জাপানের একটি তৈরি পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠানের হয়ে মিয়ানমার থেকে কর্মী রিক্রুট করতে ইয়াঙ্গুন যান ভারতীয় তরুণী সামান্থা। পরিচয় হয় সেডান হোটেল লবিতে। তিনি জানালেন, মিয়ানমারের কর্মী নিয়োগ করে এখানেই উৎপাদনের করবে জাপানি প্রতিষ্ঠানটি।
হোটেল ট্রেডার্সে যাই সেখানে ইউনিসেফ কার্যালয়ে কমিউনিকেশন হেড জাফরিন চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করতে। দুপুরে লাঞ্চে হোটেল লবিতে একই ধরনের ভিড় দেখে জানতে চাইলে বাংলাদেশি এই যোগাযোগ বিশেষজ্ঞেরও একই মত, বিশ্বের অনেক দেশই এখন মিয়ানমারের বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠছে।
দক্ষিণ কোরিয়া থেকে আসা দং সান জানালেন ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যেই তার ইয়াঙ্গুনে যাওয়া। একই কথা জানা গেলো সেডান হোটেলে অন্য আরও অনেক বিদেশির সঙ্গে কথা বলে। কেউ তৈরি পোশাক, কেউ টেলি কমিউনিকেশন, কেউ অটোমোবাইলস এমন নানা ধরনের খাতে আগ্রহের কথা জানালেন।
সকলের এই আগ্রহের বিষয়টিতে মিয়ানমারের সাধারণ মানুষের ভাবনা কি তা জানার জন্য অনেকের সঙ্গে আলোচনার সুযোগ হয়নি। কিন্তু কথা হয়েছে গাড়িচালক তোরা ও উ পোয়া এবং ট্যাক্সি চালক মিন থাবের সঙ্গে। উন্নয়নের ছোঁয়া লাগছে, বিদেশি পর্যটক আসায় ট্যাক্সি-গাড়ি চালিয়ে দিনে ৩০ থেকে ৪০ ডলার আয় হচ্ছে। এতে ভীষণ খুশি এরা তিনজনই। কিন্তু মিন থাবের কথায় কিছু ভিন্ন সুরও শোনা গেলো। থাবে বললেন, “এভাবে যদি আসতে থাকে তাহলে গণতান্ত্রিক সরকারও এক সময় হুমকির মুখে পড়বে। সাধারণ মানুষ বিদেশি বিনিয়োগ স্বাগত জানাবে কিন্তু তা যদি কখনো আগ্রাসনের পর্যায়ে পৌঁছায় তা হলে যতই গণতন্ত্রের কথা বলা হোক এই সরকার টিকতে পারবে না।”
মাহমুদ মেনন
menon@banglanews24.com
বাংলাদেশ সময় ০৯৩৯ ঘণ্টা, জুন ১২, ২০১২
সম্পাদনা: জুয়েল মাজহার, কনসালট্যান্ট এডিটর
Jewel_mazhar@yahoo.com