ঢাকা : মামাকে ভাই আর শাশুড়িকে বোন বানিয়ে ঋণ নিয়েছেন। নেই কোনো ব্যবসা। তাতে কি! নিজ নামে ভুয়া কাগজপত্র দেখিয়ে আর নানা ছলচাতুরি করে পর্যায়ক্রমে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক থেকে ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণ বাগিয়ে নিয়েছেন তিনি। ঋণ নিলেও কোনো প্রকল্পের ঋণের টাকা পুরোপুরি পরিশোধ করেন না। তিনি আব্দুল হান্নান রতন।
সোনালী ব্যাংকে এখন আলোচিত নাম আব্দুল হান্নান রতন। বারবার অনিয়মের পরও ঋণ পাওয়ায় সোনালী ব্যাংকে তাকে নিয়ে চলছে আলাচনা-সমালোচনার ঝড়। তবে তার এই কর্মকাণ্ডের বিপক্ষে কেউ ব্যবস্থা নিতে পারছেন না এক না বলা আতঙ্কে। কারণ তার পক্ষে কাজ করেন সোনালী ব্যাংকের এক অদৃশ্য ক্ষমতাধর শক্তি!
সোনালী ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৯ সাল থেকে কয়েক দফা ঋণ নিলেও আজ অবধি ঋণের পুরো অর্থ পরিশোধ করেননি তিনি। বারবার খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল, সুদ মওকুফ, নিজের মামা ও শাশুড়িকে ভাই-বোন দেখিয়ে বেনামি প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নেওয়া কিংবা নিজের প্রতিষ্ঠানে আগুন লাগার অজুহাত দেখিয়ে ঋণের কিস্তির টাকা পরিশোধে গড়িমসিসহ নানা কারণে আলোচিত তিনি।
নানা কৌশলে রাষ্ট্রীয় মালিকানার সোনালী ব্যাংক থেকে এ পর্যন্ত ৮ কোটি ৬৬ লাখ টাকা সুদ মওকুফ সুবিধা নিয়েছেন রতন। ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত এই প্রতিষ্ঠানটি পড়েছে আর্থিক ক্ষতির মুখে।
জানা গেছে, সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা এবং পরিচালনা পর্ষদের একাধিক কর্তাব্যক্তি এ ধরনের ঘটনার পেছনে থেকে লুটপাটের রাজ্য কায়েম করেছেন। আর বড় অংকের সুদ মওকুফ করিয়ে তারা কামিয়ে নিচ্ছেন মোটা অংকের অর্থ।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র বলছে, ‘‘অনুসন্ধানে এমন একটি অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। আমরা তদন্ত করে দেখছি। প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নিতে পিছপা হবে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক।’’
সবশেষ চলতি বছরের এপ্রিল মাসে রতনকে ১৯ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
নিজেকে ব্যবসায়ী পরিচয়দানকারী রতন প্রথম ঋণ নেন ১৯৯৯ সালে। কিশোরগঞ্জের বিসিকে শিল্প স্থাপনের জন্য রতন ফুড ইন্ডাস্ট্রিজের নামে সোনালী ব্যাংকের স্থানীয় কার্যালয় থেকে ৪ কোটি ১২ লাখ টাকা ঋণ নেন। ২০০১ সালে চলতি মূলধন ঋণ বাবদ নেন ৩ কোটি টাকা। ২০০২ সালে কারখানায় আগুন লাগার অজুহাতে তিনি কিস্তি পরিশোধ থেকে বিরত থাকেন। এরপর ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় থেকে একটি পরিদর্শন দল পাঠানো হয়। কারখানায় পরিদর্শনে গিয়ে ব্যাংকের কাছে প্রতীয়মান হয়, তিনি কারখানাটি ভাড়ায় পরিচালনা করছেন। এরপর তাকে ঋণ পরিশোধের জন্য নোটিশ দেওয়া হলে তিনি কিস্তি দেওয়া শুরু করেন। কয়েক কিস্তি দেওয়ার পর আবার তা দেওয়া বন্ধ করেন। পরবর্তীতে তিনি ব্যাংকের ঋণখেলাপিতে পরিণত হন।
আরও জানা যায়, রতন নিজের নাম গোপন করে ২০০৭ সালে জালিয়াতির মাধ্যমে সোনালী ব্যাংক থেকে ৪ কোটি ৯৬ লাখ টাকার অন্য একটি ঋণ নেন। ২০০৮ সালে ব্যাংকের এক বিশেষ পরিদর্শনে জালিয়াতির বিষয়টি ধরা পড়ে। মেসার্স নিউ শ্রাবণ অ্যাগ্রো ফুডস লিমিটেডের নামে ঋণটি নেওয়া হয়। আবেদনে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেখানো হয় এমদাদুল হক ওরফে আখতার হোসেন এবং পরিচালক দেখানো হয় হামীমা খানম ওরফে শামিমা হোসেনকে। দু’জনের মধ্যে আপন ভাই-বোন সম্পর্ক উল্লেখ করা হয়। ব্যাংকের তদন্তে বেরিয়ে আসে, তাদের একজন রতনের মামা, অন্যজন তার শাশুড়ি।
সবশেষ, কিশোরগঞ্জের বিসিক শিল্প এলাকায় ২১ হাজার বর্গফুট জমির ওপর বিস্কুট, কেক, কুকিজ ইত্যাদি খাদ্য প্রকল্প স্থাপনের লক্ষ্যে মেসার্স ঐশ্বর্য অ্যাগ্রো ফুডস প্রসেসিং লিমিটেডের অনুকূলে ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল হান্নান রতন ২০১০ সালের ২৫ অক্টোবর ঋণের জন্য আবেদন করেন। প্রথমে প্রস্তাবিত প্রকল্পের মোট ব্যয় ৫০ কোটি ৭ লাখ ৭২ হাজার টাকা দেখিয়ে ৩৪ কোটি ৯৯ লাখ ৪৪ হাজার টাকা ঋণের আবেদন করা হয়। পরে কমিয়ে মোট ১৯ কোটি ২৪ লাখ টাকার আবেদন করেন। চলতি বছরের এপ্রিলে অদৃশ্য শক্তি বলে কর্তৃপক্ষ তাকে ১৯ কোটি ২৪ লাখ ২৬ হাজার টাকা ঋণ দেয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের বরাত দিয়ে মহাব্যবস্থাপক এএফএম আসাদুজ্জামান এ ব্যাপারে বাংলানিউজকে জানান, সম্প্রতি রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা, কৃষি ব্যাংকসহ বেসরকারি বেশ কিছু ব্যাংকে অনিয়মের বেশ বড় তথ্য বেরিয়ে এসেছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো ধরনের অনিয়মকে প্রশ্রয় দেবে না। কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠককালে গভর্নর ড. আতিউর রহমান ব্যাংকগুলোর অনিয়ম নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের কেনো পরিদর্শনে অনিয়মগুলো ধরা পড়েছে কি না তা খতিয়ে দেখতে নির্দেশ দিয়েছেন। কেন সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষাতে বিষয়টি উঠে আসছে তাও দেখার কথা বলেন। পরে কেউ যদি তথ্য গোপন করতে কাজ করে তারা কারা তাদের খুঁজে বের করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেন আরো কঠোর অবস্থান নেয় সে ব্যাপারেও বলেছেন।
প্রয়োজনে দুর্নীতি দমন কমিশনের সহায়তা নেওয়ার কথাও বলেন গভর্নর।
বাংলাদেশ সময়: ১০১৭ ঘণ্টা, ১৪ আগস্ট, ২০১২
এসএআর/ সম্পাদনা : নজরুল ইসলাম, নিউজরুম এডিটর; আহ্সান কবীর, আউটপুট এডিটর; জুয়েল মাজহার, কনসালট্যান্ট এডিটর jewel_mazhar@yahoo.com