 |
সামনে অনেক বিপদ। উত্তোরণের উপায় জানা নেই। অস্থির মনে ছুটোছুটি। ভাবনার সমুদ্রে উত্তাল তরঙ্গ। এমন সময়ে কী উপায়? পবিত্র কুরআন শরীফে আল্লাহ তা’য়ালা বাতলে দিয়েছেন বিপদের সহজ সমাধান। মুমিনদের জন্য স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন’।
চলার পথে জানা অজানা এমন বিপদের সংখ্যা নেহায়তই কম নয়। বিপদ কখনো কখনো ধৈর্যের বাধ ভেঙ্গে দেওয়ার মতো করে আসে। তখন মনে হয় ‘আর কতো ধৈর্য ধরবো’। ঠিক সেই সময়েও মনে করতে হবে, যতক্ষণ না আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বিপদমুক্ত করছেন, ততোক্ষণই ধৈর্য ধারণ করে থাকতে হবে। এই বিপদের মুক্তি আল্লাহ তা’য়ালা ধৈর্যের মধ্যেই নিহিত রেখেছেন।
ইতিহাস খুললে দেখা যাবে, যুগে যুগে আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের ধৈর্য তিনি বারবার পরীক্ষা করেছেন। সীমাহীন বিপদে আচ্ছন্ন রেখে তাদের ধৈর্যকে আরও মজবুত করেছেন। আল্লাহর এমন পরীক্ষাতে মুমিনরা মোটেও বিচলিত হননি। বরং এই কঠিন পরীক্ষায় বারবার স্মরণ করেছেন সেই আল্লাহকেই, যিনি বিপদে ধৈর্য ধারণের নির্দেশ দিয়েছেন।
মুমিনদের পিতা হযরত ইব্রাহিম (আ.) এর জীবনী থেকে জানা যায়, ধৈর্যের কঠিন পরীক্ষায় তিনি আল্লাহর ওপর আস্থা রেখে দারুণভাবে সফল হয়েছেন। বিনিময়ে তিনি পেয়েছেন, সুসজ্জিত ফুলের বাগান, আরামদায়ক এক স্থান। ইসলাম প্রচারের অপরাধে তৎকালীন বিধর্মী শাসক নমরুদ হযরত ইব্রাহিমকে (আ.) শূলে চড়িয়েছেন। যেই শূলের নিচে স্থাপন করা হয়েছিল আগুনের উত্তপ্ত গর্ত। শূল থেকে তাঁকে জলন্ত অগ্নিময় এই গর্তেই ফেলা হবে। শূলে চড়ানোর আগ পর্যন্তও তাঁর ধৈর্যে এতটুকু ফাটল ধরানো যায়নি। আল্লাহ বিরোধী কোনো কথাই বের করানো যায়নি ধৈর্যশীল মানব ইব্রাহিম (আ.) এর মুখ থেকে। খোদার নির্দেশ মতো ধৈর্য ধারণের ফলে আগুনের সেই গর্তকে তাঁর জন্য বানিয়ে দেওয়া হয়েছে নিরাপদ এক স্থান।
হযরত ইয়াকুব (আ.) তাঁর প্রিয় সন্তান ইউসুফকে (আ.) হারিয়ে যখন শোকে বিহ্বল, তখনও তিনি আল্লাহর নির্দেশ মতোই ধৈর্যের শরণাপন্ন হলেন। দিনের পর দিন যায়, মাসের পর মাস যায়, ইউসুফ (আ.) ফিরে আসে না। কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও তিনি ধৈর্যচ্যুত হননি। ধৈর্য পরীক্ষায় যখন তিনি উতরে গেলেন, তখনই আল্লাহ তাকে ফিরিয়ে দিলেন প্রিয় সেই সন্তান। এমন দৃষ্টান্ত অগণিত।
ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হয়েছে ইউসুফকেও (আ.)। বিনা অপরাধে দীর্ঘদিন তাঁকে জেলে পুরে রাখা হয়। চারপাশের মুক্ত পৃথিবী থেকে সরিয়ে রাখা হয় নির্দোষ এই নবীকে। তাই বলে কি তিনি চরম বিচলিত, ধৈর্য হারিয়ে ফেলেছিলেন? মোটেও না, বরং অটল ধৈর্য নিয়েই প্রভুর কাছে প্রার্থনায় নিমগ্ন ছিলেন তিনি। আস্থা ছিল, সৃষ্টিকর্তাই তাঁকে এই মিথ্যা জেল খাটুনি থেকে রেহাই দেবেন। রেহাই তো তিনি পেলেন, সেই সঙ্গে পেলেন মিশরের অধিপতির দায়িত্ব। এমনই ছিল ধৈর্য পরীক্ষার ফলাফল।
হযরত ঈসা (আ.) এর মা মরিয়ামকে (আ.) কম ধৈর্য ধরতে হয়নি। আল্লাহর ইচ্ছায় মরিয়মের গর্ভে ঈসা যখন বাবা ছাড়াই এলেন, তখন লোকে আঙ্গুল তুলে দেখাতে লাগলেন মরিয়মের দিকে। কী বিচ্ছিরি ব্যাপার ছিল সবার কাছে। কিন্তু মরিয়ম (আ.) মুখ খুললেন না অজ্ঞ সমাজের কাছে। কেবল নিজের মতো করেই ধৈর্য ধরে গেলেন। আর বললেন, আল্লাহ! আমার ধৈর্য আরও বাড়িয়ে দাও। আল্লাহও তাই করলেন। বিদ্রুপকারীরা একদিন ঠিকই বুঝতে পারল, ঈসা (আ.) কোনো সাধারণ মানুষ নন, তিনি আল্লাহর প্রেরিত নবী।
শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) ও জীবনের পরতে পরতে ধৈর্য ধরে গেছেন ইস্পাত কঠিনের মতো। শত বিপদের ঘোর আঁধারে মুহূর্তের জন্যও ধৈর্য থেকে সরে যাননি তিনি। তায়েফে কাফেরদের কাছ থেকে নির্যাতিত হওয়ার পরে আল্লাহ যখন তাঁর এই প্রিয় বন্ধুর কাছে বার্তা পাঠালেন, তায়েফকে ধ্বংস করে দেওয়ার কথা বলে। তখনও তিনি অতিশয় ধৈর্য ধরেই বললেন, “ওরা তো বোঝে না, তাই অমন করেছে”।
পদে পদে বিপদের গর্ত মাড়িয়ে পার করতে হয়েছে দুনিয়ার হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর জীবন, তবু সবখানেই ছিল ধৈর্যের সরব উপস্থিতি। প্রিয় জন্মভূমি মক্কা ছেড়ে মদিনায় চলে আসা, কাফেরদের সঙ্গে ক্ষুদ্র প্রস্তুতি নিয়ে ২৩টি যুদ্ধ পরিচালনা করা, সুবিশাল কাফের গোষ্ঠির মধ্যে ইসলামের আলো জ্বেলে দেওয়া, কাবা ঘরকে বেদ্বীনদের হাত থেকে মুক্ত করে আনা, ধৈর্যের পরীক্ষা কোথায় ছিল না? এমন ধৈর্য ধারণ করতে পারবেন বলেই তো তাঁর ওপরই দেওয়া হয়েছিল মুসলিম উম্মাহর শেষ নবী ও রাসুলের দায়িত্ব, তাঁকেই করা হয়েছিল সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব।
সুতরাং মুমিন হতে হলে ধৈর্যকেই সঙ্গী করতে হবে সবকিছুর আগে। আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস রাখার পাশাপাশি তাঁর নির্দেশনা মানতে হবে ধৈর্যের সঙ্গেই। সুফল হয়তো স্বচক্ষে দেখা যাবে না, কিন্তু ঠিকই লেখা থাকবে আল্লাহর কাছে। জীবনের সবখানে সব আয়োজনে আল্লাহর নির্দেশিত এই ধৈর্যই হোক আমাদের উত্তোরণের উপায়।
সম্পাদনা: শিমুল সুলতানা, নিউজরুম এডিটর
মেইল: bn24.islam@gmail.com