 |
শুভ্রসাদা মানব কল্যাণে ব্রতী এ এক প্রকৃতির উপাদান! এস এম সুলতানের দর্শন মানবতা; কল্যাণের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোই ছিল তার চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কৃষকের ক্লান্তদিন, কৃষানীর স্বপ্নের বিভোরতা- দেখেছেন ধ্যানমগ্ন আপন মহিমায়। ছবি একেঁছেন, বোহেমিয়ান জীবন নিয়ে বেড়িয়েছেন কাদামাটির সোঁদা গন্ধে। প্রকৃতির অপার উপাদানের নিমিত্তে ক্ষেতের আল ধরে, সোনালি ধানের ওষোর ভেঙ্গে হেঁটে বেড়িয়েছেন গাঁও গ্রামের প্রান্তে। শিশুদের প্রতি ভালোবাসায় বিমোহিত সুলতান। শিশুদেরকে ভবিষ্যতের যোগ্য উত্তরসুরি ভেবে শিশুদের গড়ে তোলার ইচ্ছে শক্তির ব্যাপ্তি ছিল রঙের তুলির আচড়ে। তাই শিশুদের সখ্য তাকে দিয়েছে অনন্য এক প্রেরণাশক্তি । শিশুদের মাঝে নিজেকে বিস্তৃত করাই ছিল আরাধ্য। আরাধনার তৃপ্তিতে আপ্লুত হয়েই শিশু স্বর্গের সূচনা। নিজের পরিধি বিস্তারের মানসে শিশুসঙ্গ তাকে নিয়ে গেছে ভাবনার অসীম এক জায়গায়। সৌন্দর্য্য পিপাসু প্রকৃতির সৌন্দর্য অবগাহনে গ্রহণ করেছেন যাযাবর জীবনকে । জীবনের মোহ ত্যাগ, সীমাহীন আর্থিক অনটন, চারপাশের মানুষের অনভিপ্রেত অসহযোগীতা ও সংসারত্যাগ তাকে তিলে তিলে রূপান্তরিত করেছে অদ্ভূত ব্যক্তিত্বে। যা নিয়মের বাহির থেকে প্রকৃতির রূপ, রস, সুধাপানে চারপাশকেই নিয়ামক হিসেবে কল্পনার জগতে তুলির সুবিশাল ক্যানভাসে ঠাঁই দিয়েছেন চিত্রচর্চায়। জীবনের অলিগলি পেরিয়ে রক্তমাংশের সুসজ্জিত কশেরুকা ভেদ করে এনেছেন হাড্ডিসার মানুষের নিত্যদিনের জীবন। শৈল্পিক ভাবনা থেকেই তিনি তুলির নরম আচড়ে এঁকেছেন গরীব মানুষগুলোকে, যাদের কশেরুকায় মগজে ধনীক শ্রেণীর বসবাস। শোষণের সেই হাতিয়ারকে জাতভেদ ভুলে প্রতিভু প্রজাতির গোয়ালের গবাদি পশুর শৃঙ্গের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তার গভীর কৌতুহলদীপ্ত চোখ চিত্রা নদী দেখেছে, ডিঙ্গি নৌকায় শিশুদের দেশ ভ্রমণের প্রয়োজনীয়তা মানসপটে সযতনে বয়ে নিয়ে দেশ বিদেশে তা উপস্থাপন করেছেন আগামির কথা ভেবে। অন্তরাত্মা আর লৌকিক বিবেচনায় দেশের মাটি বায়ু আকাশ ও মানুষই ছিল তার আরাধ্য। মানব সেবার ক্যাটাগরিতে প্রাধান্য পেয়েছে নির্বাক ছবি। যার ভাষা নেই কিন্তু আছে প্রকাশের অভিপ্রায়। আর এ অভিব্যক্তিই তাকে দিয়েছে অনন্য সুন্দর ছদ্মাবরণ জীবন। জাতভেদের বাড়াবাড়িতে বিরক্ত হয়েছেন, কখনো কখনো নিরুদ্দেশ্যে পলাতক জীবনকে সঙ্গী করে মন দিয়েছেন স্বীয় কর্মে।
প্রকৃতির অপ্রকৃতিস্থ আচরণে তার ভিতরটা হু হু করে কেঁদে উঠত। তাই প্রকৃতির অসদাচারণ তার অন্তরদেশে প্রতিবাদের ভয়ানক খেয়াল সৃষ্টি করতো। চারপাশের মানুষের বিষবাষ্পে তার চরিত্রে অদ্ভুত পরিবর্তনে অভীষ্ট হতো। বেখেয়ালী এ জীবন নিয়ে মানুষের কৌতূহলও ছিল অতুলনীয়। চুপিসারে দলবেধে পুরুষ মহিলা ঝি জায়া ভগিনী এক নজর সুলতান দর্শনে চিত্রারপাড়ে ভিড় জমাতো। সাধক পুরুষ ভেবে কেউ কেউ তার দর্শনকে মঙ্গলের শুভক্ষণ ভেবে সুলতান দর্শনে আড়ষ্ট ছিল কতশত’ জীবন। এ এক মানুষ যার বেখেয়ালী জীবনে খুব খেয়াল ছিল ছবি আঁকায়। কতো ভাষার অভিব্যক্তি স্পষ্টত চিত্রকর্মে। যুগযুগ ধরে ভাষাহীন চিত্র কর্ম কতোটা বেপরোয়া হয়ে সমাজে রাষ্ট্রের অনাচারে প্রতিবাদ করে যাচ্ছে। তাইতো সুলতান ভীতিতেও ভুগেছে বহু প্রতিষ্ঠিত চিত্রশিল্পী, যারা রাষ্ট্রের কাছাকাছি থেকে বোহেমিয়ান সুলতানের সৃষ্টিকর্মকে রাষ্ট্রীয় পক্ষপাতদুষ্টে আড়াল করেছে। কারণ অতীতের সব সৃষ্টিশীলতা যে সুলতানের সৃষ্টিকর্মে ঢাকা পড়ে যেত মুহূর্তে। তার ছবির ভাষার ভীতিতে সুলতানকে ঢাকা শহরেও আসতে অনেকের প্রত্যক্ষ বিরোধীতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। তাই নড়াইল থেকে ঢাকাকে অনেক দূর ভেবে ছুটে গেছেন কলকাতায়। কলকাতায় যখন সুলতানের জয়জয়কার তখনো অতি উচ্চমার্গীয় চিত্রকররা কলকাতায় সুলতান বিরোধীতার পোস্টার ছেপেছেন। রাতের আঁধারে তা কলকাতা শহরের অলিগলিতে সুলতান কপাট মুর্খ বলে প্রচারসমৃদ্ধ হয়েছে। কিন্তু তারপরও সুলতান লক্ষ্য থেকে এক চুল পরিমান লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়নি। রাতের বেলায় সুলতান সান্নিধ্যে যারা আত্মতৃপ্তিতে ভুগেছে। তারাই দিনের বেলায় সুলতান বিরোধীতায় কাঁপাতেন বক্তৃতার মঞ্চ। কিন্তু তারপরও সুলতান তাদেরকে সঙ্গ দেয়া থেকে বিরত থাকেনি।
সুলতান নিয়ে রাষ্ট্রের অবহেলা সুলতান প্রেমিকদের হতাশ করে। কেন আমাদের সরকার ব্যবস্থা আমাদের রাষ্ট্র এসএম সুলতান নিয়ে এতটা উদাসীন তা বোধগম্য নয়। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, পটুয়া কামরুল হাসান সহ প্রতিথযশা শিল্পীদের নিয়ে পাঠ্যপুস্তুকে শিক্ষা দেয়া হয় কিন্তু সুলতান রয়ে গেছেন বরাবরই অনুপস্হিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলায়তো সুলতান এক প্রকারে নিষিদ্ধই বটে। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চারুকলা ইনস্টিটিউটগুলোতে এস এম সুলতান নিয়ে কোন শিক্ষা দেয়া হয়না। অথচ এস এম সুলতানের চিত্রকর্ম বিশ্বব্যাপী আলোড়ন তুলেছেন। লন্ডন থেকে প্যারিস এস এম সুলতান দীপ্তমান। প্যারিসের যাদুঘরে এস এম সুলতানের আঁকা তিনটি চিত্রকর্ম স্হান পেয়েছে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়েও এসএম সুলতান পড়ানো হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশে তার প্রিয় স্বদেশে মহৎ এ শিল্পী বরাবরের ন্যায় অনুপস্হিত ও অবহেলিত। এস এম সুলতানের জন্মবার্ষিকী ও মৃত্যুবার্ষিকী নিয়ে রাষ্ট্রীয় কোন আড়ম্বর চোখে পড়ে না। অথচ অনেকের বেলায় রাষ্ট্রীয় আয়োজন দেখে এস এম সুলতান নিয়ে যে বৈষম্য চলছে তা স্পষ্ট হয়। রাষ্ট্রযন্ত্র একপেশে পক্ষপাতদুষ্ট হতে পারে না, হওয়া উচিতও নয়।
বিশেষ করে এসএম সুলতানের মতো এমন একজন গুণী মানুষকে যদি রাষ্ট্র স্বীকৃতি না দেয় তাহলে তা জাতি হিসেবে আমাদেরকে নীচু করবে তা নি:সন্ধেহে বলা যায়। হ্যা রাষ্ট্রব্যবস্হায় অনেক বিষয়ে মতদ্বৈততা থাকে। তাই বলে গুণী মানুষদের নিয়ে নয়। এসব মানুষেরা রাষ্ট্রীয় সম্পদ, তাদেরকে মূল্যায়ন করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তাই সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলবো সম্প্রতি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলা ইন্সটিটিউটের যাত্রা শুরু হয়েছে। অন্তত এই বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হওয়া চারুকলায় এস এম সুলতানকে পাঠ্যসূচির অর্ন্তভুক্ত করা হোক।
এখানকার ছাত্রছাত্রীরা সুলতান পাঠে নিজেদের জ্ঞানের ভাণ্ডার পূর্ণ করুক। তাদের মাধ্যমে এস এম সুলতান ছড়িয়ে যাক মহাবিশ্বের মহাব্যাপ্তিতে। তাতে রাষ্ট্র কিছুটা হলেও ভারমুক্ত হবে। এসএম সুলতান পাঠের আসর এই সবুজতায়নের পরিসীমা ছেদ করে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও পৌঁছে যাক এই প্রত্যাশা সুলতান প্রেমিকদের। আশা করি এক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ সকল সংকীর্ণতার উর্ধ্বে উঠে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।
এক্ষেত্রে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায় অনেক বেশি। কেননা তাদেরই কাজ শিল্প সংস্কৃতির গুণীজনদেরকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া। এস এম সুলতান নিয়ে কোন রাজনীতি নয়, কোন মহলের আক্রোশ নয়। এস এম সুলতানকে সকল প্রকার বির্তকের উর্ধে রেখে যথাযথ মূল্যায়নেই আমাদের ব্যক্তিসত্ত্বা নিহিত রয়েছে। তাই এস এম সুলতান ছড়িয়ে পড়ুক স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প সংস্কৃতির সকল ডালপালায় এমন প্রত্যাশাই আমাদের সকলের। সরকার যথাযথ পদক্ষেপের ব্রতী হয়ে এস এম সুলতানকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মানিত করুক তাও সংস্কৃতিমনা মানুষদের কাম্য।
বাংলাদেশ সময়: ১৭০০ ঘণ্টা, ২২ জুলাই, ২০১২
সম্পাদনা: এম জে ফেরদৌস