 |
| ছবি: বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম |
পার্বতীপুর (দিনাজপুর): সবার ক্ষতিপূরণ নয়, শুধুমাত্র বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির ক্ষতিগ্রস্তদের আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী ১২ নেতার চেক ছেড়ে দিলেই আন্দোলন থেমে যাবে। বাংলানিউজের অনুসন্ধানে এমন তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত লোকজনের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার অপরাধে ১২ জনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোর ক্ষতিপূরণের চেক আটকে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছেন ‘জীবন ও সম্পদ রক্ষা কমিটি’র নেতারা।
এদিকে, দিনাজপুর জেলা প্রশাসন বলছে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের কয়েকজন নেতা সম্পূর্ণ বিধিবহির্ভূতভাবে প্রায় ২ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির ৩ বর্গকিলোমিটার সেন্ট্রাল পার্টের ৬৪৬ একর ভূমি অধিগ্রহণ ও স্থায়ী ক্ষতিপূরণের জন্য সরকার ২০১০ সালের ৯ নভেম্বর ১৯০ কোটি ৮৩ লাখ টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করে। ঘোষিত প্যাকেজে ফসলি জমির মূল্য ধরা হয়েছে একরপ্রতি ২০ লাখ, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বসতভিটায় ২৫ লাখ, দোকান প্রতি ৫০ হাজার এবং ৩১৮ জন ভূমিহীনকে এককালীন ২ লাখ টাকা করে।
এছাড়া অবকাঠামো খাতে ৩৩ কোটি, গাছপালা ৮ কোটি, অনির্ধারিত খাতে ১ কোটি ও ২টি ফসলের ক্ষতিপূরণ ২ কোটি টাকা রাখা হয়েছে ওই প্যাকেজে।
সূত্রমতে, দিনাজপুর জেলা প্রশাসন ও পার্বতীপুর উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় কয়েক দফা জরিপ শেষে কয়লাখনি কর্তৃপক্ষ ক্ষতিপূরণ প্যাকেজটি তৈরি করেছিল। কয়লাখনি কর্তৃপক্ষ প্যাকেজ বাস্তবায়নের জন্য ২০১১ সালের জানুয়ারিতে ১৯০ কোটি টাকা দিনাজপুর জেলা প্রশাসনকে দেয়।
জেলা প্রশাসন টাকা পাওয়ার পর পুনরায় জরিপ শুরু করে। চূড়ান্ত জরিপ শেষে ৬৪৬ একরের পরিবর্তে ৬২৭ দশমিক ৮৩ একর ভূমি অধিগ্রহণ এবং ৩১৮ জন ভূমিহীনের পরিবের্তে ১৫৫ জনকে পুনর্বাসন করার তালিকা করা হয়। আর এখানেই জেলা প্রশাসন ও ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে বিরোধের সূত্রপাত।
এদিকে, ২০১১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া শুরু হয়। এ পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে প্রায় ১২০ কোটি টাকা। অথচ ঘোষিত প্যাকেজে ক্ষতিগ্রস্তদের সব পাওনা টাকা ২০১১ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে পরিশোধের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
ক্ষতিগ্রস্তদের সংগঠন ‘জীবণ ও সম্পদ রক্ষা কমিটি’র আহ্বায়ক ইব্রাহিম খলিল বাংলানিউজকে জানান, জেলা প্রশাসন চূড়ান্ত জরিপের নামে ক্ষতিগ্রস্তদের চরমভাবে হয়রানি করেছে ও ঠকিয়েছে। পাঁচ হাজার টাকা মূল্যের গাছের দাম ধরেছে এক হাজার টাকা। বসতভিটাকে আবাদি জমি দেখিয়ে কম মূল্য ধরা হয়েছে।
ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি রেকর্ড, খাজনা-খারিজ (নামজারি) ও কবলা দলিলে যে পরিমাণ জমির উল্লেখ রয়েছে ঠুনকো অজুহাতে তার চেয়ে কম পরিমাণ জমির মূল্য দেওয়া হচ্ছে। ৬২৭ দশমিক ৮৩ একর জমি অধিগ্রহণ করা হলেও টাকা দেওয়া হচ্ছে ৬২২ একরের। অবশিষ্ট ৫ দশমিক ৮৩ একরের প্রায় দেড় কোটি টাকার কি হবে তা কেউ জানে না।
তিনি আরও জানান, আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার অপরাধে ১২ জনের ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোর বিপরীতে প্রায় ২ কোটি টাকার চেক আটকে দেওয়া হয়েছে। এরমধ্যে প্রায় ১ কোটি ২৬ লাখ টাকা তার। তাছাড়া ৩১৮ ভূমিহীনের মধ্যে ১৫৫ জনকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হলেও পুনর্বাসনের জায়গা দেওয়া হয়নি।
ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত দিনাজপুর জেলা প্রশাসক জামাল উদ্দিন আহম্মেদ বাংলানিউজকে জানান, ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। প্রকৃত বিষয় হলো- ‘জীবন ও সম্পদ রক্ষা কমিটি’র আহ্বায়ক ইব্রাহিম খলিলসহ সংগঠনের ১২ নেতা ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোর ক্ষতিপূরণ বাবদ ১ কোটি ৭৬ লাখ ৮৪ হাজার ১৭৯ টাকা দাবি করছেন।
এর মধ্যে ইব্রাহিম খলিল ১ কোটি ২৫ লাখ ৬০ হাজার ৫১১ টাকা, সুলতান উদ্দিন ১ লাখ ৫ হাজার ৯৩৬ টাকা, মোসফিকুর ৪ লাখ ৪৫ হাজার ২১৫ টাকা, আব্দুল কাদের ৬ লাখ ৫৮ হাজার ৪৮৬ টাকা, মামুনুর রশিদ ৩ লাখ ৩৮ হাজার ২৪৭ টাকা, মকছেদ আলী ৫ লাখ ৫৩ হাজার ৫৫ টাকা, সাবিনা ইয়াসমিন ৭ লাখ ৯২ হাজার ৩শ টাকা, সানোয়ার হোসেন ২ লাখ ১১ হাজার ৩০৮ টাকা, ফরহাদ আলী ১০ লাখ ২৬ হাজার ২০৭ টাকা, রুহুল আমিন ৩ লাখ ৯৮ হাজার ৯৩২ টাকা, জয়নাল আবেদীন ১ লাখ ৮৩ হাজার ২৬৪ টাকা ও শহিদুল ইসলামের ৪ লাখ ১০ হাজার ৭১৮ টাকা।
কিন্তু আইন অনুযায়ী তারা এ টাকা পাবেন না। কারণ ভূমি অধিগ্রহণের ৩ ধারার নোটিস জারির অনেক পরে তারা ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো তৈরি করেছিলেন।
বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী কামরুজ্জামান বাংলানিউজকে জানান, তিনি জেলা প্রশাসককে বলেছেন দ্রুত ক্ষতিগ্রস্তদের বিষয়টি মিটিয়ে ফেলার জন্য। খনি ভূ-গর্ভে ঘনঘন ভূমি ধসের কারণে প্রতিনিয়ত ভূমি অবনমন হচ্ছে। বিশেষ করে মৌপুকুর ও জিগাগাড়ী গ্রাম অত্যন্ত ঝুকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের আন্দোলনের ফলে ভূমি অবনমন জরিপ করাও যাচ্ছে না।
জেলা প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলানিউজকে জানান, আন্দোলনকারী কয়েকজন নেতা তাকে বলেছেন আটকে রাখা ১২ জনের চেকের মধ্যে এই মুহুর্তে ইব্রাহিম খলিলের চেকটি দিলেই অন্যান্য চেক গ্রহণ করবেন। ‘জীবন ও সম্পদ রক্ষা কমিটি’র কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলেও একই তথ্য পাওয়া গেছে।
অপর একটি সূত্র জানায়, ঘুড়ির সুতা ও নাটাই রয়েছে স্থানীয় সংসদ সদস্য ভূমি প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট মোস্তাফিজুর রহমানের হাতে। তিনি ৩ জুলাই এলাকায় আসবেন। তিনি এলেই সবকিছু সমাধান হয়ে যাবে।
এ বিষয়ে ভূমি প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট মোস্তাফিজুর রহমান মোবাইলে বাংলানিউজকে বলেন, “ক্ষতিগ্রস্তদের বিষয়টি নিয়ে ভাবছি। দেখি কি করা যায়।”
বাংলাদেশ সময়: ১৪৩৫ ঘণ্টা, জুন ৩০, ২০১২
সম্পাদনা: প্রভাষ চৌধুরী ও ওবায়দুল্লাহ সনি, নিউজরুম এডিটর