হুমায়ূন আহমেদ এবং কাজী আনোয়ার হোসেন- দুজনের মাঝে মিল হলো- দুজনেই খুব সহজ সরল ভাষায় লিখেন। দুজনেই সিরিজ উপন্যাস লিখে সফলতা পেয়েছেন, নিজস্ব পাঠক গড়ে তুলেছেন। তবে কাজী আনোয়ার হোসেনের পরিচয় অন্যখানে, তিনি শুধু উপন্যাসিকই নন, একজন সফল অনুবাদক ও পাঠকের প্রিয় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘সেবা প্রকাশনী’র কর্ণধারও বটে। তিনি বাংলা রহস্য-সাহিত্যের প্রবক্তা, মাসুদ রানা ও কুয়াশা সিরিজের সফল জনক। এর বাইরে আরো অনেক পরিচয়ই দেয়া যায় তার, তবে ভক্তকুলের কাছে তার সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো তিনি পাঠকের প্রিয় ‘কাজীদা’। আজ ১৯ জুলাই বৃহস্পতিবার তার ৭৬-তম জন্মদিন। ১৯৩৬ সালের এই দিনে তিনি ঢাকার সেগুনবাঁগিচায় জন্মগ্রহণ করেন।
তার বাবা প্রখ্যাত বিজ্ঞানী, গণিতবিদ ও কথাসাহিত্যিক কাজী মোতাহার হোসেন, মাতা সাজেদা খাতুন। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অন্যতম ব্যক্তিত্ব সনজীদা খাতুন তার বোন, উপন্যাসিক কাজী মাহবুব হোসেন তার ভাই। মোট ৪ ভাই, ৭ বোন। সকলেই প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু কাজী আনোয়ার হোসেন তথা সকলের প্রিয় কাজীদা’র পরিচয়টি স্বনামে। তিনি স্বমহিমায় নিজেকে পরিচিত করে তুলেছেন বাঙালি পাঠকমহলে।
কাজীদা’র রহস্যোপন্যাসের সাথে আমার পরিচয় কৈশোরে। ১৯৯৮ সাল, বন্যার পানি বাড়তে বাড়তে ঢুকে পড়লো আমাদের একতলা বাসায়। তাই একতলায় থাকা বড় বোনের বই ভাণ্ডার সরাতে হয়েছিল সে সময়। পরে গোছগাছ করতে গিয়ে হাতে পড়ে নিউজপ্রিন্টে ছাপানো ছেড়াফাটা মলাটবিহীন একটা বই- `ধ্বংসপাহাড়`। খুলে দেখেছিলাম, ১৯৬৬ সালের সংস্করণ। পুরোনো বই ফেলে দিব ভেবেছিলাম। বইটা কী বিষয়ের বুঝতে গিয়ে চোখ রাখি প্রথম পৃষ্ঠাতে। তারপর রহস্যের গন্ধ পেয়ে আর ফেলা হয়নি, পড়ে ফেলেছিলাম সবটুকু। পরিচয় ঘটেছিল রহস্যপুরুষ কাজী আনোয়ার হোসেনের সফল চরিত্র মাসুদ রানার সাথে।
পরে পত্রিকায় প্রকাশিত কাজী আনোয়ার হোসেনের সাক্ষাৎকার পড়ে জেনেছিলাম, এটিই ছিল বাংলা সাহিত্যের প্রথম মৌলিক স্পাই থ্রিলার, যা রচনা করতে গিয়ে কাজীদা মটরসাইকেল নিয়ে ঘুরে এসেছিলেন চট্রগ্রাম, কাপ্তাই এবং রাঙামাটি। সেই সময়ে যা ছিল একেবারেই অকল্পনীয়। পুরো উপন্যাসটি লিখতে সময় নিয়েছিলেন ৭ মাস! সব জেনে গভীর শ্রদ্ধা জন্মেছিল তার প্রতি। সেই শ্রদ্ধা নেশায় পরিণত হয়েছিল একসময়।
পরবর্তীতে কুয়াশা এবং মাসুদ রানা সিরিজের জলে হাবুডুবু খেতে লাগলাম। সেবা প্রকাশনীর’র প্রতি এক ধরনের নেশা ধরে গেল। চলমান জীবন যাত্রায় তার প্রভাব পড়তে লাগল। ‘উড়ন্ত সসার’ পড়ে আমি অনেক রাত অবধি বাড়ির ছাদে উঠে আকাশের দিকে চেয়ে থাকতাম সেই সসার দেখার আশায়। স্বপ্ন দেখতাম এলিয়েনের সাথে কথা বলার। পড়তাম ওয়েস্টার্নও। আমি সায়েন্স ফিকশন-এর ভক্ত ছিলাম তবে হঠাৎ করেই স্পাই থ্রিলারের প্রতিও আগ্রহী হয়ে উঠেছিলাম। একসময় নিজেকে ভাবতে লাগলাম- এমআর নাইন!
সেবা প্রকাশনীর বইগুলোর ওপর গুরুজনদের বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। প্রজাপতি মার্কা বই দেখলেই সেটা নিয়ে বাসাই ঘটে যেত তুঘলকি কাণ্ড। বই ছিড়ে-কিংবা পুড়িয়ে দেয়া হতো। গুরুজনদের বক্তব্য হলো-সেবার বই ‘খারাপ’। কিন্তু কেন? এ প্রশ্নের কোন উত্তর দেওয়া হতো না। বলত- এসব বাচ্চাদের পড়ার জন্য নয়। নিষিদ্ধের কারণেই কিনা জানিনা, সহজ সরল ভাষায় রহস্যের আবহ তৈরি করা গল্পগুলো পড়তে অসম্ভব আকর্ষণ বোধ করতাম।
বাঙালি মুসলিম সমাজের রক্ষণশীলতার মাঝে যৌনতার প্রকাশ্য আলোচনা সমাজ বরদাস্ত করতে পারত না। কাজী আনোয়ার হোসেন সেই প্রথাটা ভেঙেছিলেন। সহজ সাবলীলভাবে কাহিনীর প্রয়োজনেই স্পর্শকাতর জায়গাগুলো বর্ণনা করেছেন। ধ্বংস পাহাড়, ভারতনাট্যমে খোলামেলা আলোচনা করা হয়েছে, যা থেকে স্পষ্টই কাজীদা’র সাহস ও শিল্প পরিচয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
খুব কম দামে নিউজপ্রিন্টের বাঁধাই করা বই প্রকাশ করে সেবা প্রকাশনী। এখন কাগজের দাম অস্বাভাবিক হওয়ায় বইয়ের দাম বেড়েছে অনেকগুন তারপরও সেবা অপেক্ষাকৃত কম দামেই বাজারে বই ছাড়ে। আগে দাম ছিল অনেক কম। কখনও নিজে কিনতাম, কখনও বন্ধুদের হাত ঘুরে ঘুরেও হাতে আসত। বই হাতে এলেই চোখ দুটো বেড়ালের মত জ্বলে উঠত। পাঠ্যবইয়ের ভেতর রেখে যখন বইগুলো পড়তাম, অদ্ভূত সমীহ জাগ্রত হত লেখক কাজীদার প্রতি।
কাজী আনোয়ার হোসেনের গায়ক পরিচয়টি অনেকেই জানেন না। ঢাকা বেতারের তালিকাভুক্ত কণ্ঠশিল্পী ছিলেন তিনি। তিনি চলচ্চিত্রেও গান গেয়েছেন। ‘আজ হলো শনিবার কাল কোনো কাজ নেই রাত জেগে তোমাকেই ভাবছি, নাগরিক আভাসে যান্ত্রিক পরিবেশে কল্পনা মায়াজাল বুনছি’ তার গাওয়া গানটি একসময় শ্রোতামহলে জনপ্রিয়তা পেয়েছিলো। এছাড়া উর্দু ছবি তালাশে রবীন ঘোষের সুরে কাজী আনোয়ার হোসেন গেয়েছিলেন বিখ্যাত একটি গান, ‘ম্যায় রিকশাওয়ালা বেচারা’। ইউটিউবে তার কণ্ঠে গানটি শুনে চরম বিস্মিত হয়েছিলাম, নতুন করে শ্রদ্ধা জন্মেছিল এই সব্যসাচী মানুষটির প্রতি।
হাজার হাজার কিশোরের শৈশব রাঙিয়ে দিয়েছেন কাজীদা। তিনিই শিখিয়েছেন- কিভাবে সাহিত্যের যাদু দিয়ে পাঠককে বশে রাখা যায়। তার রহস্যের হাতছানিতে পাঠক কখনো থাকে অ্যালান কোয়াটারমেইনের সাথে আফ্রিকার গহীনে, কখনো যুদ্ধের ময়দানে, কখনওবা মত্ত থাকে প্রিয়তমার সাথে রোমান্সে। অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে- কাজীদা কী লেখার সময়ও তার ওয়ালথার পিপিকে আর কমান্ডো নাইফ সাথে রাখেন!
মনে পড়ে, একবার বইয়ের লিস্ট দিয়ে পার্সেল চেয়ে পাঠালাম। পার্সেলে বাজে বাঁধাই ও ভুল প্রিন্টের একটা বই আসল। মনে মনে বিরক্ত হলেও বইটা রেখে দিয়েছিলাম এবং স্বভাব অনুযায়ী বইয়ে নিজের নাম লিখেছিলাম। অভিযোগ জানিয়ে একটা চিঠি পাঠিয়েছিলাম, এটাও বলেছিলাম- বইয়ে আমার নাম লেখা আছে, ফেরত নেয়া যাবে কিনা। পরবর্তী বইয়ের শেষে চিঠি বিভাগে আমাকে উত্তর দিয়েছিলেন কাজীদা। বলেছিলেন- শুধু নাম নয়, নামের নিচে পুরো ঠিকানাটাও লিখে বইটা পাঠিয়ে দিতে। এও বলেছিলেন- তিনি নিজ খরচে একটা ভাল কপি পাঠিয়ে দেবেন। দিয়েছিলেনও!
বিদেশী গল্পের ছায়া অবলম্বনে অনেক বই লিখলেও সেগুলো কাজীদার হাতে পড়েছে বলেই এতটা অসাধারণ থ্রিলার হয়ে উঠেছে। তিনি সবসময়ই মনে করেছেন- পাঠকই হলো তার সম্পদ। তাই পাঠকের কাছেই তিনি দায়বদ্ধতা প্রকাশ করেন সবসময়ই। তিনি বড় মাপের মানুষ। তার সাহিত্যরচনা ও পাঠকের প্রতি তার দায়বদ্ধতাকে পরিপূর্ণভাবে তুলে ধরা আমার মত নাদান লেখকের পক্ষে কঠিন কাজ। তাই সেটা চেষ্টা করা সত্বেও পারলাম না, এই লেখা তার জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানানোর ক্ষুদ্র প্রয়াস মাত্র।
শুভ জন্মদিন, প্রিয় কাজীদা। আপন আলোয় উদ্ভাসিত করুন পৃথিবীকে, ভালোবাসায় বেঁচে থাকুন হাজারো বসন্ত। আর লিখুন দুর্দান্ত সব রহস্যোপন্যাস। আপনার হাত ধরেই গড়ে উঠুক নতুন সেবা প্রজন্ম।
(সিয়াম সারোয়ার জামিল, ব্লগার ও সংবাদকর্মী)
বাংলাদেশ সময়: ১৫০০ ঘণ্টা, ১৯ জুলাই, ২০১২
সম্পাদনা: এম জে ফেরদৌস