 |
| জেলা পুলিশ সুপার শেখ নাজমুল আলম, বিকেএমইএ সহ-সভাপতি এম এ হাতেম ও গার্মেন্টস টেক্সটাইল শ্রমিক নেতা ইসমাইল |
নারায়ণগঞ্জ : “ভাই খবর শুনছেন-আদমজী ইপিজেডের ভেতরে কয়েকজন শ্রমিককে হত্যা করা হয়েছে। ফতুল্লার শিবু মার্কেট এলাকায় একটি রফতানিমুখী গার্মেন্ট কারখানায় ৫ শ্রমিকের লাশ পাওয়া গেছে।”
গত ৫-৬দিন ধরে নারায়ণগঞ্জে কর্মরত গণমাধ্যম কর্মী ও বিভিন্নজনের কাছে এ ধরনের মিথ্যে আর গুজবের বার্তা পৌঁছানো হচ্ছে। কিন্তু পরে যাচাই করে জানা যাচ্ছে, এর কোনোটিরই সত্যতা নেই। তবে এমনি এক গুজবে গত রোববার নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার সিদ্ধিরগঞ্জে ইপিজেড ও কাঁচপুর শিল্পাঞ্চলের লক্ষাধিক শ্রমিক কর্মবিরতি দিয়ে বিক্ষোভ করে। সেদিন পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশি গণমাধ্যমগুলোতেও বেশ ফলাও ও গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করা হয়।
অভিযোগ উঠেছে, নারায়ণগঞ্জে ‘গার্মেন্ট সেক্টরে শ্রমিক হত্যা-গুম’সহ বিভিন্ন ধরনের গুজব ছড়িয়ে বড় ধরনের শ্রমিক অসন্তোষ সৃষ্টির চেষ্টা চলছে। আর এর মূল্য লক্ষ্য দেশের গার্মেন্ট সেক্টরে ধ্বস নামানো।

গার্মেন্ট মালিকদের দাবি, প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থা বিভিন্ন স্থানে শ্রমিক অরাজকতার আগাম বার্তা বা পরবর্তী ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। এ রকম চলতে থাকলে দেশের গার্মেন্ট শিল্প বিশ্ব প্রতিযোগিতার বাজারে নিজের অবস্থান হারাবে। বায়াররা অন্য দেশে অর্ডার নিয়ে চলে যাবে।
আর পুলিশ বলছে, এটা সম্পূর্ণ পরিকল্পিত একটি ষড়যন্ত্র। শ্রমিকদের হত্যা করা হচ্ছে বলে যারা গুজব ছাড়াচ্ছে তারা এর কোনো প্রমান দিতে পারছে না। সবাই বলছে অমুকের কাছে শুনেছি। কিন্তু সত্যিকার অর্থে এমন শ্রমিক হত্যার কোনো ঘটনার প্রমাণ কারো কাছে নেই।
গার্মেন্ট মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফেকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) এর মতে, বাংলাদেশের রফতানি আয়ের দ্বিতীয় বৃহত্তম খাত হলো গার্মেন্ট সেক্টর। বাংলাদেশে নারায়ণগঞ্জে সবচেয়ে বেশি নিট গার্মেন্ট প্রতিষ্ঠান রয়েছে যার অধিকাংশ ফতুল্লা শিল্পাঞ্চল, ফতুল্লার বিসিক, আদমজী ইপিজেড ও কাঁচপুর শিল্পাঞ্চলে অবস্থিত। এসব কারখানা সংখ্যায় প্রায় সহস্রাধিক হবে। এসব কারখানাতে কয়েক লাখ শ্রমিক কাজ করে। এসব স্থানে গত কয়েক বছরে ধরে অসন্তোষের ঘটনা ঘটে। তবে অভিযোগ ছিল, এসব অসন্তোষের পেছনে শ্রমিক নেতাদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পৃক্ত।
গোয়েন্দা সংস্থার একটি সূত্র বাংলানিউজকে জানান, শনিবার ইপিজেডের ইপিক গার্মেন্টের শ্রমিক শাহীন ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন। কিন্তু রোববার সকালে গুজব ছড়িয়ে পড়ে তিনি মারা গেছে। এতে শ্রমিকেরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। এর আগে শনিবার রাতেই গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল ৫জনকে মেরে ফেলা হয়েছে ইপিজেডে।
গোয়েন্দা সংস্থার সূত্রটি জানান, বিদেশি কিছু মহল স্থানীয় এজেন্টদের দিয়ে পরিকল্পিতভাবে এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়ে পরিবেশ অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। তারা চাচ্ছে এ ধরনের নেতিবাচক কর্মকাণ্ড করিয়ে বিশ্বের বড় বড় ক্রেতা দেশগুলোর কাছে বাংলাদেশের গার্মেন্ট সেক্টরকে নেতিবাচকভাবে তুলে ধরতে। আর সেটাই বাস্তবায়ন করছে তাদের এজেন্ট কিছু শ্রমিক নেতা। বিদেশি গণমাধ্যমের স্থানীয়রাও বিষয়টির সঙ্গে সম্পৃক্ত।

এদিকে, সংশ্লিষ্টরা গার্মেন্ট সেক্টর ধংসের নেপথ্যে সাতটি কারণ চিহ্নিত করেছে। সেগুলো হলো- সাম্প্রতিক বিদেশি বায়ারদের (ক্রেতা) বাংলাদেশমুখি হওয়া, বাংলাদেশের বাজার নষ্ট করতে বহিরাগত কোনো শক্তির ইন্ধন, শ্রমিক উস্কানি দেওয়া শ্রমিকদের গ্রেফতার না করা, গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিতে বহিরাগত সন্ত্রাসীদের অনুপ্রবেশ, ট্রেড ইউনিয়ন না থাকা, ঝুট সেক্টর দখল নিয়ে রাজনৈতিক সন্ত্রাসীদের মতবিরোধ ও শ্রমিক নেতাদের অভ্যন্তরীন কোন্দল।
এসব কারণের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বেশ কয়েকজন গার্মেন্ট মালিক জানান, নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলগুলো গত কয়েক মাস ধরে বিদেশি বায়াররা এসে পরিদর্শন করছে। বিশ্ব মন্দাভাব কিছুটা কমে আসায় অনেক দেশ থেকে অর্ডার আসতে শুরু করেছে। কিন্তু এশিয়ার দুটি দেশ বাংলাদেশের তুলনায় আরো কম মূল্যে পণ্য সরবরাহ করতে পারবে বলে বায়ারদের প্রলোভন দেখাচ্ছে। তবে বাংলাদেশের তৈরি পণ্যের গুণমত উন্নত হওয়ার কারণে অনেক বৈদেশিক কোম্পানি ও দেশ বাংলাদেশের প্রতি আগ্রহী। এ কারণেই বেশ কয়েকটি দেশ মোটা অংকের টাকা ইনভেস্ট করে দেশের কতিপয় শ্রমিক সংগঠন ও নেতাদের মদদ দিচ্ছে। তারাই এসব শ্রমিকদের উস্কানি দিচ্ছে।
গার্মেন্ট সংগঠন, শ্রমিক নেতা ও পুলিশের বক্তব্য
গুজব সৃষ্টি করে আতঙ্ক সৃষ্টির ঘটনাকে পূর্ব পরিকল্পিত বলে জানিয়েছেন পুলিশ প্রশাসন ও গার্মেন্ট মালিকরা। আর শ্রমিক নেতারা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে জীবন যাত্রার ব্যয় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু সে অনুপাতে তাদের বেতন তেমন একটা বাড়েনি। তাই শ্রমিকদের মনে পুঞ্জিভূত ক্ষোভ রয়েছে।

গার্মেন্ট মালিকদের বৃহৎ সংগঠন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফেকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)’র সহ সভাপতি এম এ হাতেম বাংলানিউজকে জানান, গত কয়েকদিন ধরেই নারায়ণগঞ্জসহ সারাদেশে গার্মেন্ট সেক্টর ধ্বংস করার চেষ্টা চলছে পরিকল্পিতভাবে। সরকারের এ সেক্টরের প্রতি কঠোর নজরদারির প্রয়োজন। বিশেষ করে শ্রমিক হত্যা গুজব কে বা কারা ছড়াচ্ছে তাদের শনাক্ত করা প্রয়োজন। এরকম চলতে থাকলে দেশের গার্মেন্ট শিল্প বিশ্ব প্রতিযোগিতার বাজার হারাবে। বায়াররা অন্য দেশে অর্ডার নিয়ে চলে যাবে।
কাঁচপুরে গার্মেন্ট শ্রমিকদের আন্দোলন নিয়ে আর্ন্তজাতিক মিডিয়ার ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এদেশে যারা এ অরজাকতা সৃষ্টিতে পেছনে থেকে কাজ করে যাচ্ছে তাদের কিছু এজেন্টও আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে রয়েছে। তারা এ আন্দোলনের নিউজ এমনভাবে প্রকাশ করছে যেন বাংলাদেশ বিশ্ববাজার হারায়। এ ক্রান্তিলগ্নে সরকারের বিশেষ নজর দেওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন।
এখানে উল্লেখ্য যে, রোববার সংঘর্ষের পরে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো বিকেল থেকেই গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপি ও রয়টার্স সংবাদটিকে অধিক গুরুত্ব দেয়। সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রভাবশালী ইংরেজি দৈনিক গালফ টাইম ডটকম সে দেশের স্থানীয় সময় রাত ৮টায় সংবাদটি আপলোড করেছিল। কাতার ট্রিবিউন ডটকম, ব্রুনাইয়ের দৈনিক দ্যা ব্রুনাই টাইমস, ইয়াহু নিউজ, আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা ডেমোটিক্স ডটকম, সিঙ্গাপুরের প্রভাবশালী দৈনিক স্ট্রেইট্স টাইম্স ডটকম, সৌদি আরবের ইংরেজি দৈনিক ‘সৌদিগেজেট ডটকম ডট এসএ’, পশ্চিমাবিশ্বের প্রভাবশালী বার্তা সংস্থা ‘মারকারিনিউজ ডটকম’, কাতার টাইম্স, আল আহারাম অনলাইনেও ছিল নারায়ণগঞ্জের সংবাদটি।

নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার শেখ নাজমুল আলম বাংলানিউজকে জানান, এটা সম্পূর্ণ পরিকল্পিত একটি ষড়যন্ত্র। শ্রমিকদের হত্যা করা হচ্ছে বলে যারা এ গুজব ছাড়াচ্ছে তারা নিজেরাও কোনো প্রমাণ দিতে পারছে না। কিন্তু সবাই বলছে অমুকের কাছে শুনেছি। কিন্তু সত্যিকার অর্থে এমন শ্রমিক হত্যার কোনো ঘটনার প্রমাণ কারো কাছে নেই।
এ ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জ শিল্প পুলিশ-৪ এর পুলিশ সুপার মাহবুবুল আলম বাংলানিউজকে জানান, মূলত গার্মেন্ট সেক্টরকে অস্থিতিশীল করতেই এটা করা হচ্ছে। কয়েকটি শ্রমিক সংগঠনের নেতারা নিজেদের ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল ও অন্য একটি দেশের অ্যাসাইনমেন্ট বাস্তবায়ন করতেই এ ধরনের গুজব ছড়িয়ে শ্রমিক অসন্তোষের চেষ্টা করছে।
এ বিষয়ে বিকেএমইএ এর পরিচালক ও শ্রমিক সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান জিএম ফারুক বাংলানিউজকে জানান, দেশের রফতানি খাতকে বিনষ্ট করতে আর্ন্তজাতিক ষড়যন্ত্র চলছে। আশুলিয়া, সাভারেও এ ধরনের গুজবে নৈরাজ্য সৃষ্টি করা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জেও এ ধরনের কার্যক্রম চলছে।
এদিকে, বাংলাদেশ গার্মেন্টস টেক্সটাইল শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান ইসমাইল বাংলানিউজকে জানান, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বাসা ভাড়া, পরিবহন খরচ বৃদ্ধিসহ নানা কারণের শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু তাদের বেতন তেমন একটা বাড়েনি। তাই শ্রমিকদের ক্ষোভ পুঞ্জিভূত রয়েছে। নতুন মজুরি কাঠামো পূর্নগঠন এবং ট্রেড ইউনিয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন না করায় যে কোনো সময় যে কোনো স্থানে শ্রমিকরা বিক্ষুব্দ হয়ে পড়ছে। এ ধরনের ঘটনা সারাদেশেই ঘটছে। রোববার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যে ঘটনাটি ঘটেছে তা শ্রমিকদের মাঝে চাপা ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ। তিনি আরও বলেন, চক্রান্তকারী যদি থেকে থাকে তবে তার বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক আইনগত ব্যবস্থা নেয়া অবশ্যই প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে শ্রমিক সংগঠনগুলোও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পাশে থাকবে। কিন্তু কোনো নির্দোষ মানুষকে যাতে হয়রানি না করা হয়।
বাংলাদেশ সময় : ১৬০০ ঘণ্টা, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১২
সম্পাদনা: আহ্সান কবীর, আউটপুট এডিটর